উকিল মুন্সির জীবন কথা

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০১

উকিল মুন্সি নেত্রকোনার জেলার খালিয়াজুরী উপজেলার নূরপুর বোয়ালী গ্রামে ১৮৮৫ সালে ১১ জুন এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম গোলাম রসুল আকন্দ। মাত্র ১০বছর বয়সে পারিবারিক সিদ্ধান্তে পিতৃহারা এতিম শিশু উকিল তার বাবার ফুফাত ভাই মোহনগঞ্জ উপজেলার জালালপুর গ্রামের কাজী আলিম উদ্দিনের বাড়িতে চলে আসেন। উকিল তার ডাক নাম, আসল নাম আব্দুল হক আকন্দ। শিশু ও শৈশবে তিনি মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন।

৩১ বছর বয়সে জালালপুর গ্রামের লবু হোসেনের সুন্দরী কন্যা ‘লাবুশের মা’র  সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পূর্বে তাদের প্রেম এলাকায় আলোচিত ছিলো। এ সময় তিনি রচনা করেন প্রেমের গান, বিরহের গান। যে গানে মানুষের মনে যৌবনের ইহজাগতিক কামনা-বাসনা প্রতিফলিত হয়।

জগৎ, সংসার আর জীবনের মিশ্র গান লিখে এবং নিজের সুরে নিজের কন্ঠে গান গেয়ে মানুষের মনে ঠাঁই করে নেন উকিল মুন্সি। ক্রমান্বয়ে তার গান জনপ্রিয় হতে শুরু করে। অল্প সময়ে বিশাল জলরাশির হাওরাঞ্চলে তার সুর, বাণী ও গায়কী মানুষের মন কেড়ে নেয়। তার গায়কী মানুষকে ব্যাকুল করে তোলে। তিনি হয়ে উঠেন বিখ্যাত বাউল গানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক।

মধ্য বয়সে যখন শ্রষ্টার প্রেমে মগ্ন হয়ে জীবনের সেরা গানগুলি রচনা করেন সেই সময় তিনি হবিগঞ্জের শরিয়তের পীর মোজফফর আহম্মদ সাহেবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। পীর সাহেবের আশীর্বাদ ও নিদের্শনায় হয়ে উঠেন বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত সম্পদ। মানুষ তাকে  মসজিদে ইমাম বানিয়ে নিজেদের তার মাধ্যমে মহান প্রভূর বন্দেগী করার তৃপ্তি পেতেন। এক সময় মানুষ গান শুনে স্বপ্ন দেখেছে যৌবনের প্রেম ভালবাসার। বৃদ্ধকালে আল্লাহ প্রেমের গানে দুচোখের  পানিতে ভিজেছে পাকা দীর্ঘ লম্বা দাঁড়ি। নামাজে, জানাজায় প্রার্থনায় তিনি নয়নের জলে বুক ভাসিয়েছেন। মানুষও কেঁদেছে অঝোর ধারায়।

যৌবনকালে একতারা আর চটিয়া বাজিয়ে গান গেয়ে মাতিয়েছেন যুবক সমাজকে। গানের শব্দ চয়ন, অপূর্ব উপমা হাওরের মাটির স্রোতধারা, ভালবাসা, প্রেম, বিরহের স্বাক্ষর রেখেছেন। খ্যতি অর্জন করা সেই বাদ্যযন্ত্র আর ঝংকার বন্ধ হল এক সময়। তিনি  শেষ বয়সের হদয়পর্শী আবেগমাখা বিরহ বিচ্ছেদের গানে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার না করে খালি ভরাট গলায় গান ‘ঘরের মালিকরে দুয়ারে ভিখারী খাড়া তারে বিদায় কর’ ‘আমি কই যাই এই সন্ধাকালে’ ইত্যাদি।

৯৩ বছর বয়সে এই মহান মানুষটি সকলকে কাঁদিয়ে নাইওর গিয়েছেন কার্তিক মাসের শেষে মোহনগঞ্জের জৈনপুর গ্রামে। তার রচিত সহস্রাধিক গান এখনও তার স্মৃতি ধারণ করে। দারুন মেধাবী, সুন্দর অবয়ব, সঙ্গীত ও  ধার্মিক প্রতিভা ও সর্বগুণে কীর্তিমান, বিনয়ী এই মানুষটির মুন্সিয়ানার জন্য ‘মুন্সি’ উপাধি পেয়ে মানুষের অন্তরে তার সৃষ্টি যুগ যুগ অমলিন থাকবে।

আরও পড়ুনঃ আলমডাঙ্গার নিখোঁজ দুইজনের গুলিবিদ্ধ লাশ জীবননগর ও মহেশপুর হতে উদ্ধার

উকিল মুন্সির ৪১তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আগামীকাল ১৫ মার্চ বাউল উৎসব উদযাপন কমিটি শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়ে বাউল উৎসবের আয়োজন করেছে। আয়োজিত বাউল উৎসবে পরিকল্পনা মন্ত্রী এম. এ. মান্নান, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তফা জব্বার, নেত্রকোনা-৪ আসনের এমপি রেবেকা মমিন, প্রধান মন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান, জেলা প্রশাসক মঈলউল ইসলাম, প্রখ্যাত লেখক অধ্যাপক যতিন সরকারসহ আরও অনেকে বক্তব্য রাখবেন।

ইত্তেফাক/নূহু