সকাল থেকেই ৪০ কারওয়ান বাজারের ইত্তেফাক ভবনটি রূপ বদলে অন্যরকম হয়ে ওঠে। শীতের কুয়াশায় বছরের শেষভাগের এই দিনটি দৈনিক ইত্তেফাকের জন্মদিন উপলক্ষেই সেজেছিল। তবে কোনো আড়ম্বড়পূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা নয়, একেবারে পরিবার নিয়েই ৬৩ বছরের সারাবেলা উদযাপনের উদ্যোগ নেয়া।
একে একে সকল বিভাগের কর্মীরা সম্পাদকের দফতরে সম্মিলিত আলোচনায় তখন। ঠিক আলোচনা বলাটা ভুলই হবে। ইত্তেফাক সম্পাদক তাসমিমা হোসেন সকলের সাথে মতবিনিময় করছিলেন, পাশাপাশি ইত্তেফাকের বর্ণাঢ্য ঐতিহ্যের গল্প শোনার পালা। একে একে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ব্যবসায়ীসহ নানান শ্রেনীপেশার মানুষেরা ইত্তেফাক সম্পাদকসহ গোটা পরিবারকে শুভেচ্ছা জানাতে এলো
IMG0
কেক কর্তন কাল
সম্পাদকের সাথে একে একে বিভিন্ন বিভাগের সহকর্মীরা যখন ছবি তোলা ও কেক কাটার জন্য পোজ দিচ্ছিলেন তখন ইত্তেফাক প্রজন্ম পাতার সম্পাদক রিয়াদ খন্দকার তার সেল ফোনে সম্পাদকের সাথে একটি সেলফী তোলার বাসনায় পুরো ফিচারবিভাগের একটি অনবদ্য ফ্রেমে পরিনত হয় ছবিটি।
সারাদিন সারাবেলা তারকাদের শুভেচ্ছা।
শুরতেই অভিনেতা শাকিব খান ফোন করে বিনোদন বিভাগকে শুভেচ্ছা জানান শিল্পী সমিতির পক্ষ থেকে। আমরা কোনো আনুষ্ঠানিকতা রাখিনি এদিন বলে পরে আনুষ্ঠানিক ভাবেই হাজির হবেন বলে জানালেন। এরপর একে একে অনেকেই শুভেচ্ছা জানালেন। রোজকার মতো ফিচার বিভাগের নিয়মিত পেজগুলোর মেকআপ ও বিনোদন প্রতিদিনের মেকআপের কাজগুলো চলছিলই। এদিকে অতিথিদের প্যাকেটে মিষ্টি বিতরণ আর আড্ডায় মুখর ছিল ৬৩ বছরের সেই বিকেল বেলা। অতঃপর সন্ধ্যায় বিনোদন বিভাগসহ ফিচারের ক’জন মিলে আড্ডা আলাপের উদ্যোগ নেয়া হলো। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা তৈরির কাজে ব্যস্ত সাহিত্য সম্পাদক ফারুক আহমেদ ও রাশি সংখ্যা তৈরিতে ব্যস্ত ফিচার ইনচার্জ খালেদ আহমেদ নিজেদের কাজ কাজ শেষ হতেও দেরী। এদিকে আড্ডা আর টুংটাং গানে গিটার নিয়ে হাজির গিটারিস্ট রাফিন। খানিক পরে একে একে হাজির তরুণ তুর্কীর বাকি শিল্পীরাও।
মীরাক্কেল জামিলের হাস্যরস দিয়েই আনন্দঘন্টা শুরু
IMG1
‘আমার ক্যারিয়ারের যে টুকু প্রাপ্তি ইত্তেফাকের জন্যই’ মীরাক্কেলের প্লাটফর্মের পর ইত্তেফাক বিনোদনই আমাকে এদেশে সবসময় সাপোর্ট দিয়ে এসেছে।’ জামিল গত বৃহস্পতিবার ফিচার বিভাগের ফ্লোরে এসেই জুড়ে দিলো এমন আলাপ। ততক্ষণে রিয়াদ খন্দকার ব্যস্ত ১০ তলার সাউন্ড সিস্টেমটা ওপরে নিয়ে আসা যায় কিনা। কিন্তু কোনো রকম আনুষ্ঠানিকতা বা ঘোষণা ছাড়াই ফিচার ফ্লোরে ‘সাধের লাউ বানাইলো মোরে বৈরাগী’ গানটি ধরে জামিল। এরপর একে একে বিভিন্ন ফোক গানের সাথে নিজের কথা, ইত্তেফাকের নানান গল্পের কথা বলে নাইলন স্ট্রিং গিটারের নানান সুরে বেসুরো তালে গাইতে লাগলো সে। ততক্ষণে তরুণ কণ্ঠশিল্পী এহসান রাহীও এসে হাজির। রাহী জানালেন,‘ ইত্তেফাকের এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কথা শুনেই ঘুরতে এলাম। এই পত্রিকাটা আমার কাছে অন্যরকম নস্টালজিয়ায় ভোগায়।
