৫ম ও ৭ম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করায়

'সামরিক শাসনের সম্ভাবনা চিরতরে নির্বাসিত হয়েছে'

আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৫, ২১:০০
 
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, সংবিধানের ৫ম ও ৭ম সংশোধনীকে অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেছে সুপ্রিম কোর্ট। ওই রায়ে সংবিধান থেকে সামরিক আইন ও এর সংশোধিত ও সন্নিবেশিত বিধানসূমহ মুছে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে সামরিক শাসনের সম্ভাবনা চিরতরে নির্বাসিত হয়েছে এবং গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা ব্যহত করার সুযোগ পরাহত হয়েছে। শনিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আর্ন্তজাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে 'জাতীয় বিচার বিভাগীয় সম্মেলন-২০১৫'র উদ্বোধনী অনুষ্টানে সভাপতির ভাষণে প্রধান বিচারপতি এসব কথা বলেন।
 
তিনি বলেন, সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অগণতান্ত্রিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচনকে একটি মহলেল খেয়াল খুশি মত পরিচালনার ব্যবস্থা হয়েছিলো। ওই সংশোধনী আইন রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি জনগণের সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের প্রজাতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পরিচয় খর্ব করায় দেশের সর্বোচ্চ আদালত এটিকে অসাংবিধানিক ও অবৈধ বলে ঘোষণা করে। এই সংশোধনী বাতিল করে গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করতে নির্দেশ প্রদান করে। ফলে জনগণের সার্বভৌমত্ব ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
 
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, বিচার বিভাগের মামলার জট হ্রাস এবং মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে সর্বপ্রথম আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। করতে হবে বিচার বিভাগের সংস্কার।
 
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন বিশ্ব অর্থনীতির রোল মডেল যা বিশ্বব্যাংক কর্তৃক স্বীকৃত হয়েছে। তেমনিভাবে সকলের আন্তরিক প্রয়াস এবং সার্বিক সহযোগিতায় অচিরেই এদেশ এশিয়ার বিচার ব্যবস্থার রোল মডেল হিসেবে মাথা উচু করে দাড়াবে-এ আমার দৃঢ় প্রত্যাশা।
 
প্রধান বিচারপতি বলেন, স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর বাঙালি জাতি এটি দৃঢ়ভাবে বলতে পারবে যে দেশের বিচার বিভাগ গুণগত মান বজায় রেখে নিরন্তর বিচার কার্য পরিচালনা করছে। যা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালপ এর জরিপে স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় বিচার বিভাগের ভূমিকা অপরিসীম। বিচার বিভাগের সীমিত সম্পদ ও বাজেটের মাধ্যমে নিরন্তর দায়িত্ব পালন করছে। 'দুষ্টের দমন, শিষ্টের লালন' এ মহৎ উদ্দেশ্যকে ধারণ করে বিচার বিভাগ ইহার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে রাষ্ট্রের আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একটি দেশের বিচার বিভাগের দক্ষতা এবং দ্রুত বিচারের উপর ভিত্তি করে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হয়। সর্বোপরি আইনের মাধ্যমে উন্নয়নের নীতিতে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। কোন দেশের সরকারের কৃতিত্ব পরিমাপ করার সর্বোত্তম মাপকাঠি হচ্ছে তার বিচার বিভাগের দক্ষতা ও যোগ্যতা।
 
প্রধান বিচারপতি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের দখলদার বাহিনীর সহায়তায় স্থানীয় রাজাকাররা আমাদের দেশে নৃশংসতা চালায়। তারা ৩০ লাখ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে, ২ লাখ নারীর উপর নিপীড়ন চালায় এবং এর পরেও তারা প্রায় চার দশক বিচারহীনতার সুযোগ ভোগ করে। এ দেশের রাজাকার, আলবদর, আল শামসের সদস্যরা নতুন দেশটিকে মেধাশূণ্য করতে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বিজয় ক্ষণের প্রাক্কালে বুদ্ধিজীবীদের নৃশংসভাবে হত্যা করে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে সহায়তা যুগিয়েছিলো সেই যুদ্ধাপরাধীদের ৪২ বছর পর বিচারের মুখোমুখি করা হয়। তাদের কয়েকজনকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন-৭৩ এর আওতায় আইন অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হয়েছে এবং বিচার কাজ এখনো চলছে। নুরেমবাগ হত্যাকাণ্ড, সার্বিয়া ও কম্বোডিয়া বিচারের চেয়েও এ বিচার অনেক স্বচ্ছ এবং দ্রুততার সঙ্গে করা হয়েছে এবং হচ্ছে। ফলে সমগ্র জাতির দীর্ঘ দিনের কাঙ্খিত বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা অনেকাংশে পূরণ হচ্ছে। জেএমবির নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ও বিচারক হত্যা মামলার রায় প্রদান করে সব ধরণের সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স দেখিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং আইনের শাসন সুদৃঢ় করেছে।
 
তিনি বলেন, সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অগণতান্ত্রিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচনকে একটি মহলের খেয়াল খুশি মত পরিচালনার ব্যবস্থা হয়েছিলো। ওই সংশোধনী আইন রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি জনগণের সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের প্রজাতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পরিচয় খর্ব করায় দেশের সর্বোচ্চ আদালত এটিকে অসাংবিধানিক ও অবৈধ বলে ঘোষণা করে। এই সংশোধনী বাতিল করে গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করতে নির্দেশ প্রদান করে। ফলে জনগণের সার্বভৌমত্ব ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
 
প্রধান বিচারপতি বলেন, আমার ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং সুপ্রিম কোর্টের নিরবিচ্ছিন্ন মনিটরিং এবং প্র্যাকটিস ডিরেকশন ইস্যুর ফলে বিচারকদের মধ্যে দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির স্পৃহা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন আদালতে মোট মামলা নিষ।পত্তি হয়েছে ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩৩টি। বিগত বছরে এই নিষ্পত্তির সংখ্যা ছিলো ৯ লাখ, ৯৭ হাজার ৬৫২টি। এ ক্ষেত্রে তুলনামূলক নিষ্পত্তির শতকরা হার ১০৭ ভাগ।
 
তিনি বলেন, ১৩ শত বিচারক দ্বারা ২৭ লক্ষ মামলা নিষ্পত্তি করা অসম্ভব। এ ছাড়া প্রতিদিনই নতুন মামলা দায়ের হচ্ছে। এ জন্য মামলা নিষ্পত্তি করতে বিচারক সংখ্যা দ্বিগুন বৃদ্ধি করতে হবে। এ ছাড়া শত বছরের পুরনো সেকেলে দেওয়ানি কার্যবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি ও সাক্ষ্য আইন সংশোধন করে ডিজিটাল রেকর্ডিং, ভিডিও কনফারেন্সিং এবং ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন এর আইনগত ভিত্তি প্রদান করার জন্য আইনমন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করছে সুপ্রিম কোর্ট। তাই দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া অভিগম্য করার উদ্দেশ্যে একটি শক্তিশালী বিচার ব্যবস্থা কার্যকর করা অত্যাবশ্যাক। সংস্কার পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রচলিত আইন, আইন কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠানসূমহকে গতিশীল করা দরকার।