সেই সময়

‘অনেকবার মৃত্যুর মুখ থেকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বেঁচে ফিরেছি’

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৫, ০২:০৯
বাঙালি জাতির গৌরবের মাস ডিসেম্বর। লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই মানচিত্রে আমাদের প্রণম্য মুক্তিযোদ্ধা তারকাদের সংখ্যাও কম নয়। প্রতিবছর বিজয়ের মাসে আমরা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন আঙ্গিক নিয়ে শিল্পী-কুশলীদের লেখা বা স্মৃতিগদ্য ছেপে থাকি। এ বছরে পুরো মাসজুড়ে তারকাদের বয়ানে থাকবে তাদের দেখা যুদ্ধকালীন খণ্ডচিত্র। এ নিয়েই পুরো ডিসেম্বরের আয়োজন ‘সেই সময়’। আজ লিখেছেন চিত্রনায়ক ফারুক
 
স্বাধীনতা নিয়ে আমি এতোদিন বলতে আগ্রহী ছিলাম না। কিন্তু এখন বলতে হচ্ছে। কেননা, এ প্রজন্ম স্বাধীনতার সত্য ইতিহাস জানে না। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে যুদ্ধের স্মৃতি তুলে ধরা উচিত। এই ঢাকার যেদিক দিয়ে আজ লাখো মানুষ চলাফেরা করছে, ১৯৭১-এ সেখানেই লাখো লাখো গুলিবর্ষণ হয়েছে। মানুষ রাত বারোটার পর রাস্তায় বের হতে পারতো না। প্রতি মিনিটে লাখেরও বেশি গুলিবর্ষণ করতো হানাদাররা। যেখানে যাকে পেয়েছে তাকেই গুলি করে মেরেছে। যুদ্ধের হাজারো খণ্ড খণ্ড স্মৃতি আছে। আসলে কেউ না দেখলে বুঝতে পারবে না। তাই যুদ্ধের ইতিহাসও এই স্বল্প জায়গায় বলা যায় না।
 
আর্মিরা যেখানে মানুষ পেয়েছে সেখানেই গুলি করে হত্যা করেছে। এটা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। আমি ঢাকায় প্রথম ব্যারিকেড দিই। আমার ভাই এবং টুলু, বিনু, করিম, হোসেন ছিল ঢাকার এই প্রথম ব্যারিকেডে অংশ নেওয়া মুক্তিযোদ্ধা। আর তাদের গাইড করতো খসরু ও মন্টু। তারা এ্যালিফেন্ট রোডে অপারেশন চালাতো। আমরা দুই গ্রুপে বিভক্ত ছিলাম। তারা এ্যালিফেন্ট রোডে আর আমরা পুরোনো ঢাকায়। নাদের নামে আমার এক বন্ধু ছিল, আমি তার ডান হাত ছিলাম। আমরা পুরোনো ঢাকায় অপারেশন চালাতাম। অনেকবার মৃত্যুর মুখ থেকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বেঁচে ফিরেছি। আমার বন্ধু নাদের, বলতে গেলে আর্মির ওপরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সেই প্রথম গুলি চালায়। আমি তার সাথে ছিলাম।
 
২৫ মার্চ রাতে সে মিলিটারিদের ওপর গুলি করে। তারপর মিলিটারিদের জিপে গিয়ে তাদের আর্মসগুলোও নিয়ে আসে। এটি চারটিখানি কথা নয়। আর্মিরাও পরে নাদেরের বাড়ি গুলি ও বোমা মেরে পাউডার বানিয়ে দেয়। বঙ্গবন্ধু জানতেন। বঙ্গবন্ধু তার বাবাকে টাকা-পয়সাও দিয়েছেন। অনেককিছু দেখেছি মুক্তিযুদ্ধে। একশ’রও বেশি বয়স এমন মানুষ দেখেছি নদী, রাস্তা, বন, জঙ্গল পাড়ি দিয়ে ওপাড়ে গেছে। আমার বয়স তখন উনিশ। ১২ বছরের শিশুকেও দেখেছি অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করতে।
 
যুদ্ধ আসলে ২৫ মার্চ থেকে শুরু হয়নি। যুদ্ধ একাত্তরের জানুয়ারি থেকেই শুরু হয়েছে। আমরা প্রতিবাদ করতে শুরু করেছি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর ২৫ মার্চ থেকে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে যে যেভাবে পেরেছে লাঠি, কাঠ যা পেয়েছে তাই নিয়ে লেফট-রাইট ট্রেনিং করেছে, পথে ঘাটে, মানুষ মুখে মুখে হলেও ট্রেনিং করেছে। এর সবই হয়েছে ২৫ মার্চের আগে। তবে ২৫ মার্চ থেকে পরিপূর্ণ রূপে যুদ্ধ শুরু হয়।
 
যুদ্ধের এই সময়টাকে আমি বলবো অপূর্ব সময় ছিল। একে অন্যের প্রতি যে শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা এটা একাত্তরেই পাওয়া গেছে। একজন বাঙালি একজন বাঙালিকে কত ভালোবাসে। এক বাঙালি আরেক বাঙালিকে জানেও না, কিন্তু তাকে বাঁচাতে মৃত্যুর মুখে নিজেকে সঁপে দিচ্ছে। কোথায় গেল এই ভালোবাসা। স্বার্থের টানে এখন ভালোবাসাও বিক্রি হয়ে যায়। একটি গান একজন গীতিকার এমনি এমনিতেই লেখেন না। তখন প্রতিরাতে প্রতি মিনিটে এক লক্ষর মতো গুলিবর্ষণ হতো। বিশেষ করে সরকারি কর্মজীবীদের ধরে ধরে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে যাকে যে অবস্থায় পেয়েছে। যে কারণে এর থেকে বাঁচানোর জন্য বঙ্গবন্ধু তখন কর্ণেল ওসমানীকে নিয়ে আসেন। আমি ছোটবেলা থেকেই বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতাম।
 
যুদ্ধের এসব স্মৃতি বলবো না বলেই ভেবেছিলাম। তারপরও এই ইতিহাস এই প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। ওরা যে স্বাধীনতার সত্য ইতিহাস জানে না।