আমার বাবা প্রায়ই বলতেন,‘তুই কি শিল্পী হইলি, এখনও ইত্তেফাকেই তোর কোনো ছবি ছাপা হলো না। অতঃপর গেল বছর প্রথম যখন আমার ছবি ছাপা হয়, তখন আমার বাবা এত খুশী হয়েছিলেন, পুরো এলাকা জুড়ে সেই পত্রিকা সবাইকে দেখিয়েছিলেন। আমি আমার বাবার এই উচ্ছ্বাস দেখে অবাক হয়েছিলাম। সেই থেকে এই দৈনিকটি আমার কাছে অন্যরকম।’
এহসান রাহী গাইলেন, সত্যি করে বলবে কি ভালোবাসতে কেমন লাগে। রাহীর সুরের আবহ কাটতে না কাটতেই ওকে উঠে যেতে হলো, কারণ সেদিনই চট্টগ্রামে একটি স্টেজ শোতে অংশ নিতে ট্রেন ধরতে হবে তার।
IMG2
কাজী শুভ’র গান শোনার জন্য অফিসের অনেকেই অপেক্ষায় ছিলেন। বিশেষ করে সোনা বউ, বা শাহ আব্দুল করিমের সেই গান ‘তুমি বিনে আকুল পরাণ’। তখন কাজী শুভ দরদভরা কণ্ঠে প্রায় পিন পতন নিরবতা। এদিকে জানা গেলো রিয়াদ যে সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবহার করেছে, সেটি বিকল হয়ে গেছে। এই খবর শোনা মাত্রই জামিল চেঁচিয়ে উঠে আরো একটি গান শোনালেন। বললেন,‘ আমাদের গানে মাইক লাগে না ভাই। চলেন তিনটা গিটারেই শুরু করি। অমনি তিন গিটারের পাশাপাশি ইত্তেফাক মগ আর একটি চা চামচ নিসুর শুরু করলো সুরের সঙ্গত করা।
IMG3
হাস্যরস আর গানে মুখর হচ্ছিল যখন ইত্তেফাক ভবনের ১২ তলার গোটা ফিচার ফ্লোর তখন নিজ নিজ অফিস কক্ষে কাজে ব্যস্ত থাকা কার্যনির্বাহী পরিচালক মুহিবুল আহসান শাওন ও ব্যাবস্থাপনায় সম্পাদক আশিষ সৈকতও গুন গুন শব্দে ঘর থেকে বাইরে এসে খানিক সুরের আধার নিলেন। চেয়ার নিয়ে বসে গেলেন। ততক্ষণে অফিস ফ্লোর দখলে সাহিত্য পাতার সহকারী অতনু তিয়াস। অতনু তার দরাজ কণ্ঠে শোনালেন নিজের লেখা সুরের অনবদ্য দুটি ফোক গান। যদিও অতনু সকাল বেলাতেই সম্পাদকের বৈঠকে দুটি গান শুনিয়ে সবাইকে মুগ্ধতা ছড়িয়ে জানান দিয়ে গেছেন লেখালেখির পাশাপাশি গানেও চমক দিতে এসেছে এই তর“ন সহকর্মী। গিটারে অনেকক্ষন ধরেই সঙ্গত করছিলাম আমি ও জুয়েল মোর্শেদ। অবশেষে জুয়েল ‘বল তুমি আমায় ছেড়ে কোথায় যাবি’ গান দিয়ে শেষ হয়েও যেন হইলো না শেষ। সবাই মিলে তখন আবারও গিটারে ধরা হলো পবন দাস বাউলের গান ‘তোমার দিল কি দয়া হয় না’।
IMG4
৬৩ বছরের ইত্তেফাকের শেষ সন্ধ্যার স্মৃতিটি ধরে রাখার জন্য শিল্পী ও সহকর্মী সকলেই আমাদের ইত্তেফাক পরিচালক মুহিবুল আহসান এর সাথে একটি গ্রুপ ছবি তোলা হয়। সন্ধ্যা পেরিয়ে তখন শীতের ঘন রাত। গিটারের টুংটাং আওয়াজে একেবারে অনানুষ্ঠানিক গানের আসরও যে আন্তরিকার আলোয় অনবদ্য হয়ে যেতে পারে , তা আগত শিল্পী কাজী শুভ, জুয়েল মোর্শেদ, জামিল হোসেন ও এহসান রাহীরা আরো একবার প্রমান করলো। শুভকামনা দৈনিক ইত্তেফাকের সকল সুহৃদকে।
