দেশের আদালতগুলোতে গত এক বছরে মামলা নিষ্পত্তির হার বেড়েছে শতকরা ১৬২ ভাগ। অন্যদিকে ২০১৪ সালে আপিল বিভাগে যেখানে ৫ হাজার মামলা নিষ্পত্তি হয়েছিল সেখানে গত বছর নিষ্পত্তি হয়েছে প্রায় ১০ হাজার। একইভাবে নিম্ন আদালতে গত বছর প্রায় ১১ লাখ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এ সংখ্যা ২০১৪ সালের তুলনায় এক লাখেরও বেশি। আর চলতি ২০১৬ সালকে মামলার জট নিরসনের বছর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। শুধু মামলা নয় সুপ্রিম কোর্টের বার্ষিক ছুটিও কমেছে। এসব ছাড়াও বিচারাঙ্গনে গ্রহণ করা হয়েছে নানা সংস্কারমূলক পদক্ষেপ। অনলাইনে উচ্চ আদালতের দিনের মামলা নিষ্পত্তির কার্যতালিকাও পাওয়া যাচ্ছে। জামিন এবং আদেশের জাল জালিয়াতি বন্ধ হয়েছে। আদালতে স্থাপন করা হয়েছে অভিযোগ বাক্স। এখন এই বাক্স খোলা হয় নিয়মিত। এ ছাড়া সিনিয়র বিচারপতিদের সমন্বয়ে বেঞ্চ পুনর্গঠন, সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ, সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হওয়ার পর তা সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সাক্ষ্য গ্রহণ পর্ব অব্যাহত রাখাসহ বিচারকদের পূর্ণ কর্মঘণ্টা কাজে ব্যয় করার নির্দেশনা দিয়ে বেশ কিছু আদেশ জারি করেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। এর ফলে বিচার বিভাগের কাজে গতি এসেছে বলে সিনিয়র আইনজীবীরা অভিমত দিয়েছেন। তারা প্রধান বিচারপতিকে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
গত বছর ১২ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান আপিল বিভাগের বিচারক এসকে সিনহা। এর মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসে এই প্রথম সনাতন ধর্মাবলম্বী আদিবাসী সম্প্রদায়ের কেউ প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। শপথ নেয়ার পরদিন ১৮ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতিকে এক নম্বর এজলাসে সংবর্ধনা দেয় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ও অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়। ওই সংবর্ধনায় প্রধান বিচারপতি মামলার জট কমানো, সুপ্রিম কোর্টের ছুটি হ্রাস, নিম্ন আদালতের বিচার কাজে গতি বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রণসহ দেশে ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও মানবাধিকার রক্ষায় উচ্চ আদালতের ভূমিকার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সিনিয়র আইনজীবীরা মনে করেন, এর ধারাবাহিকতায় সংস্কারমূলক অনেকগুলো পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হয়েছে।
অনলাইনে জামিন নিশ্চিতকরণ: হাইকোর্টের কোনো বেঞ্চ হতে কোনো মামলায় আসামিকে জামিন দেয়া হলে নিম্ন আদালতে আদেশের কপি পাঠিয়ে জামিনের বিষয়টি অবহিত করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় উচ্চ আদালতের আদেশের কপি জাল হওয়ার খবর মাঝে মধ্যে পাওয়া যেত। অনেক সময় নিম্ন আদালত হতে টেলিফোন করে প্রেরিত আদেশের সত্যতা যাচাই করা হতো। এ প্রক্রিয়া সময় সাপেক্ষ ও হয়রানিমূলক হওয়ায় এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দুই মাস আগে সুপ্রিম কোর্টে চালু হয়েছে ‘বেইল কনফার্মেশন সফটওয়্যার’। এই সফটওয়্যারে প্রতিটি জামিনের আদেশ স্ক্যান করে আপলোড করা হয়। একই সঙ্গে এ সংক্রান্ত একটি আদেশ নিম্ন আদালতে প্রেরণ করা হয়। নিম্ন আদালত হতে পৃথক পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে এই সফটওয়্যারে প্রবেশ করে স্ক্যানকৃত আদেশের সাথে তাদের কাছে প্রেরিত আদেশের মিল আছে কি না তা যাচাই করা হয়। মিল থাকলে আসামিকে জামিনে মুক্তি দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
সুপ্রিম কোর্টের ছুটি হ্রাস:সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটি তিন দিন হ্রাস করেছেন প্রধান বিচারপতি। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিচারকদের ফুল কোর্ট সভায় এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটি ছিল ৬৫ দিন। চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬২ দিনে। একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রধান বিচারপতি ২৫ দিন অবকাশকালীন ছুটি কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ফুল কোর্ট সভায় এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে প্রাথমিকভাবে ৩ দিন কমানো হয়।
অনলাইন কজলিস্ট:বিচার বিভাগ ডিজিটালাইজেশনের অন্যতম পদক্ষেপ হচ্ছে অনলাইন কজলিস্ট। এ ব্যবস্থায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিভিন্ন কোর্টের কজলিস্ট অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। মামলার শুনানির আগের রাত ৮টার মধ্যে পরের দিনের কোর্টের কজলিস্ট অনলাইনে দেখা যায়। এর আগে এ ব্যবস্থা ছিল শুধু আপিল বিভাগের ক্ষেত্রে। জানা গেছে, দেশের জেলা আদালতগুলোর মামলার কার্যতালিকাও পর্যায়ক্রমে অনলাইনে আনা হবে।
