আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন নিয়ে সতর্ক সংকেত দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা। তারা বলেছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে দেশে হতাশা সৃষ্টি হবে। অসন্তোষ দেখা দেবে গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে।
বিশিষ্ট নাগরিকরা বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু করার মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের; কিন্তু এখন প্রশাসন তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলেছে। আর নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক দায়িত্ব এড়িয়ে চলছে। শুধু তাই নয়, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের চিন্তাও তাদের মাথায় নেই। এটি আমাদের জন্য একটি অশুভ সংকেত।
রাজনীতি বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেছেন, দলীয় নির্বাচনে স্থানীয় ও সামাজিক বিভেদ বাড়বে। প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশনকে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব নিতে হবে। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। এ আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাচনী আইন বিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করতে হবে। আরেক সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, অতীতে এই সরকারের অধীনেই স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এখন কেন হচ্ছে না? এভাবে চলতে থাকলে আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান বলেছেন, দলীয় প্রতীকের প্রভাবের কারণে যদি নির্বাচন সুষ্ঠু না হয় তাহলে সমাজে ভাগাভাগি বাড়বে। সম্প্রীতি নির্মাণ ও উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে সমাজে বড় ধরনের ক্ষত সৃষ্টি হবে।
আগামী ২২ মার্চ প্রথম ধাপে ৭৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ছয়টি ধাপে মোট ৪ হাজার ২৭৫টি ইউপি নির্বাচন ৪ জুনের মধ্যে সম্পন্ন হবে। এতদিন ইউনিয়ন পরিষদ ছিল একটি নির্দলীয় নির্বাচন। বর্তমান সরকার আইন সংশোধন করে চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের আয়োজন করছে। প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় ভোটার ও প্রার্থীদের মধ্যে নানা শঙ্কা বিরাজ করছে। ইতিমধ্যেই সরকারি দলের প্রার্থীদের সমর্থকদের বাধার কারণে শতাধিক প্রার্থী মনোনয়ন পত্র দাখিল করতে পারেননি।
বিএনপি অভিযোগ করেছে, বাধার কারণে তাদের ৭০ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। ভোটের আগেই ২৫ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত এ ঘটনাকে নজিরবিহীন বলে অভিহিত করেছেন। এ পরিস্থিতিতে বিশিষ্ট নাগরিকরা সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, দলীয় নির্বাচনে স্থানীয় ও সামাজিক বিভেদ বাড়বে।
ইত্তেফাককে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ভেঙ্গে পড়েছে। এটি আদৌও পুনরুদ্ধার করা যাবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বর্তমানে নির্বাচনের নামে প্রহসন চলছে। জনগণ ও ভোটারদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে রাজনীতিবিদ, বিজয়ী প্রার্থী ও প্রশাসনের উপর মানুষ আস্থা হারাবে।
তিনি বলেন, ইউপি নির্বাচনে ২৫ প্রার্থীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়ার নজির আছে বলে আমার জানা নেই। বর্তমান কমিশন একের পর এক নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা নষ্ট করার রেকর্ড গড়ছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো নির্বাচন কমিশন এভাবে সরকারের কাছে নিজেদের আত্মসমর্পণ করেছে বলে আগে দেখেনি। ইসি তার নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ তো দূরের কথা, সুষ্ঠু নির্বাচন করার চিন্তাও হারিয়ে ফেলেছে।
তিনি বলেন, ২০১১ সালে প্রথম ধাপে আমরাও নির্বাচন করেছিলাম। সেই সময়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। তারা নির্বাচন আয়োজনে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছিল। তাহলে স্বল্প ব্যবধানে সেই আওয়ামী লীগ তাদের সহযোগিতা করবে না কেন ? নাকি নিজের সক্ষমতার অভাব রয়েছে। একজন ব্যক্তি খারাপ হতে পারে, কিন্তু পুরো নির্বাচনী পদ্ধতিকে এভাবে ধবংস করা সমীচীন নয়।
