ন্যায় বিচার মৌলিক অধিকার :রাষ্ট্রপতি

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৫, ০০:৪৪
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, ন্যায় বিচার প্রাপ্তি মানুষের মৌলিক অধিকার; কিন্তু নানা কারণে জনগণ সেই মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে। তিনি বলেন, বিচারকরা জাতির বিবেক। তাই সংবিধান, আইনের প্রতি অবিচল আস্থা, দেশ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে বিচারকরা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবেন এটাই প্রত্যাশা।
 
গতকাল শনিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জাতীয় বিচার বিভাগীয় সম্মেলন-২০১৫’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। সম্মেলনের সভাপতি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, বিচার বিভাগের মামলার জট হ্রাস এবং মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে সর্বপ্রথম আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। করতে হবে বিচার বিভাগের সংস্কার। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন বিশ্ব অর্থনীতির রোল মডেল যা বিশ্বব্যাংক কর্তৃক স্বীকৃত হয়েছে। তেমনিভাবে সকলের আন্তরিক প্রয়াস এবং সার্বিক সহযোগিতায় অচিরেই এদেশ এশিয়ার বিচার ব্যবস্থার রোল মডেল হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে-এ আমার দৃঢ় প্রত্যাশা।
 
সম্মেলনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিগণ ছাড়াও নিম্ন আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৩শ বিচারক অংশ নেন। উদ্বোধনের পর সম্মেলনের পরবর্তী দুইটি সেশনে নিম্ন আদালতের বিচারকরা তাদের ভৌত অবকাঠামোগত সমস্যাসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা প্রধান বিচারপতির নিকট তুলে ধরেন। বিচারকদের এসব সমস্যা সম্পর্কে অবহিত আছেন এবং সেই সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন মর্মে নিম্ন আদালতের বিচারকদের আশ্বাস দেন প্রধান বিচারপতি।
 
রাষ্ট্রপতি বলেন, একটি আবেদনের শুনানি সমাপ্তের পর বা মোকদ্দমার যুক্তিতর্ক শুনানির পর আদেশ লাভে যাতে বিলম্ব না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এতে বিচার বিভাগের প্রতি যেমন জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে, তেমনি বিচারকরাও বিবেকের নিকট স্বচ্ছ থাকবেন। তিনি বলেন, ‘জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড’- এ নীতিবাক্য আমাদের বিচার ব্যবস্থায় প্রচলিত থাকুক আমরা তা আর চাই না।
 
তিনি বলেন, মামলা পরিচালনায় আইনজীবীদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। তাই অহেতুক বিলম্ব বা অত্যধিক আর্থিক চাপের কারণে বিচার কার্যক্রম যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় এবং বিচারপ্রার্থীরা যাতে ন্যায় বিচার পায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হচ্ছে- বিলম্বে বিচার ও মামলা জট। এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে। দায়িত্বপালনে নিরপেক্ষ থেকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বিচারকরা সর্বোচ্চ আন্তরিক হবেন- জনগণ তা প্রত্যাশা করে।
 
প্রধান বিচারপতি বলেন, সংবিধানের ৫ম ও ৭ম সংশোধনীকে অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেছে সুপ্রিম কোর্ট। ওই রায়ে সংবিধান থেকে সামরিক আইন ও এর সংশোধিত ও সন্নিবেশিত বিধানসূমহ মুছে ফেলে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে সামরিক শাসনের সম্ভাবনা চিরতরে নির্বাসিত এবং গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করার সুযোগ পরাহত হয়েছে। সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীকে সুপ্রিম কোর্ট অসাংবিধানিক ঘোষণা করায় জনগণের সার্বভৌমত্ব ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
 
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় বিচার বিভাগের ভূমিকা অপরিসীম। বিচার বিভাগ সীমিত সম্পদ ও বাজেটের মাধ্যমে নিরন্তর দায়িত্ব পালন করছে। ‘দুষ্টের দমন শিষ্টের লালন’ এ মহত্ উদ্দেশ্যকে ধারণ করে বিচার বিভাগ ইহার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একটি দেশের বিচার বিভাগের দক্ষতা এবং দ্রুত বিচারের উপর ভিত্তি করে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হয়। কোনো দেশের সরকারের কৃতিত্ব পরিমাপ করার সর্বোত্তম মাপকাঠি হচ্ছে তার বিচার বিভাগের দক্ষতা ও যোগ্যতা।
 
