ছাত্রদলের কমিটিতে ধর্ষণ মামলার আসামি, গুম নেতা

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ২০:৪৮
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের স্মরণকালের সর্ববৃহৎ পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে জোর আলোচনা-সমালোচনা চলছে দলের ভেতর-বাইরে। কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন সংগঠন থেকে ‘অবসরে’ যাওয়া, গুম হওয়া নেতা,কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভাঙচুরে জড়িত এমনকি ধর্ষণ মামলার আসামি।
 
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ১৫১ সদস্য বিশিষ্ট হওয়ার কথা থাকলেও এবারের কমিটি করা হয়েছে ৫৮৩ জনের। আংশিক কমিটি ঘোষণার ১৬ মাস পর শনিবার গভীর রাতে ঘোষণা করা হয় এই কমিটি।
 
খোদ ছাত্রদলের নেতারা বলছেন, দল ও সংগঠনের সব ‘সিন্ডিকেট’-এর ভাগ মেটাতে গিয়ে অস্বাভাবিক কমিটি দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন। পুনর্বাসিত করা হয়েছে পাঁচ শতাধিক নিষ্ক্রিয় কর্মীকে। তবে গুম হওয়া নেতাদের কমিটিতে রাখায় দলীয় চেয়ারপারসনকে সাধুবাদ জানিয়েছেন ছাত্রদলের কর্মীরা। গতকাল নয়া পল্টনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন নেতারা।
 
দীর্ঘ নাটকীয়তার পর শনিবার রাতে ছাত্রদলের কমিটির অনুমোদন দেন বেগম খালেদা জিয়া। এর আগে ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর রাজিব আহসানকে সভাপতি ও আকরামুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে ১৫৩ সদস্যের আংশিক কমিটি দেয়া হয়েছিল। এবার কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে গিয়ে নতুন করে ৫৮৩ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করেন বেগম জিয়া। আগের কমিটিতে জায়গা না পেয়ে বিদ্রোহ হলেও এবার সেই সম্ভাবনা কম। তাদের ভাষ্য-সবাইকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে কমিটিতে নেতার সংখ্যা বেড়ে গেছে।
 
ছাত্রদলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা সবাইকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে কমিটিতে নেতার সংখ্যা বেড়ে গেছে বললেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। জানা গেছে, আংশিক কমিটি গঠনের পর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দফায় দফায় বিক্ষোভ করেন ছাত্রদলের পদবঞ্চিত নেতারা। একপর্যায়ে ভাঙচুর করা হয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। জিয়াউর রহমানের ম্যুরালও হামলার হাত থেকে রক্ষা পায়নি।
 
মূলত অসন্তোষ দমাতেই পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে যথাসম্ভব বেশি নেতাকর্মীকে স্থান দেয়ার দিকে নজর রাখেন বিএনপির হাইকমান্ড। এ ছাড়া সামনে দলের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলন।  কমিটি নিয়ে নতুন করে যাতে বিদ্রোহ বা ক্ষোভ না প্রকাশ পায়, সে জন্য মোটামুটি ‘বিদ্রোহী’ সবাইকে কমিটিতে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া আংশিক কমিটির মতো পূর্ণাঙ্গ কমিটিতেও একাধিক সিন্ডিকেটের আবদার রাখতে গিয়ে ছাত্রদলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কমিটি দিতে হয়েছে বলে জানা গেছে।
 
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটির সঙ্গে ঘোষণা করা হয়েছে ১৫টি শাখা কমিটি। এর মধ্যে আছে ঢাকা মহানগর কমিটিও। আগে ঢাকা মহানগরে উত্তর-দক্ষিণ নামে দুটি শাখা থাকলেও এবার ঢাকা পূর্ব ও পশ্চিম নামে আরও দুটো শাখা বাড়ানো হয়েছে। ঢাকা মহানগর উত্তরে সভাপতি হয়েছেন মিজানুর রহমান রাজ ও সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন সাজ্জাদ হোসেন রুবেল। তবে রুবেলের বিরুদ্ধে স্কুলশিক্ষিকাকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় রুবেলের বিরুদ্ধে রাজধানীর বাড্ডার চাইল্ডকেয়ার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের একজন শিক্ষিকাকে ধর্ষণের মামলা হয়। বাড্ডা থানার ওই মামলায় (মামলা নং ৪৯) ২০০৫ সালে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। ওই অভিযোগে রুবেলকে সে সময়ে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।
 
ঢাকা মহানগর বিএনপির এক নেতার জোরালো সুপারিশে তাকে চূড়ান্ত তালিকায় রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু বলেন,দুঃসময়ে যাতে একজন জেলে গেলে অন্যজন নেতৃত্ব দিতে পারে,  হয়তো সেই চিন্তা থেকে বড় কমিটি করা হয়েছে। তবে এটা ঠিক হলো কি না তা প্রমাণ হবে আবার আন্দোলন শুরু হলে।
 
এদিকে পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে কয়েকজন গুম হওয়া ছাত্রদল নেতাও রয়েছেন। ছাত্রদলের নেতারা বলছেন,গুম হওয়া নেতারা ফিরে আসবেন এ আশায় তাদের নাম কমিটিতে রাখা রয়েছে। দীর্ঘদিন পর হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়েছে। এ কমিটির ফলে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নতুন মাত্রা পাবে। তবে অনেকেই মনে করছেন, সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলে গুম হওয়া নেতাদের কমিটিতে স্থান দেয়া বিএনপির একটি পলিসি। এতে করে সহানুভূতি অর্জন করা খুব সহজ। তাই আসছে বিএনপির কমিটিতেও গুম হওয়া নেতাদের স্থান দেয়া হবে বলেও জানা গেছে।
 
কমিটির তালিকায় স্থান পাওয়া গুম হওয়া নেতারা হলেন- সহ-সাধারণ সম্পাদক : মাহাবুব হাসান সুজন (সবুজবাগ), সেলিম রেজা পিন্টু (সূত্রাপুর)। সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক : ইফতেখার আহমেদ দিনার (সিলেট), মফিজুল ইসলাম রাশেদ (ঢাকা মহানগর পশ্চিম)। সদস্য : কাজী ফরহাদ হোসেন (সবুজবাগ), তেজগাঁও কলেজ শাখার সভাপতি আমিনুল ইসলাম জাকির, সহ-সভাপতি তরিকুল হাসান ঝন্টু, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ওমর আসাদুজ্জামান রানা, মাজহারুল ইসলাম রাসেল, মো. আল আমিন।
 
এদিকে কমিটিতে স্থান পাওয়ায় বিএনপির নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আনন্দ মিছিল করেছে ছাত্রদল। গতকাল রোববার সকাল থেকে কার্যালয়ে সামনে অবস্থান নিয়ে উল্লাস করেছেন তারা। এ সময় ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয় নতুন কমিটির নেতাদেরকে। সকাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর বিভিন্ন ইউনিটের নেতারা মিছিলসহ নয়াপল্টন কার্যালয়ের সামনে এসে জড়ো হন। এসময় তারা সংশ্লিষ্ট ইউনিটের নেতাদের পক্ষে আনন্দ মিছিল করে তাদেরকে স্বাগত জানান।
 
এ সময় নেতারা বলেন, দীর্ঘদিন পর হলেও কমিটি হওয়ায় কাজের গতি অনেক বেড়ে যাবে। সরকার বিরোধী আন্দোলনে নতুন কমিটির নেতারা জোরালো ভূমিকা রাখবেন।