তার পুরো এক মাসের শিডিউল কেউ মুখস্থ করলে বাংলাদেশে কয়টি জেলা আছে, সেই জেলায় কোন কোন উপজেলায় ভালো মানের অডিটরিয়াম আছে, তা জেনে যাবেন অনায়াসে।
তিনি আর কেউ নন। এদেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আঁখি আলমগীর। এদেশের সবথেকে স্টেজ মাতানো শিল্পী তিনি, এতে কোনো সন্দেহ নেই। অনেকেই অডিওর রেকর্ডিং বা সফটওয়ার ভিত্তিক কণ্ঠে হিট হতেই পারেন, কিন্তু স্টেজে সকলেই সেরা হতে পারেন না।
কোনা কর্পোরেট শো থেকে শুরু করে যে কোনো অনুষ্ঠান শেষে ‘জমজমাট’ শব্দটি জুড়ে দেবার জন্য তার যেন কোনো জুড়ি নেই। দীর্ঘদিন পর আবারও নিজের সলো অ্যালবামের রেকর্ডিং এর কাজ শুরু করলেন। ইত্তেফাক আলাপ বিভাগে তার সাথে কথা হলো বিভিন্ন প্রসঙ্গে...
IMG0
নিজের এই শত ব্যস্ততা আর দিনরাত দেশের এপার থেকে ওপার ছোটছুটিতে কেমন লাগে?
আমি খুব এনজয় করি বলেই কাজটা করতে পারি। কখনও মনে হয় না, আমি ক্লান্ত। বা মনে হয়না আমি বিরক্ত। সবসময় আমার নিজের ভালো লাগা জড়িয়ে থাকে আমার এই মঞ্চের গাওয়ার সাথে। এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে যে, আয়োজকদের সাথে হয়তো কথা হয়েছে যে এক ঘন্টা গাইবো, কিন্তু টানা ৪ ঘন্টা গান করেছি। কোনো ক্লান্তি আসেনি। সামনে ভালো অডিয়েন্স থাকলে আমার কোনো ক্লান্তি আসে না।
গানের দলাদলি...
ইদানিংকালে অডিও মেধাস্বত্ত্ব প্রসঙ্গ নিয়ে যে এত তোড়জোর বা বিভিন্ন দলাদলি, এর ভেতরে তিনি থাকতে চান না।
আঁখির কথায়, ‘দেখুন ইন্ডাষ্ট্রিতে আমরা সবাই কণ্ঠশ্রমিক। আমি জানি সবাই সর্বোপরি একটা ভালো হোক সেটাই চাইছেন। কিন্তু এখানে হয়তো কারো কারো সেই সমাধানের উপায় খোঁজায় মতপার্থক্য তৈরি হচ্ছে। এর ভেতরে দলাদলি বা আলাদা আলাদা গ্রুপ করলে সবার ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ হবে না। আর কে আমার আপন না বলুন? আমি কেন একটা নির্দিষ্ট দলে যাবো?
IMG1
কিন্তু ইন্ডাষ্ট্রি তে তো অনেক রেষারেষি দেখা যায় আপনাদের ভেতরে। একজন আরেকজনকে ভালো চোখে দেখেন না।
হ্যা, এটা সর্বত্রই আছে। কিন্তু এগুলোকে আমি কখনওই কানে দিই না। তবে এসব মানুষদের আমি খুব ভালো করে জানি ,চিনি। তারা আমার সাথেই খুব হাসিমুখে কথা বলবে, আমার আমি গেলেই আমাকে নিয়ে গসিপিং শুরু করবে। আমি শুধু তাদের চিনে নিজে থেকে সাবধানী হয়ে যায়।
IMG2
কিন্তু এই যে স্টারডম, বা ব্যস্ততা। এর ভেতরে কখনও কি কোনোই ক্লান্তি আসে না? মনে হয় না একটু বিশ্রাম নিই। বা এই প্রফেশনে এসে কোনো ভুলই হলো বোধ হয়!
এমন প্রশ্নের জবাবে সরাসরি ‘না’ করে দিলেন আঁখি আলমগীর। আমি পুনর্জন্মে স্বাভাবিক ভাবেই বিশ্বাসী নই। তবু বলি, আমার হাজার জন্ম হলেও এই আঁখি আলমগীর হয়েই জন্মাতে চাই। আঁখি আলমগীরেই থাকতে চাই।
এর কারণটা জানতে চাইবো খুব স্বাভাবিক।
প্রশ্ন করলাম - এই যে মঞ্চে আপনি থাকলে পাশের অন্য অনেকেই খানিক ভীতি বা ঈর্ষাকাতর হয়ে যায়, এ বিষয়গুলো কতটা এনজয় করেন?
