ওমরাহ ভিসা নিয়ে এক বছরেও সংকটের নিরসন হয়নি। গত বছরের মার্চ থেকে বাংলাদেশিদের ওমরাহ ভিসা দেয়া বন্ধ রেখেছে সৌদি আরব সরকার। গত তিন মাস আগে ওমরাহ মওসুম শুরু হলেও কাটছে না ভিসা জটিলতা। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর জন্য ভিসা উন্মুক্ত করা হলেও বাংলাদেশিদের ওমরাহ ভিসা নিয়ে অনিশ্চয়তা শেষ হচ্ছে না। ইতিমধ্যে ২১ লাখ ৮২ হাজার জনকে ভিসা ইস্যু করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। যেখানে নেই বাংলাদেশ। ফলে ওমরাহ করার জন্য সুযোগ না পেয়ে প্রতিদিন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা এজেন্সিগুলোতে হয়রান হয়ে খবর নিচ্ছেন।
জানা গেছে,ওমরাহ ভিসায় আদম পাচার এবং সৌদি আরব গিয়ে কয়েক হাজার বাংলাদেশির ফেরত না আসার কারণে সৌদি সরকার কালো তালিকাভুক্ত (ব্ল্যাকলিস্টেড) করে বাংলাদেশকে। ভিসা দেয়া বন্ধ করে দেয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ এই আদম পাচারে জড়িত বাংলাদেশি হজ এজেন্সিগুলোর তালিকা তুলে দেয় বাংলাদেশ সরকারের হাতে। ইতিমধ্যে ১০৪টি এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। এদের মধ্যে ৬৯টির লাইসেন্স বাতিল ও কারো কারো আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে এবং কয়েকটির ব্যাপারে আবার তদন্ত হচ্ছে। আর এসব পদক্ষেপের ব্যাপারে সৌদি সরকারকে অবহিত করা হয়েছে।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, গত ১৪ ডিসেম্বর ওমরাহ ভিসা উন্মুক্ত করার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে সৌদি সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ২০ ডিসেম্বর ধর্ম মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে তা জানিয়েছে।
ধর্ম মন্ত্রণালয় এই তথ্য দিলেও সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাস এখনো ভিসা ইস্যু বন্ধ রেখেছে। হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) ভুক্ত একটি হজ এজেন্ট এর এমডি ইত্তেফাককে বলেন, সৌদি আরবের লোকাল হজ এজেন্টরা যতদিন বাংলাদেশের এজন্টদের উপর বিশ্বাস ফিরে না পাবে তত দিন কালো তালিকায় থাকবে বাংলাদেশ। সৌদি সরকার কালো তালিকা মুক্ত করলেও সেখানকার এজেন্টরা এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। কারণ তাদের প্রত্যয়নপত্র ছাড়া ভিসা ইস্যু করে না সৌদি দূতাবাস।
বাংলাদেশের একটি বিখ্যাত হজ এজেন্সির মালিক বলেন, বাংলাদেশের ওমরাহ যাত্রীদের জন্য আমাদের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রসেসিং চলছে। কিন্তু সৌদি থেকে সাড়া আসছে না। এমনকি বাংলাদেশিদের জন্য ওমরাহ ভিসার উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলেও তারা এখনও ‘লক কোড’ ওপেন করেনি। ফলে এবার বাংলাদেশিদের ওমরাহ পালন নিয়ে অনেক শঙ্কা রয়েছে।
সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ ইত্তেফাককে বলেন,বাংলাদেশকে কালোতালিকাভুক্ত করা হয়নি। আদম পাচারে জড়িত এজেন্সিগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকার অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।
তিনি বলেন,এতোদিন ওমরাহ ভিসা বন্ধ থাকার কারণ হলো-গত বছর ১৪ হাজার ওমরাহ হাজী সৌদি আরবে থেকে যান। বাংলাদেশের ওমরাহ হাজীরা এসেছিলেন বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে । এই এজেন্সিগুলো মুলত: সৌদি আরবের হজ এজেন্টদের হয়ে বাংলাদেশ থেকে লোক পাঠায়। গত বছরের ওই আদম পাচারের ঘটনার প্রেক্ষাপটে সৌদি সরকার স্থানীয় হজ এজেন্টদের বড় অংকের জরিমানা করে। কারো কারো লাইসেন্স বাতিল করে দেয়। বাংলাদেশি হজ এজেন্সির কারণে এই শাস্তি পেতে হয় তাদের। ফলে এবছর ওমরাহ মৌসুম শুরু হলেও সৌদি আরবের এজেন্টরা বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ হাজী নেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
গোলাম মসিহ বলেন,ভিসা ওপেন আছে। তবে সমস্যা তৈরি করেছে বাংলাদেশের কিছু হজ এজেন্সি।
হাব-এর সভাপতি মোহাম্মদ ইব্রাহিম বাহার ইত্তেফাককে বলেন,মূলত: সৌদি আরবের যে সব এজেন্ট কোম্পানীগুলোর মাধ্যমে আমরা ওমরাহ হাজী পাঠাই তারাই সমস্যার সৃষ্টি করেছে। ওরা সিস্টেম এলোমেলো করে দিয়েছে। তবে ঝামেলা অনেকটা মিটে গেছে। আমার নেতৃত্বে হাব -এর ৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল আগামীকাল ৮ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরব যাবে। সেখানে হজ চুক্তি হবে। এবং হজ এজেন্টদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা হবে। বাহার বলেন,আশা করছি এমাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ওমরাহ ভিসা ইস্যু নিয়ে জটিলতা নিরসন হবে। তিনি বলেন,ওমরাহ ভিসা প্রদান শুরু হলে বাংলাদেশ কোটা অনুযায়ী ৬০ হাজারের বেশি লোক যেতে পারবেন।
এদিকে মক্কার হোটেল ব্যবসায়ীদের নেতা ফেরদৌস চৌধুরী মিঠু ইত্তেফাককে বলেন, বাংলাদেশি ওমরাহ হাজীদের ভিসা প্রদান বন্ধ থাকায় মক্কার বাংলাদেশিদের মালিকানাধীন হোটেল ব্যবসায়ে মন্দা নেমেছে। হজের পর খাঁ খাঁ করছে হোটেলগুলো। এই হোটেলগুলোর মূল বোর্ডার বাংলা ভাষাভাষীরা। গত এক বছর ভিসা পাচ্ছেন না বাংলাদেশিরা। প্রতিবছর প্রায় এক লাখ ওমরাহ হাজী আসেন। তারা ওঠেন বাংলাদেশিদের হোটেলগুলোতে। এই অবস্থা আরো কিছু দিন চললে আমাদের এ ব্যবসা ছাড়তে হবে।
