প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ভাষা আন্দোলনের ফসল হিসেবেই তৎকালীন যুক্তফ্রন্ট সরকারের ২১ দফার ১৬ নম্বর দফার বাস্তবায়নে ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর গড়ে ওঠে বাঙালি জাতিস্বত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের বাতিঘর— বাংলা একাডেমি।’
তিনি বলেন, ‘গত ডিসেম্বরে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার ষাট বছর পূর্তি উৎসব উদ্যাপন করেছে। আমি এ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত পণ্ডিত-বুদ্ধিজীবী-গবেষক-রাজনীতিবিদ সবাইকে স্মরণ করছি।’
IMG0
এ বছরই বঙ্গবন্ধু উত্থাপিত ঐতিহাসিক ছয়-দফার পঞ্চাশ বছর অর্থাত্ সুবর্ণজয়ন্তী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ছয়-দফা ছিল প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর এক দফা অর্থাত্ স্বাধীনতা ঘোষণার প্রথম ধাপ। আমি জেনে অত্যন্ত আনন্দিত যে, বাংলা একাডেমি এবারের একুশের মাসব্যাপী আলোচনায় ছয়-দফাকে একটি আলোচ্য বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করেছে।’
IMG1
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘১৯৭১-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির একুশের অনুষ্ঠান উদ্বোধন করতে এসে এই প্রাঙ্গণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন— ‘আমাদের হাতে যে দিন ক্ষমতা আসবে সেদিন থেকেই দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে। বাংলা ভাষার পণ্ডিতেরা পরিভাষা তৈরি করবেন, তারপরে বাংলা ভাষা চালু হবে, সে হবে না’।’’
তিনি আরো বলেন, ‘‘তাঁর এই দূরদর্শী বক্তব্য সেদিন যেমন সবাইকে উদ্বেলিত করেছিল স্বাধীনতার স্বপ্নে, তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন উদ্বোধন করতে এসে এ বাংলা একাডেমি অঙ্গনেই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন— ‘আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি যেন শুধু শহরের পাকা দালানেই আবদ্ধ না হয়ে থাকে, বাংলাদেশের গ্রাম-গ্রামান্তরে কোটি কোটি মানুষের প্রাণের স্পন্দনও যেন তাতে প্রতিফলিত হয়’।’’
তৃণমূলের গণমানুষের জীবন ও সংগ্রাম দেশের কবি-লেখকদের সাহিত্যকর্মে ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি দেশের সকল নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর ভাষা-সংরক্ষণ ও বিকাশে মনোযোগী হবার জন্য প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ জানান। বক্তৃতার শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বাংলা একাডেমি নিয়ে তার স্মৃতিচারণ করেন।
তিনি বলেন, বাংলা একাডেমিতে তার অনেক সময় কেটেছে। তার প্রয়াত বন্ধু বেবী মওদুদকে নিয়ে তিনি এখানকার লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করতেন। অনেক সময় কাটাতেন।
শেখ হাসিনা বলেন, এখানে আসতে আমার খুব ভালো লাগে। তবে অনেক নিয়মে বন্দি থাকতে হয় এখন। সরকারি কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। আবার কবে বইমেলায় আগের মতো ঘুরে বেড়াতে পারবো! মুক্ত হয়ে বইমেলায় ঘুরে বেড়ানোর প্রত্যাশায় থাকলাম।
তিনি আরো বলেন, সারা বছরই এখন অনেক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বসে থাকি বইমেলা কখন আসবে। ফেব্রুয়ারি আমাদের প্রেরণা দেয়। প্রতিবাদের ভাষা শেখায় এই মাস। বিজয়ের পথ দেখায় এই মাস।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং এতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাঙালি জাতি কোনোদিন মাথা নত করেনি। আন্দোলন-সংগ্রাম করে আর বুকের রক্ত দিয়ে বাঙালি যুগে যুগে তার ন্যায্য দাবি আদায় করেছে। এরই মহত্তম প্রকাশ ঘটেছিল ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি।
প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করেন, শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতার প্রতিবাদ বিক্ষোভের কথা। ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে রফিক, জব্বার, বরকত, সালামসহ অনেক নাম না জানা ছাত্র-জনতার আত্মদানের কথা।
তিনি বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারির আঘাত শুধু আন্দোলনকারীদের উপরই ছিল না, এটা ছিল বাংলা ভাষা এবং বাঙালি জাতিসত্তার উপর আঘাত। ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে শিক্ষা আন্দোলন, ছয়-দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের ঐতিহাসিক নির্বাচন ও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় বাংলা একাডেমির অবকাঠামোগত এবং গবেষণাখাতে বিপুল অগ্রগতি-উন্নয়নের কথা উল্লেখ করেন। একইসঙ্গে বাংলা ভাষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাডেমির জাতীয় দায়িত্ব পালনের কথাও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, বাংলা ভাষার বিবর্তনমূলক অভিধানের মতো বড় কাজের পাশাপাশি অতি সম্প্রতি একটি নতুন আধুনিক বাংলা অভিধান, বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস এবং ৬৪ জেলার লোকজ সংস্কৃতির ইতিহাস প্রকাশ করে একাডেমি জাতীয় দায়িত্ব পালন করেছে।