এম সাখাওয়াত আরো বলেন, ইউপি নির্বাচনের শুরুটা যেভাবে হয়েছে, তা অব্যাহত থাকলেও আগামী দিনে আরো সহিংসতা বাড়বে। আর ইউপি নির্বাচন রাজনৈতিক সহিংসতাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনও আগের মতো ইসিকে সহযোগিতা করছে না বলে অভিয়োগ পাওয়া যায়। কিন্তু যদি সহযোগিতা না করে তাহলে ব্যবস্থা গ্রহণের যে ‘অস্ত্র’ ইসিকে দেয়া আছে তা লুকিয়ে না রেখে প্রয়োগ করার প্রয়োজন ছিল। তবে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার এই অসুস্থ ধারা কোথায় গিয়ে থামবে তা বলা মুশকিল।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন বলেন, নির্বাচনী আইন বিরোধী যে কোনো কর্মকাণ্ড ঠেকাতে হবে। স্থানীয় সরকারের ইউপি নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এই নির্বাচনে ঘরে ঘরে প্রার্থী থাকে। এলাকাভিত্তিক এই নির্বাচনে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে তা ভালো হবে না। এখানে যারা অনিয়ম করবে তারা একে অপরে পরিচিত। নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা হলে সমাজে তা ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।
সমসাময়িক সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, দলীয়ভাবে ইউপি নির্বাচন আয়োজন করা ঠিক হয়নি। দলীয় নির্বাচনে স্থানীয় ও সামাজিক বিভেদ বাড়বে।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমদ বলেন, ‘২০১৪ সালের দশম জাতীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের আঘাত এসেছে। আমাদের ভালো একটি নির্বাচনী ব্যবস্থাপনাকে শেষ করা হয়েছে। এটা ভালো করার কোনো লক্ষণ দেখছি না। কারোর আগ্রহও নেই। ইউনিয়ন পরিষদের যে নির্বাচন হচ্ছে তা কথা বলার মতো না।
তিনি বলেন, ‘জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ এখন আর নির্বাচন করতে আগ্রহী হতে চায় না। যেভাবে নির্বাচন হচ্ছে সেটিকে কোনো নির্বাচন বলাও ঠিক হবে না।
নিরাপত্তা ও রাজনীতি বিশ্লেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান বলেন, ‘তড়িঘড়ি করে এভাবে নির্বাচনের কোনো সামাজিক গুরুত্ব খুঁজে পাই না। দলীয় পরিচয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হওয়ায় সমাজে ভাগাভাগি বাড়বে। সম্প্রীতি নির্মাণ ও উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।’
তিনি বলেন, দলীয় পরিচয়ে এ ধরনের স্থানীয় নির্বাচন সমাজকে যেমন বড় দুই ভাগে ভাগ করবে তেমনি ক্ষুদ্র অংশগুলো আরো দুর্বল ও ক্ষুদ্রতর হবে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সমস্যায় পড়বেন। তৃণমূলে সমাজের শক্তি বা স্থানীয় সমস্যা ও সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে যে ইতিবাচক বোঝাপড়া হয়, তাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সার্বিকভাবে রাজনৈতিক উন্নয়ন আশঙ্কাজনকভাবে বাধাপ্রাপ্ত হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়েছে। এখন নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা নেই। দেশের ভোটারদের বড় একটি অংশ গ্রামে বসবাস করে। রাজনীতিমুক্ত পরিবেশে তারা শান্তিতে বাস করে। কিন্তু ইউপি নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে সমাজে বড় ধরনের ক্ষতের সৃষ্টি হবে। এতে জনমনে এক ধরনের অসন্তোষ সৃষ্টি হবে যা শুভ হবে না।
তিনি বলেন, আইনে নির্বাচন কমিশনের অগাধ ক্ষমতা দেয়া আছে। কিন্তু সেই ক্ষমতা কাগজে-কলমে। মনে হচ্ছে ইসি হাত গুটিয়ে বসে আছে। দেখেও না দেখার ভান করছে। প্রশাসন এবং ইসিকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। কেননা সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের সাংবিধানিক দায়িত্ব তাদের।
জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদ (জানিপপ) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে সমাজে এক ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। তবে মানুষ এখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। একসময় সমাজে নেতিবাচক কর্মকাণ্ড হলে সংগঠিতভাবে তা প্রতিরোধ করা হতো। এখন সেই অবস্থা নেই বরং নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে ভোটের প্রতি মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে, ভোটদান থেকে পিছু হটবে সাধারণ মানুষ।
