মাইক্রোসফট ছেড়ে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের পাশে

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ১২:৪৩
‘কাজকে বড় করে দেখুন, প্রতিষ্ঠানকে নয়’। কথাটা বলেছিলেন ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট এপিজে আবুল কালাম। আবুল কালামের সাথে হয়ত পরিচয়-ই নেই জন উডের। আবুল কালামের এই কথাটাও হয়ত শুনেননি তিনি।
 
কিন্তু জন উডও বিশ্বাস করেন, প্রতিষ্ঠান নয়, কাজের প্রতিই ভালোবাসা থাকাটা জরুরি। কাজকে ভালবাসলে নিজেকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানোটা সময়ের ব্যাপার মাত্র।
 
জন উড উন্নয়নশীল বিশ্বের শিশুদের নিয়ে কাজ করতে চাইতেন। এটাই তার ‘ভালোবাসার কাজ’। কিন্তু সফটওয়্যার জায়ান্ট মাইক্রোসফটে চাকরি করার কারণে তার ‘ভালোবাসার কাজ’টা করতে পারতেন না তিনি। ফলে মাইক্রোসফটের চাকরি ছেড়ে শুরু করেন তার ‘ভালোবাসার কাজ’। আর এই কাজই আজ তাকে এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে।
 
প্রায় ১৫ বছর আগে জন উড মাইক্রোসফট ছেড়ে ‘রুম টু রোড’ নামের একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান দাঁড় করান। এর প্রাথমিক কাজ ছিল শিশুদের বই পড়ার সুযোগ করে দেয়া। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসা, লাইব্রেরি তৈরি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।
 
প্রাথমিক অবস্থায় নেপালের শিশুদের নিয়ে কাজ শুরু করে রুম টু রোড। বর্তমানে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের ১০টি দেশে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব দেশে জন উডের হাত ধরে ১৭ হাজার ৫০০ শিশু লাইব্রেরি ও এক হাজার স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
 
IMG0
 
১৯৯৮ সালে এক ছুটিতে নেপালে বেড়াতে আসেন জন। দেশটির শিশু শিক্ষার দুরবস্থা দেখে রুম টু রোড প্রতিষ্ঠার চিন্তা আসে তার মাথায়। এর পরের বছরই তিনি মাইক্রোসফটের কাজটা ছেড়ে দেন। ওই বছরই দিনেশ শ্রেষ্ঠা নামের এক স্থানীয় যুবককে সঙ্গে নিয়ে শিশু শিক্ষার কাজে হাত দেন। দিনেশ এনজিও-তে কাজ করার কারণে স্কুল পরিদর্শন সহজ হয় জন উডের। ফলে অন্নুনত স্কুল খুঁজে বের করে দুজনে মিলে ছোট পরিসরে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা শুরু করেন।
 
এরও কয়েক মাস পর চাকরি ছেড়ে দিয়ে উডের সাথে যোগ দেন তার বন্ধু এরিন গ্যাঞ্জু, যিনি ভিয়েতনামের বড়সড় এক কর্পোরেট কোম্পানিতে কাজ করতেন। এতে তিনজনে মিলে নেপালের সরকারের সমর্থন ও স্থানীয় মানুষজনের সাহায্য নিয়ে রুম টু রোডের কাজের পরিসর বাড়ান। তখন থেকে লাইব্রেরি তৈরি ছাড়াও যথাযথ শিশু শিক্ষার জন্য মূলধন যোগানো এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার শুরু করেন তারা।
 
বর্তমানে এশিয়া ও আফ্রিকার ১০ টি দেশে কাজ করছে রুম টু রোড। এক্ষেত্রে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষক ও লাইব্রেরিয়ান সরবরাহ করে থাকে, স্থানীয় মানুষ দেয় তাদের শ্রম, আর রুম টু রোড লাইব্রেরি তৈরি ছাড়াও নানা ধরনের প্রশিক্ষণের আয়োজন করে থাকে।
 
রুম টু রোড স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভাষা নিয়েও কাজ করে থাকে। শিশুরা যাতে সহজে শিখতে পারে সেজন্য স্থানীয় লেখক-প্রকাশকদের সহায়তাও নিয়ে থাকে প্রতিষ্ঠানটি।
 
IMG1
 
রুম টু রোডের প্রতিষ্ঠিত প্রতিটি লাইব্রেরিতে এক সাথে চল্লিশ জনের মত ছাত্রছাত্রী বসে পড়াশুনা করতে পারে। লাইব্রেরির শেলফগুলোতে বই এমনভাবে রাখা হয় যা সহজেই শিশুদের নজর কাড়ে। লাইব্রেরিগুলোর ফার্নিচার, ফ্লোর ও দেয়ালও শিশুবান্ধব করে সাজানো হয়। এখানে বই বাসায় নেয়ার উপর শিশুদের উৎসাহিত করা হয়।
 
মেয়েদের শিক্ষিত করার ব্যাপারে রুম টু রোড পরিবারের দ্বারস্থ হয়। বাবা-মাকে শিক্ষার গুরুত্ব বোঝানোর পাশাপাশি খরচের টাকাও সরবরাহ করে।
 
গত বছর এক ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয় নেপাল। অনেক স্কুল ধূলিসাৎ হয়ে যায়। ফলে স্থানীয় সরকারের সহায়তা নিয়ে স্কুল তৈরির কাজে নামে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগে প্রায় ৬৬টি বিদ্যালয় পুনর্নির্মাণ করা হয়।
 
রুম টু রোড নিয়ে অনেক দূর যেতে চান জন উড। তার বর্তমান স্বপ্ন, ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বের পাঁচ মিলিয়ন শিশুকে রুম টু রোডের আওতায় নিয়ে আসা।