আগামীতে একুশে ফেব্রুয়ারি

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ০৭:৫৫
বৃহত্তর বাংলাদেশের তথা পূর্ববঙ্গের গণমানুষ ছিল শিক্ষা-দীক্ষায় সবদিক থেকে পিছিয়ে। আত্মাভিমানী ছিল এ দেশের জনগণ। ভাবতো, তারা নবাব-বাদশাহর প্রজা ছিল। কিন্তু ইংরেজদের ছলনায় তারা তাদের সেই রাজত্ব হারিয়েছে। তাই ছিল ইংরেজি শিক্ষার প্রতি এক ধরনের বিজাতীয় ঘৃণা ও অবজ্ঞা। যার ফলে তারা অনগ্রসর জাতি হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছিল। এ দেশের বেশিরভাগ জনপদ ছিল কৃষিভিত্তিক। কিন্তু জমিদার ও মহাজনের শোষণে ছিল জর্জরিত। তাই পাকিস্তান আন্দোলনের সপক্ষে এই অঞ্চলের কৃষককুল ও নিম্নবিত্তশ্রেণি মানুষরা সবেচেয়ে বেশি সোচ্চার হয়েছিল। ১৯৪৭-এর ১৪ আগস্টে পাকিস্তান অভ্যুদয় হওয়ার পর এ অঞ্চলের মানুষ ভেবেছিল তারা শোষণ থেকে মুক্তি পেয়েছে, তারা আর আর্থ-সামাজিক বঞ্চনার শিকার হবে না।
 
দেশ বিভাগের পর ভারত থেকে আগত উর্দু ভাষাভাষী যে জনগোষ্ঠী মহাজের হিসেবে পূর্ব বাংলায় আসলো— দেখা গেল তারাই সর্বক্ষেত্রে প্রাধান্য বিস্তার করছে এবং পাকিস্তান হওয়ার পরে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা পাঞ্জাবিরা হলো এদের দোসর। চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, সেনাবাহিনী— সমাজের সব ক্ষেত্রেই তারা কর্তৃত্ব বজায় রাখলো। পাকিস্তানের যে স্বপ্ন নিয়ে বিভোর হয়েছিল, তা অচিরেই ধূলিসাত্ হয়ে গেল। তখন যে ভাষায় মার সুরেলা কণ্ঠে ঘুম পাড়ানির গান শুনছে, ক্ষেতে-খামারে, নদী-নালায় কৃষক আর মাঝি-মাল্লাদের সেই দরাজ ভরা গানের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসার উপক্রম হলো। উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পরিকল্পনায় তখন ছাত্রসমাজ ক্ষোভে ফুঁসে উঠলো। বাংলা ভাষা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ১৯৪৮ সালের মার্চ থেকে শুরু হলো অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে গুলি চালানোর আগ পর্যন্ত এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ নিজেদের মনে করতো যে তারা মুসলমান। কিন্তু গুলি চালানোর পর তাদের হূদয়ে যে বাঙালিসত্তা— তার উন্মেষ ঘটলো।
 
বাংলা ভাষা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির পর থেকে পরবর্তী বছরগুলোতে এ দিনটি ছিল অঙ্গীকারের দিন, শপথ নেয়ার দিন। এর ভেতরে সুপ্তভাবে থাকা আকাঙ্ক্ষা, বঞ্চিত গণ-মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা পরিবর্তনের লড়াইয়ে রূপ নিল। সেই  ৫২ থেকে ৭১ পর্যন্ত এ সংগ্রামী মানুষের প্রতিপক্ষ ছিল উর্দু-পাঞ্জাবি ভাষাভাষী শাসকগোষ্ঠী। প্রথমে লড়াইটা ছিল স্বাধিকারের, এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীনতার দাবি।
 
