গান বাড়ছে, মুনাফাও বাড়ছে ! ভয়ংকর ভাবে কমছে পারস্পরিক আস্থা !

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ২০:৩৩
 
 
গানের মেধাস্বত্ত্ব নিয়ে একদিকে যেমন নানান পক্ষের তুলকালাম; অন্যদিকে ভালোবাসা দিবসকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি জমে উঠেছে অডিও বাজার। এর মূল কারণ ডিজিটাল বাজারটা না হলে যে মিস হয়ে যায়! তবে ‘রয়্যালিটি’ নামের শুভংকরের ফাঁকি চলছেই সর্বোত্র। খুব করে বলার মতো রয়্যালিটি পেয়েছেন কোন শিল্পী বা কোন প্রকাশক উল্লেখ করার মতো কাকে রয়্যালিটি দিয়েছেন সেটিও কেউ জানেন না। কাইনিটিক, বঙ্গবিডি সহ একাধিক ডিজিটাল প্রমোটার ইউটিউব থেকে টাকা দেবার কথা তুললেও কেউ এই অর্থ পাচ্ছেন কেউ পাচ্ছেন না। স্বচ্ছতা এখানেও সেই ঘোলা জলের মাছ কুড়োনোর মতোইএর ভেতরে তরুন শিল্পী ও অ্যারেঞ্জাররা নিজেদের অ্যালবাম প্রকাশ করছেন, নিজেদের গানের প্রতি প্রকৃত প্রেম থেকেই।
 
অডিও বাজারে কম গানের অ্যালবাম প্রকাশের প্রবনতা
মূলত বিভিন্ন মৌসুমে তারকাদের অ্যালবাম প্রকাশের ফরমেট এখন বদলে গেছে। যেমন ফাহমিদা নবীর এক গানের অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন। এর বাইরে অনেকেই এক গানের ভিডিও বা অ্যালবাম প্রকাশ করছেন বিচ্ছিন্ন ভাবে। কারণ অডিও সিডি কেনার আগ্রহ বা উপায় যে এখন তলানিতে ঠেকেছে। পাশাপাশি অনেকের ঘরে অডিও সিডি প্লেয়ারই নেই। তাই ইউটিউব জ্যুকবক্স বা বিভিন্ন টেলিকমে গান প্রকাশ করাটাই শিল্পী-প্রকাশকদের মূল উদ্দেশ্য।
 
প্রকাশকদের ভাবমূর্তি যখন অগ্নিমূর্তি
সিনিয়র শিল্পীদের কাছে এখনও প্রকাশকরা কোনো ভালো মানুষ হিসেবে স্বীকৃত নন! অর্থাত্ কোনো অবস্থানগত পরিবর্তন এখনও হয়নি। তবে বিচ্ছিন্নভাবে সাম্প্রতিককালের কপিরাইট নিয়ে মাতপার্থক্যে কুমার বিশ্বজিত-আসিফ একসাথে এক মঞ্চে কথা বলছেন-এটাই অবাক করা ঘটনা। এর সাথে লেজার ভিশনের আরিফুর রহমান, বা সিডি চয়েসের কর্ণধার জহিরুল ইসলাম সোহেল, সিএমভি’র পাপ্পুও রয়েছেন শিল্পীদের সাথে শখ্যতায়। এরকম বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দার মতো তাই কিছু প্রকাশক-শিল্পীদের এখন একমঞ্চে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে কুমার বিশ্বজিতের সাথে আসিফের দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য ও দ্বন্দ্ব মিডিয়ায় প্রচলিত থাকলেও নিজেদের সংকটের ঐক্যে তারা একাত্ম হয়েছেন।
সাবিনা ইয়াসমিন, বামবা সভাপতি রক লিজেন্ড হামিন আহমেদ, আলাউদ্দিন আলীসহ একাধিক সিনিয়র শিল্পীরা সম্প্রতি সংস্কৃতিমন্ত্রনালয়ের সাথে আলাদা একটি আলোচনায় নতুন একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছলেই মূলত অন্য শিল্পীরা একাত্মতা প্রকাশ করেন।
এদিকে কুমার বিশ্বজিত, আসিফ ইকবাল, আসিফদের ডাকা মিটিং এ আরেক বরেণ্য রকস্টার আইয়ুব বাচ্চু হাজির থাকলেও পরবর্তীতে একটি অনলাইনে তিনি বলেন, ‘আমি কারো পক্ষেই নই। এই বিচ্ছিন্নতা, মতপার্থক্য আমি চাই না।’
মূলত কেউই চান না। কিন্তু সবার সম্মিলিত চেষ্টাতে একটি সমাধানেও যে কেউ আসতে পারছেন না! অডিও ইন্ডাষ্ট্রির ব্যর্থতা এখানেই। তাই প্রকাশকদের শিল্পীরা কেউ কেউ আজো শত্রু ভেবেই ইন্ডাষ্ট্রিতে কাজ করে যাচ্ছেন।
 