একুশে গ্রন্থমেলা যাত্রার তিন দশক পেরিয়ে এখন বিশ্বের দীর্ঘ সময়ব্যাপী গ্রন্থমেলার স্বীকৃতি পেয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এ গ্রন্থমেলাকে কেন্দ্র করে দেশের নানাপ্রান্তের মানুষ এমনকি বহির্বিশ্বে বসবাসরত বাঙালিদের বিপুল সমাগম ঘটে। এই মেলা এখন পরিণত হয়েছে বৃহত্তর বাঙালির মিলনমেলায়। প্রবাসীদের কাছে এই মেলা বিশেষ উদ্দীপনার সৃষ্টি করে।
তিনি বলেন, বিশ্বের আর কোথাও একমাস বইমেলা হয় কি না আমার জানা নেই। তবু, একমাসেও যেন মন ভরে না। মনে হয় আর একটু বেশীদিন মেলা থাকলে ভাল হত।
প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে অমর একুশে ফেব্রূয়ারিকে স্বীকৃতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে বলেন, ‘১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর রফিকুল ইসলাম, আবদুস সালামের মতো প্রবাসী বাঙালিদের প্রচেষ্টায় এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আন্তরিক উদ্যোগে ২১ ফেব্রুয়ারি ইউনেস্কো কর্তৃক ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।’
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার নেপথ্য-তত্পরতার সঙ্গে যুক্ত প্রয়াত রফিকুল ইসলাম এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী প্রয়াত এএসএইচকে সাদেককেও এসময় স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে একুশে গ্রন্থমেলার মঞ্চে দেশের বাইরের বিদেশি লেখক-পন্ডিতদেরও সমাগম হচ্ছে। তাদের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে বাংলার সমৃদ্ধ ভাষা-সাহিত্যের বার্তা যেমন বহির্বিশ্বে পৌঁছে যাবে, তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির আলোয় আমরা নিজেদের সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হবো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ বঙ্গবন্ধুর একটি জীবনীগ্রন্থ দিয়ে বাংলা একাডেমির ব্রেইল প্রকাশনার শুভযাত্রা হলো। যে মানুষটি বাংলার সকল শ্রেণির মানুষের মুক্তির জন্য তার জীবন উত্সর্গ করেছেন, আমরা তারই প্রদর্শিত পথে দেশের সুবিধাবঞ্চিত শারীরিক প্রতিবন্ধী ভাইবোনদের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছি।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন,‘দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ভাইবোনেরা যেন বাংলা ভাষা-সাহিত্য এবং বাঙালির গৌরবময় ইতিহাসগাথা তাদের ভাষায় সহজে বুঝতে ও পড়তে পারে, সেজন্য বাংলা একাডেমি ব্রেইল বই প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে। এই ব্রেইল প্রকাশনা তাদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই প্রকাশনাধারা অব্যাহত থাকবে এবং পর্যায়ক্রমে আমাদের আরও গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্’াবলীর ব্রেইল সংস্করণ প্রকাশিত হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত বছরের অক্টোবরে জার্মানির বিশ্বখ্যাত ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক সংযোগ ঘটেছে। যার মধ্য দিয়ে বিশ্বমানের প্রকাশনা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এখানে উপসি’ত ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে আমি শুভে”ছা জানা”িছ।
প্রধানমন্ত্রী এসময় অর্থ-বাণিজ্য-শিক্ষা-শিল্প-সংস্কৃতিসহ সকলক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্য অর্জনের কথা উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব কাটিয়ে আমরা ধারাবাহিকভাবে ঈর্ষণীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছি। সামাজিক-অর্থনৈতিক সকল ক্ষেত্রে টেকসই ও মানবিক উন্নয়নে বাংলাদেশের বিপুল অগ্রগতি এখন আর শুধু আমাদের বক্তব্য নয় বরং বিশ্বের নামকরা অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরাও এই স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ সময়ের মধ্যে আমরা ক্ষুধা-দারিদ্র্য-অশিক্ষা-ধর্মান্ধতা-সামপ্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদ-শোষণ-বৈষম্য দূর করে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চাই।
অনুষ্ঠানে মাওলা ব্রাদার্সের প্রকাশনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রচিত ’সবুজ মাঠ পেরিয়ে’ গ্রন্থনের ব্রেইল সংস্করন এবং সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক রচিত একটি ছোটদের গ্রন্থের ব্রেইল ও অডিও ভার্সন প্রকাশ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনী পর্ব শেষে বইমেলার স্টলগুলো ঘুরে দেখেন।
খবর বাসসের।