ফি রে দে খা ২ ০ ১ ৫

প্রযুক্তিবিশ্বের আলোচিত ১০ ঘটনা

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫, ০২:০৬
মোবাইল কম্পিউটিং, ইন্টারনেট অব থিংস, কানেক্টেড ডিভাইসের মতো সব প্রযুক্তির সাথে সাথে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর রূপবদল, নতুন নতুন ব্যবসায়িক কৌশল, সাইবার অপরাধীদের দৌরাত্ম্য—শেষ হতে যাওয়া বছরটিতেও প্রযুক্তিবিশ্বের নানা ঘটনা সাড়া ফেলেছে বছরজুড়ে। নানা ধরনের এসব ঘটনাবলী থেকে অন্যতম আলোচিত ১০টির কথা এই লেখায় জানাচ্ছেন সানজিদা সুলতানা
 
গুগল থেকে অ্যালফাবেট
 
চলতি বছরে এসে নতুন ব্যবসায়িক কৌশল গ্রহণ করে প্রযুক্তিবিশ্বকে চমকিত করেছে গুগল। অন্যরা যেখানে নিজেদের ক্রমবর্ধমান ধারার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে অঙ্গপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে, সেখানে গুগল নিজেদের জন্য গড়ে তুলেছে প্যারেন্ট কোম্পানি যার নাম রাখা হয়েছে অ্যালফাবেট। গুগল সার্চ, ইউটিউব, ক্রোম, অ্যান্ড্রয়েডের মতো মূল কিছু সেবাই এখন কেবল গুগলের অধীনে পরিচালিত হবে। গুগলসহ এর বাইরের গুগলের অন্যান্য সেবা বা পণ্যগুলো সরাসরি অ্যালফাবেটের অধীনে পরিচালিত হবে। গুগল মনে করছে, তাদের নতুন এই ব্যবসায়িক কৌশল তাদের প্রতিটি সেবা ও পণ্যকে আরও উন্নত করে তুলতে সহায়তা করবে।
 
মাইক্রোসফটের শেষ উইন্ডোজ
 
চলতি বছরে মাইক্রোসফটের পক্ষ থেকে প্রযুক্তিবিশ্বের জন্য চমক ছিল তাদের উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের সর্বশেষ সংস্করণ উইন্ডোজ ১০। উইন্ডোজের আগের সংস্করণগুলোর সাথে এর মূল পার্থক্যের জায়গা হলো—যেকোনো ধরনের ডিভাইসের আকৃতি অনুযায়ী এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইন্টারফেস গ্রহণ করবে। মাইক্রোসফট জানিয়েছে, এটিই উইন্ডোজের শেষ কোনো সংস্করণ। এর পর কেবল এর আপডেট অবমুক্ত করবে তারা। এর বাইরে অবশ্য মাইক্রোসফট তাদের নিজেদের তৈরি প্রথম ল্যাপটপ সারফেস বুক দিয়েও প্রযুক্তিবিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।
 
ইএমসিকে কিনে নিল ডেল
 
বছরের শেষ দিকে এসে অক্টোবর মাসে ডেল ঘোষণা করে তারা ইএমসিকে কিনে নিচ্ছে। আর এর জন্য ডেলকে খরচ করতে হয়েছে ৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর ফলে প্রযুক্তিবিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধরনের লেনদেনের স্বাক্ষী হয়েছে ডেল এবং ইএমসি। ইএমসিকে কিনে নেওয়ার মাধ্যমে ডেল হাইব্রিড ক্লাউড সিস্টেমের বাজারে নিজেদের কার্যক্রম প্রসারিত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার সুযোগ পাবে। বিশ্বব্যাপী পিসির বাজারে রূপান্তরের এই সময়ে নতুন বাজার তৈরির সুযোগও পাবে ডেল।
 
দুই ভাগে বিভক্ত হলো এইচপি
 
ঘোষণা এসেছিল বছরখানেক আগেই। তার বাস্তবায়ন দেখা গেল এ বছরের শেষের দিকে। প্রযুক্তিবিশ্বে এক নামে পরিচিত হিউলেট-প্যাকার্ড বা এইচপি এ বছরে এসে দুইটি আলাদা অংশে বিভক্ত হয়ে গেল। বিভক্ত হওয়ার পর এখন এইচপি ইনকরপোরেশন কেবল পার্সোনাল কম্পিউটার এবং প্রিন্টার নিয়ে কাজ করবে। আর এইচপি এন্টারপ্রাইজ দেখভাল করবে কর্পোরেট সেবা, সফটওয়্যার এবং আইটি সেবাগুলো। আলাদা আলাদা কোম্পানি হিসেবেই শেয়ার বাজারে থাকবে দুই এইচপি। এর মাধ্যমে এইচপির প্রতিটি ইউনিট আলাদা আলাদা করে নিজেদের পণ্যে আরও মনোযোগী হয়ে উন্নততর সেবা প্রদান করতে সক্ষম হবে বলে মনে করছে এইচপি।
 
অ্যাপল ওয়াচের চমক
 
সম্ভবত এ বছরের সবচেয়ে আলোচিত গ্যাজেট ছিল অ্যাপল ওয়াচ। স্মার্ট হাতঘড়ির বাজারে অ্যাপলের প্রবেশ অনুমিতই ছিল। এপ্রিলে এসে দেখা মিলল তার। বাজারের অন্যান্য স্মার্ট ওয়াচের তুলনায় অ্যাপল ওয়াচ সমাদৃত হলেও অ্যাপলের আইপড, আইফোন বা আইপ্যাড যেভাবে সাড়া ফেলেছে, তা অর্জন করতে ব্যর্থ হয় অ্যাপল ওয়াচ। তারপরেও অ্যাপল ওয়াচকে সফল একটি প্রযুক্তি পণ্য হিসেবেই স্বীকৃতি দিয়েছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা।
 
