জ্যোতি সিনহা। এই সময়ের মঞ্চের সবচেয়ে আলোচিত ও দক্ষ অভিনেত্রী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃ-বিজ্ঞান বিষয়ে এমএ ডিগ্রি নিয়েছেন। জন্ম মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ থানার ঘোড়ামারা গ্রামে। সেই গ্রামেই শুভাশিস সিনহার নাট্যদল মণিপুরী থিয়েটারে ১৯৯৭ সালে শিশু শিল্পী হিসেবে যোগদান করেন। তারপর থেকেই মণিপুরী থিয়েটারে অভিনয় করে চলেছেন দাপটের সঙ্গে। দুিদন আগে তাদের নাট্যদল ঢাকায় এসেছিল ‘ইঙাল আঁধার পালা’ নাটক নিয়ে। শিল্পকলার গাড়ি বারান্দায় বসে তার সঙ্গে কথা হয় অভিনয়ের নানা বিষয় নিয়ে। তারই উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরেছেন পীযূষ সিকদার
গ্রামে বসে মানসম্পন্ন নাটক করে যাচ্ছেন, অভিনয় করে যাচ্ছেন। কীভাবে সম্ভব হলো?
আসলে অভিনয় করব—এ রকম সুপ্ত ইচ্ছা তো ছিলই। সেই সুপ্ত ইচ্ছাকে উসকে দিয়েছিল ১৯৯৬ সালে মণিপুরী থিয়েটারের প্রথম প্রযোজনা ‘আজবপুরের বর্ষবরণ’ নাটকটি। যার রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছিলেন শুভাশিস সিনহা। নাটকটি দেখার পর ১৯৯৭ সালের এপ্রিলে শিশুশিল্পী হিসেবে মণিপুরী থিয়েটারে যোগ দিই। দলে কাজ করার পর দাদার (শুভাশিস সিনহা) কাজের ধরন ও থিয়েটারের প্রতি কমিটমেন্ট দেখে আমিও কমিটেড হয়ে গেলাম—থিয়েটার করব, অভিনয় করব। প্রথমদিকে এই থিয়েটার শখে করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও ছুটিতে এলে থিয়েটারই করতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে সিদ্ধান্তই নিলাম—থিয়েটার করব এবং গ্রামে বসেই থিয়েটার করব। এ নিয়ে প্রথমদিকে পরিবার ও আশপাশের মানুষদের নেতিবাচক ভঙ্গি ছিল। কিন্তু আমাদের সমাজ ও থিয়েটারের প্রতি কমিটমেন্ট এত চূড়ান্ত লেবেলে ছিল যে, এলাকার মানুষেরা আমাদেরকে মেনে নিল। তারাও আমাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করল। আজ গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ, কৃষক, ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে মণিপুরী থিয়েটার এগিয়ে চলছে সামনের দিকে।
এ পর্যন্ত মণিপুরী থিয়েটারের কী কী নাটকে অভিনয় করেছেন?
‘মেঘ বৃষ্টি রোদ’, ‘শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন’, ‘দেবতার গ্রাস’, ‘কহে বীরাঙ্গনা’, ‘ধ্বজো মেস্তরির মরণ’, লোরকার ইয়ের্মা অবলম্বণে মণিপুরী ভাষায় ‘লেইমা’, ‘ইঙাল আঁধার পালা’সহ ২০টির মতো নাটকে। আমাদের দলের বেশির ভাগ নাটকের রচয়িতা শুভাশিস সিনহা।
এই যে আপনার নিরাভরণ ও কমনীয় অভিনয় কৌশলটি দেখি, সেটি আয়ত্তে আনতে কোন অভিনয়রীতি আপনাকে সাহায্য করেছে?
আসলে কী, যে আবহে বড় হয়েছি, সেখানে ধর্মীয় কৃত্যে নৃত্যের অনিবার্যতা আছে। তাছাড়া আমাদের মণিপুরী অঞ্চলে লোকফর্ম হিসেবে নটপালা সময়ের আবর্তনে আজও টিকে আছে। এসব দেখে দেখে বড় হয়েছি। ইসলাম উদ্দিন পালাকার, কুদ্দুস বয়াতী, ব্রজ রানী সিনহার পালা দেখে দেখে আমাদের নিজস্ব অভিনয় রূপটি আয়ত্তে এনে নিজের মতো করে অভিনয় করি।
আপনি তো নিয়মিত অভিনয় করছেন, এক্ষেত্রে স্নানিস্লাভস্কির অভিনয় মেথড আপনার কাজে লেগেছে কি?
অবশ্যই। একটি চরিত্রনির্মাণে স্নানিস্লাভস্কির ১০টি সূত্রই আমি ফলো করি।
‘ইঙাল আঁধার পালা’ নাটকটি দেখলাম। অসাধারণ! কী অভিনয়ে কী বর্ণনায় কী ডিজাইনে! নাটকটি সম্পর্কে কিছু বলুন?
নাটকটি একটি নিরীক্ষাধর্মী প্রযোজনা। মণিপুরী ভাষায় ‘ইঙাল’-এর অর্থ আলো। মানে দাঁড়ালো ‘আলো-আঁধারের পালা’। আমাদের আত্মবিলুপ্তির কথাই এই নাট্যের মূল সুর হিসেবে এসেছে। নাটকটিতে দুটো ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে কথক বাংলা ভাষায়; আর যাদের কথা বলা হচ্ছে, তারা কথা বলছেন মণিপুরী ভাষায়।
এদেশে নাট্যকর্মীরা নাটক করার জন্য মুখ্য জায়গা হিসেবে ঢাকাকে বেছে নেন। আর আপনি ফিরে গেলেন গ্রামে!!
শিকড়ের টান। শিকড় বাদ দিয়ে মহীরুহ কল্পনা করা যায় না। তেমনি আমাদের শিকড় প্রোথিত হয়ে আছে বিভিন্ন লোকজ উপাদানে। আত্মপরিচয়ই বড় পরিচয়। নিজের পরিচয়টা হারাতে না দিয়ে বিশ্ব দরবারে হাজির করতে স্বভূগোলে স্বমানুষদের নিয়ে আমাদের পথচলা। সেখানে ঢাকা না গাঁওগেরাম সেটা মূল বিষয় না। কাজটা করে গেলেই শহর-গ্রাম এক হয়ে যাবে। আমরা ফিরে পাব আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, আমাদের থিয়েটার।