মামলা নিষ্পত্তির হার:সুপ্রিম কোর্টের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত আপিল বিভাগে ৯ হাজার ৩৫৬টি এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৩৩ হাজার ৩৮০টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। ২০১৪ সালে একই সময়ে মামলা নিষ্পত্তি হয়েছিলো আপিল বিভাগে ৫ হাজার ৭৮৯টি ও হাইকোর্টে ২২ হাজার ৪৭৭টি। নিষ্পত্তির হার বৃদ্ধি পেয়েছে শতকরা ১৬২ ভাগ। এদিকে নিম্ন আদালতের বিচারকগণ ২০১৫ সালে মামলা নিষ্পত্তি করেছেন ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩৩টি। এর আগের বছর একই সময়ে মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ৯ লাখ ৯৭ হাজার ৬৫২টি। মামলা নিষ্পত্তির হার বৃদ্ধি পেয়েছে শতকরা ১০৭ ভাগ।
মামলা জট নিরসনের বছর ঘোষণা:গত ২৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজন করা হয়েছিলো প্রথম জাতীয় বিচার বিভাগীয় সম্মেলন। সম্মেলনে দেশের নিম্ন আদালতের ১৪শ বিচারক অংশ নেন। ওই সম্মেলনে ২০১৬ সালকে মামলা জট নিষ্পত্তির বছর হিসেবে ঘোষণা দেন প্রধান বিচারপতি। ওই সম্মেলনে এসকে সিনহা বলেন, যেসব মামলা বছরের পর বছর পড়ে আছে সেগুলো আমরা প্রায় অর্ধেক কমিয়ে আনব। বিচারকদের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমাদের বিচার ব্যবস্থায় মামলাজট ও বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা জনগণের বিচার লাভের ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায়। নিম্ন আদালতগুলোতে প্রায় ২৭ লাখ মামলাজট আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি। আমাদের অবশ্যই মামলাজটের দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে হবে। এজন্য আদালতের পুরো সময়কে বিচার কাজে ব্যয় করতে হবে। এখন মধ্যাহ্ন বিরতির পর নিম্ন আদালতের বিচারকরা যাতে বিচারকাজ করেন তা মনিটরিং করা হচ্ছে।
পুরস্কার প্রবর্তন:আইনের শাসন, মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় স্বতন্ত্র এবং কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সুপ্রিম কোর্ট কোন প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, ব্যক্তি অথবা সরকারি কর্মকর্তাকে ‘প্রধান বিচারপতি পুরস্কার’ এ ভূষিত করবে। আইনের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও সৃজনশীলতাকে উত্সাহিত করাই হবে পদক প্রদানের উদ্দেশ্য। সুপ্রিম কোর্টের বাজেটের নির্ধারিত বরাদ্দ হতে পুরস্কার প্রদান কার্যক্রমের ব্যয়ভার নির্বাহ করা হবে। প্রধান বিচারপতির এ পুরস্কারের মধ্যে পদক, স্মারক ও সম্মাননাপত্র অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
হাইকোর্ট বিভাগের নথি ব্যবস্থাপনা:অভিযোগ রয়েছে, হাইকোর্ট বিভাগে অনেক সময় মামলার নথি খুঁজে পাওয়া যেত না। প্রধান বিচারপতি বিভিন্ন নির্দেশনার মাধ্যমে মামলার নথি এবং তার আদেশের কপি সংরক্ষণে শৃঙ্খলা এনেছেন। এ বিষয়ে শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে নথি ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। ফলে নথি ব্যবস্থাপনায় পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি স্বচ্ছ ও গতিশীল এসেছে।
অভিযোগ বাক্স স্থাপন:সুপ্রিম কোর্টে স্থাপন করা হয়েছে অভিযোগ বাক্স। বিচার বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দুর্নীতি, অনিয়ম ও দায়িত্বে অবহেলা সম্পর্কিত অভিযোগ এই বাক্সে দেয়ার জন্য বিচারপ্রার্থীদের আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ব্যবস্থা আগেও ছিলো। কিন্তু কয়েক দিন যাওয়ার পর ওই বাক্স আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। বর্তমান প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর পুনরায় অভিযোগ বাক্স স্থাপন হয়। বাক্স স্থাপনের পর এ পর্যন্ত ১০৩টি অভিযোগ নিষ্পত্তির উদ্দেশে কমিটি কর্তৃক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অভিযোগ যাচাই-বাছাই করার জন্য গঠন করা হয়েছে একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি।
জেলা জজের পদ সৃষ্টি: দেশের আদালতগুলোতে জেলা জজের অনেকগুলো পদ শূন্য ছিলো। বর্তমান প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর জেলা জজ পদমর্যাদার ৪১টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল (সহায়ক পদসহ) সৃজনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের রিসার্চ ইউনিটের সহায়তায় একটি অনলাইন বুলেটিন (ল রিপোর্ট) চালু করা হয়েছে। বুলেটিনে আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ রায় প্রকাশ পেয়ে থাকে। প্রধান বিচারপতির নির্দেশনা অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট মেডিক্যাল সেন্টারের বিদ্যমান সুবিধাদি বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। তৈরি করা হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগণের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ডাটা বেইজ। এছাড়া সুপ্রিম কোর্টে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের শিশু সন্তানদের দেখাশুনার জন্য স্থাপন করা হয়েছে ডে-কেয়ার সেন্টার।