প্রধান বিচারপতি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের দখলদার বাহিনীর সহায়তায় স্থানীয় রাজাকাররা আমাদের দেশে নৃশংসতা চালায়। তারা ৩০ লাখ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে, ২ লাখ নারীর উপর নিপীড়ন চালায় এবং এরপরও তারা প্রায় চার দশক বিচারহীনতার সুযোগ ভোগ করে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে সহায়তা যুগিয়েছিলো সেই যুদ্ধাপরাধীদের ৪২ বছর পর বিচারের মুখোমুখি করা হয়। নুরেমবাগ হত্যাকাণ্ড, সার্বিয়া ও কম্বোডিয়া বিচারের চেয়েও এ বিচার অনেক স্বচ্ছ এবং দ্রুততার সঙ্গে করা হয়েছে এবং হচ্ছে। ফলে সমগ্র জাতির দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা অনেকাংশে পূরণ হচ্ছে।
 
প্রধান বিচারপতি বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন আদালতে মোট মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩৩টি। বিগত বছরে এই নিষ্পত্তির সংখ্যা ছিলো ৯ লাখ ৯৭ হাজার ৬৫২টি। এক্ষেত্রে তুলনামূলক নিষ্পত্তির শতকরা হার ১০৭ ভাগ। তিনি বলেন, ১৩ শ’ বিচারক দ্বারা ২৭ লক্ষ মামলা নিষ্পত্তি করা অসম্ভব। এছাড়া প্রতিদিনই নতুন মামলা দায়ের হচ্ছে। এজন্য মামলা নিষ্পত্তি করতে বিচারক সংখ্যা দ্বিগুণ বৃদ্ধি করতে হবে।
 
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, বিচারের মর্যাদাকে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে আমাদেরকে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে দূর করতেই হবে। কারণ আমরা দীর্ঘদিন একনায়কত্বের অধীনে ছিলাম। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে দূর করে একটি ভারসাম্য সেখানে আনতে হবে এবং বিগত ৬ বছর ধরে আমরা অত্যন্ত কঠোরভাবে সেই ভারসাম্য তৈরি করার চেষ্টা করছি।
 
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, অষ্টম পে-স্কেলের সঙ্গে সমন্বয় করে বিচারকদের বেতন ও জুডিশিয়াল ভাতা শিগগিরই ঘোষণা করা হবে। এর ফলে বিচারকরা আর্থিকভাবে যে রকম লাভবান হবেন, পাশাপাশি মর্যাদাও বাড়বে।
 
সম্মেলনে তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল জ্যেষ্ঠ জেলা জজ সৈয়দ আমিনুল ইসলাম, প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালের সদস্য জ্যেষ্ঠ জেলা জজ মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। সম্মেলনে ২০০৫ সালে ১৪ নভেম্বর বোমা হামলায় নির্মমভাবে নিহত ঝালকাঠি জেলা ও দায়রা আদালতের সিনিয়র সহকারী জজ জগন্নাথ পাঁড়ে এবং মো. সোহেল আহমেদের পরিবারকে সুপ্রিম কার্টের পক্ষ থেকে অনুদান দেয়া হয়। রাষ্ট্রপতি নিহত দুই বিচারকের স্ত্রীর হাতে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র তুলে দেন।
 
৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের জন্য একযোগে কাজ করতে হবে
 
সিলেট অফিস জানায়, রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীন বাংলাদেশকে আপন মহিমায় সমুন্নত রাখতে আমাদেরকে একযোগে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি। তার স্বপ্ন ছিল স্বনির্ভরতা ও নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ গড়া। তাঁর আদর্শকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে সরকারের বহুমুখী কর্মসূচি রয়েছে। শনিবার বিকালে সিলেট ক্যাডেট কলেজ মাঠে ওল্ড ক্যাডেট এসোসিয়েশন অব সিলেটের (ওকাস) ৭ম পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
 
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ওকাস সভাপতি শাহনূর আলম, সিলেট ক্যাডেট কলেজের অধ্যক্ষ কমান্ডার সাইফুর রহমান।
 
বেলা দুপুর ১টায় রাষ্ট্রপতি সিলেটে এসে প্রথমে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার জিয়ারত করেন।
 

গত বৃহসপতিবার থেকে সিলেট ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন ক্যাডেটদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। গতকাল ব্যান্ডদল ‘এলআরবি’র পরিবেশনার মধ্য দিয়ে সিলেট ক্যাডেট কলেজের ৭ম পুনর্মিলনীর পরিসমাপ্তি ঘটে।