টেসলার গাড়িতে অটোপাইলট
 
স্বচালিত গাড়ি বাজারে আনার পরিকল্পনা নিয়ে গুগল কাজ করছে অনেকদিন থেকেই। তবে বাজারে বিক্রি হওয়া গাড়িতে এ বছরেই অটোপাইলট ফিচারটি যুক্ত করে ফেলেছে টেসলা। তাদের গাড়িতে অটোপাইলট ফিচার যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে চালকবিহীন অবস্থায় গাড়ি চালানোর বিষয়টি পরিণত হয়েছে বাস্তবতায়। অক্টোবরে সফটওয়্যার আপগ্রেডের মাধ্যমে ১০ লাখেরও বেশি গাড়িতে যুক্ত হয়ে গেছে এই ফিচারটি। এর পর থেকে গাড়িতে বসে হুইলে হাত না রেখেই গাড়ি চালানোর ভিডিও ছড়িয়েও পড়তে শুরু করেছে অনলাইনে।
 
লেনোভো-ডেলে ম্যালওয়্যার
 
বছরের শুরুর দিকেই লেনোভোর ল্যাপটপে সন্ধান পাওয়া যায় সুপারফিশ নামের একটি অ্যাডওয়্যার। ওই ল্যাপটপের গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্যই অনলাইন মার্কেটাররা এর মাধ্যমে হাতিয়ে নিতে পারে। লেনোভোর পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়, গ্রাহকদের উন্নততর অনলাইন শপিং অভিজ্ঞতা দিতেই এটি যুক্ত করা হয়েছিল ল্যাপটপে। শেষ পর্যন্ত এর জন্য ক্ষমাপ্রার্থণা করে পার পায় লেনোভো। একই ঘটনা ঘটে ডেলের ক্ষেত্রেও। নভেম্বরে এসে ডেল ল্যাপটপেও ইডেলসার্ট নামে একই ধরনের ম্যালওয়্যারের সন্ধান পাওয়া যায়। তারাও ক্ষমাপ্রার্থণা করে গ্রাহকদের কাছে। এর ফরে ব্লোটওয়্যার-বিরোধীরা আরও সরব হয়ে ওঠে।
 
ড্রোন ব্যবহারে নিবন্ধনের আইন
 
ড্রোনের বহুমুখী ব্যবহারের সম্ভাবনা একে সময়ের একটি আলোচিত প্রযুক্তি পণ্যে পরিণত করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এবারের ক্রিসমাসের সময়ে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া প্রযুক্তি পণ্যও হবে ড্রোন। এই ড্রোন ব্যবহারের জন্য আগে নীতিমালা না থাকলেও এবারে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের পক্ষ থেকে ড্রোন ব্যবহারের নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। এতে যেকোনো ধরনের ড্রোন ব্যবহারের জন্য এর নিবন্ধন থাকাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একে বাণিজ্যিকভাবে ড্রোনের সাফল্যের সম্ভাবনার প্রতিফলন হিসেবেই গণ্য করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা।
 
তথ্য স্থানান্তর বিষয়ে ইউরোপিয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা
 
ফেসবুক, গুগল, মাইক্রোসফটের মতো মার্কিন কোম্পানিরা ইউরোপিয় ইউনিয়নের দেশগুলোর নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য ‘সেফ হারবার’ শীর্ষক একটি চুক্তির আওতায় নিজেদের ডাটা সেন্টারে সংরক্ষণ করত। ইউরোপিয় ইউনিয়ন ও মার্কিন সরকারের মধ্যে এই চুক্তিটি সই হয়। কিন্তু চলতি বছরে এসে ইউরোপিয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এই চুক্তিকে বাতিল ঘোষণা করা হয়। ইউরোপের দেশগুলোর নাগরিকদের তথ্যের সুরক্ষার জন্যই মূলত এমন ঘোষণা আসে আদালতের রায়ে। ফলে এখন থেকে ফেসবুক, গুগল বা অন্য কোনো কোম্পানিকে গ্রাহকদের তথ্য নিজেদের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে সংরক্ষণ করতে হলে সরাসরি ইউরোপিয় ইউনিয়নের নীতিমালা অনুযায়ী এসব তথ্যের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
 
নেট নিউট্রালিটি ও ইন্টারনেটকে ঘিরে নীতিমালা
 

ইন্টারনেটের উন্মুক্ত মডেলই একে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছে এবং এর সুফল ভোগ করার সুযোগ করে দিয়েছে বিশ্বকে। কিন্তু ইন্টারনেটকে নিয়ন্ত্রণ করার পরিকল্পনা নিয়ে বেশকিছু প্রস্তাবনাই ছিল মার্কিন সরকারের কাছে। শেষ পর্যন্ত ইন্টারনেট ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে আইএসপি এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে সেসব পরিকল্পনার কোনোটিই বাস্তবায়ন করা যায়নি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইউএস ফেডারেল কমিউনিকেশন কমিশন ইন্টারনেটকে উন্মুক্ত রাখার ঘোষণা দিতেই বাধ্য হয়। এর বাইরে অবশ্য সাইবার সিকিউরিটি বিল ‘সিসা’ (CISA) পাস হয় যুক্তরাষ্ট্রে, যার মাধ্যমে প্রযুক্তি কোম্পানিরা সাইবার থ্রেটের তথ্য সরকারের সাথে শেয়ার করার সুযোগ পায়। ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপের মাধ্যমে অনলাইন কনটেন্টের কপিরাইট সুরক্ষার বিলও পাস হয়। এগুলোর সবগুলোর বিরুদ্ধেই প্রযুক্তিবিশ্ব সরব প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং জানিয়ে যাচ্ছে।