১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি ছিল একটি লক্ষ্যের দিকে অভীষ্ট হওয়ার—  যেখানে বাঙালি মাথা উঁচু করে বাঁচবে। শোষিত হবে না, বঞ্চনার শিকার হবে না। কিন্তু বাংলাদেশ হওয়ার পর একাত্তর পূর্ব যে চেতনা, সেই অগ্নিশুদ্ধ হওয়ার শপথ— তার হলো জলাঞ্জলি। এরই পরিণতিতে ১৯৭৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারের পাদদেশে নারীদের লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা ঘটলো। এরপর পুনরাবৃত্তি শুরু হলো চর দখলকারীদের মতো শহীদ মিনার দখল করার দৌরাত্ম্য। ক্রমেই একুশে ফেব্রুয়ারি তার স্বর্ণ উজ্জ্বল অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হয়ে পালাপার্বণ উত্সবে রূপান্তরিত হলো। এখন ২১শে ফেব্রুয়ারি উত্সব ছাড়া আর কিছু নয়! কিন্তু এ দিন তো হওয়া উচিত কষ্টিপাথরে নিজেকে যাচাই করার দিন। সেই অগ্নিমন্ত্র হূদয়ে সমুজ্জ্বল রয়েছে কি না তা পরখ করার দিন। বাঙালি জাতীয়তাবাদে উজ্জীবিত হয়ে যে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের জন্য যারা জীবনকে আত্মোত্সর্গ করেছেন তাদের কাছে জবাবদিহি করার দিন।
 
একুশের চেতনা বলতে যা বোঝায় তার আসল চেতনা শাসকশ্রেণি কখনোই জনগণের সামনে তুলে ধরেনি। কেননা এ দেশের জনগণ যদি সেই চেতনায় অবগাহন করে আত্মশুদ্ধি অর্জন করতো, ফিনিক্স পাখির মতো আবির্ভূত হয়, তাহলে এ শাসককুল ভীতিকর যে ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হবে তা তারা চায়নি। তাই, আজ পর্যন্ত শাসকগোষ্ঠীরা এ চেতনাকে সমুন্নত রক্ষার কোনো পরিকল্পনাই করেনি। দিল্লির পার্লামেন্টের সম্মুখের সরণির নাম যেমন গান্ধীর মহাপ্রয়াণের দিন ‘৩০শে জানুয়ারি’, তেমনি শহীদ মিনারের বেষ্টনী সড়ক ‘২১শে সরণি’ হলে এখান দিয়ে পথচারীর হূদয়ে ২১শে ফেব্রুয়ারি সমুজ্জ্বল থাকতো। যাতে একুশের চেতনা বিলীন হয়ে যায় সেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা অনুযায়ী চার শহীদের নামে ঢাকায় কোনো প্রধান সড়ক নেই। এমনকি এই যে শহীদ মিনার তার চত্বরে এমন কিছু পরিচিতি লিপিবদ্ধও নেই। এখানে যারা সাধারণ মানুষ আনাগোনা করে কিংবা চত্বরে বিশ্রাম নেয়, তাদের কাছে এটি একটি কিম্ভূতকিমাকার স্থাপনা ছাড়া আর কিছু নয়!
 
আগামীতে এই একুশে ফেব্রুয়ারিকে সময়ের চোরাবালি— অক্টোপাসের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরবে। যেমন ১৪ ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচার দিবস শুকনো পাতার মতো ঝরে গেছে। আর অগ্নিঝরা চেতনার পরিবর্তে এখন হয়ে গেছে পশ্চিমা সংস্কৃতির ভালোবাসার দিন, ভ্যালেন্টাইন ডে।
 
৭১-এ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনযুদ্ধের পর বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ভেতর দিয়ে রাজনীতিবিদরা মনে করেছিলেন সবকিছু অর্জন হয়ে গেছে। ফলে সেই সময় শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সরকারে যারা জড়িত ছিলেন, তারা সরকারকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হন। আমাদের সমাজে আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে ছেলে-মেয়েদের ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাদান। সামাজিক অনুষ্ঠান বিয়ে, জন্মদিন বা অন্যান্য অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রও লেখা হচ্ছে ইংরেজিতে। প্রাথমিক শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা, সরকারি দফতর, অফিস-আদালত, এমনকি সর্বস্তরেও বাংলা ভাষার তেমন মর্যাদা নেই। আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনে বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য আজ অনেকখানি ভূলুণ্ঠিত।
 
রাজনৈতিক দাবা খেলায় যারা পালাবদলের চাল দেন, তাদের দিয়ে একুশের চেতনার বিকাশ ঘটবে না।
 
লেখক:ভাষাসংগ্রামী ও চিত্রশিল্পী