IMG0
শিল্পী-অ্যারেঞ্জার কাম প্রকাশক বেড়েছে
শিল্পীদের যখন ‘রয়্যালিটি’ শব্দের সাথে কোনো আস্থা নেই। শিল্পী প্রকাশকদের সাথে আস্থার দূরত্ব বিদ্যমান তখনই তারা নিজেরাই অ্যালবাম প্রযোজনায় নামছেন। এক্ষেত্রে যারা এককালীন সম্মানীতে প্রকাশকদের সাথে অ্যালবাম করছেন তারাই নিয়মিত রয়েছেন। তবে বাজার চলতি শিল্পীরাই কাজ করছেন নিয়মিত। এবারে সিডি চয়েজের ব্যানারে একাধিক শিল্পীর একাধিক অ্যালবাম বের হয়েছে। তবে ভালোবাসা দিবসের বাজারে তাহসান, ইমরান, বাপ্পা মজুমদার, ন্যান্সি ও কাজী শুভ নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী একাধিক গান নিয়ে এসেছেন।
নিজের ব্যক্তিজীবনে মহাবিতর্ক ও নিন্দিত হয়ে আবারও ক্যারিয়ার হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন আরফিন রুমী। আর হাবিব প্রচলিত প্রকাশনার বাইরে  নিজের সিঙ্গেলস ভিডিও রিলিজ দেবার এক্সপেরিমেন্টেও এখনও সফল হতে পারেননি।
এ প্রসঙ্গে সিডি চয়েজের কর্ণধার বলেন, ‘প্রকাশকদেরও অডিও বাজারের পরিবারের অন্যতম অংশ মনে করতেই হবে। অনেকেই আমাদের বাদ দিয়ে অডিও ইন্ডাষ্ট্রির জাগরণের কথা ভাবছেন। আমি মনে করি না, এটা কোনো যৌক্তিক সমাধানের পথ।’
জিসিরিজের কর্ণধার নাজমুল হক ভূইয়া খালিদ বলেন, ‘গান রিলিজ চলতেই থাকবে। আমরা যে যত কমিটিই করিনা কেন। তাই একসাথে সম্মিলিতভাবে নিজেদের সবার মঙ্গল হয়, এরকম একটা ঐক্যে পৌঁছতে হবে। নয়তো সিনিয়ররা বলতেই থাকবেন তাদের পুরনো গানের রয়্যালিটির কথা। আর জুনিয়ররা বা বাজার চলতি শিল্পীরা নিজেদের কাজটি করে যাবেন।
 
সিএমভি’র আবারও নতুন যাত্রা

অডিও ইন্ডাষ্ট্রিতে বারবার পূণর্জীবনে যাবার কোনো রেকর্ড নেই। তবে এর আগে সঙ্গীতা নতুন ভাবে নতুন অ্যালবাম নিয়ে পূণর্জীবনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে সিএমভি তার প্রতিষ্ঠার পর থেকে কয়েক হাতে এর স্বত্ত্ব বিক্রি হয়ে আবারও নতুনভাবে অ্যালবামে লগ্নি শুরু করেছেন। রিয়েলিটি গায়ক কিশোরের আয়োজনে একটি মিক্সড অ্যালবামসহ, আসিফ-ইলিয়াস-বেলাল খানদের নিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন তারা। মূলত ডিজিটাল কনটেন্ট থেকে অর্থ প্রাপ্তির আশাতেই পুরনো জনপ্রিয় গানগুলোর ব্যবসা ফিরিয়ে আনার চেষ্টাটাই এখানে মূল কথা। তাই ইন্ডাষ্ট্রিতে এখন গান যেমন বাড়ছে, পাশাপাশি ব্যবসাও বাড়ছে কিন্তু যেটি ভয়ংকর ভাবে কমে যাচ্ছে তা হলো পারস্পরিক বিশ্বাস! গীতিকার- সুরকারকে বিশ্বাস করছেন না, সুরকার শিল্পীকে বিশ্বাস না করে নিজেই গেয়ে ফেলছেন গান; কারণ গান হিট হলে তো শিল্পীরই ইনকাম বাড়বে তাই! আর শিল্পীরা প্রকাশককে। শিল্পী যদি প্রকাশককে কম মূল্যে এককালীন গান বিক্রি করেন, আর যদি কোনোক্রমে হিট হয়ে যায়, তাহলে বলে বেড়াচ্ছেন আমাকে ঠকিয়েছে বা অনেক অনেক কমদামে দিয়েছি গানটি। অন্যদিকে রয়্যালিটির হিসেবের কথা বললে অডিও প্রকাশক বা ডিজিটাল প্রকাশক কাইনিটিক মাথা চুলকিয়ে মনে করতে পারেন না, সব শিল্পীকে ঠিক কিভাবে তারা গান বিক্রির স্বচ্ছ ও সত্ হিসেবটি দিয়ে থাকেন বা সর্বশেষ কাকে মনে করার মতো রয়্যালিটি দিয়েছেন!