ভ্যাট নিবন্ধন রয়েছে এমন ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্যাকেজ পদ্ধতিতে ভ্যাট দেয়ার কথা। কিন্তু রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মনে করছে, এ ধরনের তালিকাভুক্ত দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮০ শতাংশই ভ্যাট দেয় না। এর বাইরে তুলনামূলক বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়ের সঠিক হিসাব রাখতে ইলেক্ট্রনিক ক্যাশ রেজিস্ট্রার (ইসিআর) মেশিনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। এ অবস্থায় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভ্যাট আদায়ে সরকারের নানামুখী উদ্যোগও কার্যত সফল হচ্ছে না। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভ্যাট আদায়ে এনবিআরের সক্ষমতার অভাব রয়েছে। রয়েছে মাঠ পর্যায়ের ভ্যাট আদায়কারী কর্মকর্তাদের অসাধুতাও। ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভ্যাট আদায় বাড়াতে হলে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের স্বপ্রণোদিত হয়ে ভ্যাট দেয়ার মানসিকতা তৈরি হতে হবে। নইলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইসিআর স্থাপন করা হলেও কার্যকর ফল আসবে না। কেননা এনবিআর কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বিক্রিবাট্টা তদারক করা কখনোই সম্ভব নয়।
এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটের অধীনে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দক্ষিণ কমিশনারেট সূত্রে জানা গেছে, এ কমিশনারেটের অধীনে গত অর্থবছরে ৪২ হাজার ৯৭টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর ছিল। এর মধ্যে আলোচ্য সময়ে ভ্যাট দিয়েছে মাত্র ৮ হাজার ৩১৮টি প্রতিষ্ঠান। নিবন্ধিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আলোচ্য সময়ে ভ্যাট দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভ্যাট পাওয়া গেছে মাত্র ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। অর্থাত্ ভ্যাটের বাইরে রয়ে গেছে প্রায় ৮০ শতাংশ। আর চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রথম পাঁচ মাসে এক হাজার ৮৯৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্যাকেজ পদ্ধতির ভ্যাট দিয়েছে। হিসাব করে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের আলোচ্য সময় পর্যন্ত ভ্যাট দিয়েছে মাত্র ৪ শতাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
চলতি অর্থবছরে প্যাকেজ ভ্যাট বাড়ানোর পর ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভ্যাটের পরিমাণ ১৪ হাজার টাকা। অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ১০ হাজার টাকা, জেলা শহরে ৭ হাজার ২শ এবং দেশের বাদবাকি এলাকার জন্য প্যাকেজ ভ্যাট ৩ হাজার ৬শ’ টাকা। এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক মূল্য সংযোজন বা মুনাফা ৯৪ হাজার টাকা হিসেবে তাদের উপর প্যাকেজ ভ্যাট প্রযোজ্য।
এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গড়ে ১০ শতাংশ দোকান বন্ধ হয়েছে ধরা হলেও বাকি ৯০ শতাংশ দোকান ভ্যাট দেয়ার কথা। ভ্যাট নিবন্ধন থাকা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিজ দায়িত্বে ভ্যাট দেয়ার নিয়ম। কিন্তু কার্যত তা হচ্ছে না। অন্যান্য ভ্যাট কমিশনারেটেও কমবেশি একই অবস্থা।
তবে দোকান মালিক সমিতির নেতা ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহ-সভাপতি হেলাল উদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, মূলত এনবিআরের সক্ষমতার অভাবে ভ্যাট আদায়ের ক্ষেত্রে সাফল্য আসছে না। ভ্যাট আদায়ের দায়িত্ব তাদের। তিনি বলেন, এক সময় ভ্যাট দেয়ার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বেড়েছিল। কিন্তু ভ্যাট আদায়কারী কর্মকর্তাদের মধ্যে অসাধুতার কারণে ব্যবসায়ীরাও সুযোগ খুঁজছেন।
তবে ভ্যাট আদায়কারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ভ্যাট আদায় কিংবা তদারকির স্বার্থে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হলে ব্যবসায়ীরা হয়রানির অভিযোগ তোলেন। তখন এটি নিয়ে তারা বিভিন্ন স্থানে বক্তব্য বিবৃতি দিয়ে বেড়ান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভ্যাট বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, রাজধানীর অনেক বড় মার্কেটে দোকানদারদের ভ্যাট নিবন্ধন থাকলেও তাদের অ্যাসোসিয়েশন সহায়তা করে না। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, রাজধানীর একটি শপিং মার্কেটে ১শ’ দোকানে ভ্যাট নিবন্ধন রয়েছে। ওই মার্কেটের ব্যবসায়ীদের অ্যাসোসিয়েশন টার্গেট নেয় হয়ত সেখান থেকে ৩ লাখ টাকার বেশি ভ্যাট দেবে না। এক্ষেত্রে সব দোকান থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আদায় করে। ওই অর্থ দিয়ে প্রয়োজনমত কিছু দোকানের নামে ৩ লাখ টাকা ভ্যাট দেয়। আর বাকিদের ভ্যাট দেয়ার সামর্থ্য নেই বলে তদবির চালায়। এ পরিস্থিতিতে ভ্যাট আদায়ে জোর করতে গেলে হয়রানির অভিযোগ তোলে।
কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বড় আকারের ভ্যাট দিতে সক্ষম হলেও তারা প্যাকেজ পদ্ধতিতে তালিকাভুক্ত হয়ে ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে বলেও এনবিআরের অভিযোগ। এনবিআরের দক্ষিণ কমিশনারেট সূত্রে জানা গেছে, সমপ্রতি রাজধানীর পুরানা পল্টন এলাকার একটি লাইটিংয়ের দোকানে অভিযান চালিয়ে তাদের নথিপত্র জব্দ করা হয়। নথিপত্র পরীক্ষা করে দেখা যায় প্রতিষ্ঠানটির এক বছরের ভ্যাট আসে ৯৪ লাখ টাকা। অথচ তারা প্যাকেজের তালিকায় নিবন্ধিত হয়ে গত বছর পর্যন্ত মাত্র ১১ হাজার টাকা ভ্যাট দিয়ে আসছিল। প্রতিষ্ঠানটির উপর ৯৪ লাখ টাকা ভ্যাট দাবি করা হলে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই থেকেও তা বাতিলে তদবির করা হয়।
