১৯৪৮ সালেই পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ঘোষণা দিল, পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা হবে উর্দু। এর পর থেকেই ভাষা আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। আমি তখন তত্কালীন চট্টগ্রামের রাউজান থানায় মহামনি অ্যাংলোপালি ইন্সটিটিউশন স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি। এই স্কুলে ছেলে-মেয়ে সবাই এক সঙ্গে পড়তো। তখন কবি মাহবুবুল আলম চৌধুরী, দেবপ্রিয় বড়ুয়াসহ আরো অনেকে মিলে স্কুলের সুনীল আইচ নামে এক সিনিয়র ছাত্রের সহযোগিতায় আমাদের স্কুলে ছাত্র ফেডারেশন ও ছাত্রী সংসদ গঠন করলেন।
আমরা তখন অনেক ছোট হলেও আমাদের তখনই মনে হয়েছে, একটি দেশ কিন্তু তার দুই হাতের মাঝে হাজার মাইলের ব্যবধান থাকে তাহলে সেটা কেমন করে এক দেশ হতে পারে? তারপর সংখ্যালঘুদের ভাষা কীভাবে সংখ্যাগুরুদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়? ১৯৪৮ সালের শেষ দিকে আমি আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলি।
১৯৫১ সালে ড. খাস্তগীর গভর্ণমেন্ট গালর্স হাই স্কুল থেকে আমি ম্যাট্রিক পাস করলাম। চট্টগ্রাম কলেজে আইএ ভর্তি হলাম। ১৯৫২ সালে আমি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। সেই বছরের প্রথম থেকেই চারিদিক হয়ে উঠছে উত্তপ্ত। রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই — একথা ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। চট্টগ্রামে কবি মাহবুবুল আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হলো। তারপর তারা বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের সংগঠিত করছিলেন। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলি হওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়লো। তখন চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আমরা ছাত্রীরা বেরিয়ে আসলাম। আমি ছাড়াও তালেয়া রেহমান, অনিমা দিদি, সুলেখা দিদিসহ আরো অনেকে ছিলেন। আমরা মিছিল করতে করতে ড. খাস্তগীর গভর্ণমেন্ট গার্লস হাই স্কুলের গেটে আসলাম। স্কুল থেকে বেরিয়ে আসলো হালিমা, জওশন আরা বুলবুল, জাহানারা জুবেরি ছাড়াও আরো কয়েকজন মেয়ে। চট্টগ্রাম কলেজের ছেলেরা আমাদের একটি ট্রাক দিয়েছিল। ট্রাকে চড়ে আমরা চট্টগ্রাম শহরের সব স্কুলের সামনে দিয়ে শ্লোগান দিতে দিতে প্রদক্ষিণ করি।
২৩ ফেব্রুয়ারি লালদিঘী ময়দানে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার জন্য একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আমরা সভায় গিয়েছিলাম বক্তৃতা শুনতে। সমাবেশে কবি মাহবুবুল আলম চৌধুরীর ভাষা আন্দোলন নিয়ে লেখা প্রথম কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ হারুন-অর-রশীদ নামে একটি ছেলে আবৃত্তি করে শোনায়। উপস্থিত সবাই তখন রাগে ফেটে পড়ে। জেগে উঠে সারাদেশের মানুষ। শুরু হলো আমাদের জেগে উঠার দিন। লেখক: ভাষাসংগ্রামী