না, এটা যার যার একটা কারিশমা বলতে পারেন। আমি কাউকে ছোট করতে চাই না। সেই ধৃষ্টতাও নেই বা সেই অভ্যেসও আমার কখনও ছিল না। কিন্তু এটাই আমার বড় অর্জন বলে মনে করি।
আমি বিভিন্ন স্টেজ শো শেষে এ ধরনের কমপ্লিমেন্টও পেয়েছি যে তারা বলেছেন, ‘শিল্পীরা তো অনেকে অডিও সিডির মতো করে গান গাইতে পারেন না। কিন্তু আমি নাকি তার চেয়েও ভালো গেয়েছি। আমি তখন সামগ্রিকভাবে বলেছি, যে সবাই তো একরকম হয় না। ঐ শিল্পীর নিশ্চয়ই অন্য কোনো কোয়ালিটি আছে, যা আমার নেই ! অর্থাত্ ইন্ডাষ্ট্রির কারো বদনাম বাইরের মানুষেরা করবে আর আমি হাত তালি দেবো তেমন মানুষ আমি নই। কিন্তু কষ্ট লাগে তখনই যখন আমাদের ইন্ডাষ্ট্রির কারো কারো দূর্বলতার গল্প হয়তো অচেনা কোনো অ্যারেঞ্জারকে বলছেন। এতে কিন্তু গোটা পরিবারের দূর্ণামই সে করছেন। এখানে আমাদের ক্ষতি। আমাদের সব দূর্বলতা আমরাই ঢাকবো। আমরাই সমাধান করবো। বাইরের মানুষকে আমার কলিগের বদনাম করে তো আমার কোনো বেনিফিট নেই।’
IMG3
শুধুই মঞ্চে..
গানের উপস্থাপনায় সবচেয়ে জটিল অংকটা হলো, স্টেজে গান গাওয়া। এদেশের অনেক শিল্পীই রয়েছেন যাদের অডিও অ্যালবামের গান আর স্টেজের গান পাশাপাশি মেলানো যায় না। সেদিক দিয়ে একেবারেই ব্যতিক্রম আঁখি আলমগীর।
শিল্পী আখি আলমগীর বলেন, ‘দেখুন বাইরের দেশে কি হচ্ছে ? তারা কিন্তু পেশাজীবি শিল্পীস্বত্ত্বাটা টিকিয়ে রাখছেন মঞ্চে নিয়মিত পারফর্ম করেই। কারণ আমি মঞ্চে যদি স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকি, তাহলে দুইটা লাভ। এক, আমি এই প্রফেশনটাকে খুব ভালো ভাবে টিকিয়ে রাখতে পারবো। আর দ্বিতীয় লাভ হলো , আমি আমার অডিও অ্যালবাম নিয়ে যথেষ্ট যত্ন নিয়ে ভালো কিছু গানের কাজ করতে পারবো।’
IMG4
দীর্ঘদিন পর নতুন অ্যালবামে...
দীর্ঘ বিরতির পর আবারও নতুন সলো অ্যালবামের কাজ শুরু করেছেন আঁখি আলমগীর। জানালেন, ‘অনেকদিন ধরেই প্ল্যানটা একটু একটু করে এগুচ্ছিল। কিন্তু স্টেজের ব্যস্ততার কারনে রেকর্ডিং এ সময় দেয়া হচ্ছে না। অবশেষে ঠিক করলাম, যে এবারে অ্যালবামটি শেষ করবোই । কারন সবকিছুর বাইরে আমি একজন মা’ও তো বটে। ওরাই আমার পৃথিবী। আমি আমার ক্যারিয়ারের সাফল্যকে তোয়াক্কা করি না। সেই সাফল্যের ওঠা নামা আছে, থাকবে। কিন্তু ‘মা’ হিসেবে আমার কাছে আমার সন্তান কোনো অভিযোগ করবে, তা আমি মেনে নিতে পারবো না। আমি তাই প্রতিনিয়ত একজন সফল এক ভালো মা’ হয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করি।
আঁখির এই নতুন অ্যালবামে কাজ করছেন শওকত আলী ইমন, জেকেসহ তরুন প্রজন্মের দুইজন সঙ্গীত পরিচালকও কাজ করবেন। নতুন স্বপ্ন বোনা বা গান নিয়ে কোনো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা শুনতে চাইলে বলেন, ‘দেখুন আমাদের এখন এত চ্যানেল থাকা স্বত্ত্বেও গান নিয়ে আমরা কোনো চমক লাগানো কিছু করতে পারছি না। এটা নিয়ে ভাবা দরকার সবারই। সবাই যেন একই বৃত্তবন্দী হয়ে যাচ্ছি। এছাড়া শিল্পী হিসেবে একটা খারাপ লাগা তো থাকেই তা হলো, গানের প্রচারের জায়গায় অনেক ঘাটতি। ‘গানবাংলা’ হয়তো সেই অভাব অনেকটাই পূরণ করছে। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের মতো সুরের দেশে কি একটি- দুটি গানের চ্যানেল কি দিয়ে হয়?’
