চিকিৎসকদের আচরণের কারণেই বিদেশমুখী রোগীরা

আপডেট : ০১ মার্চ ২০১৬, ০৯:১৫
 
দেশে চিকিৎসকের মমত্ববোধে মুগ্ধ হওয়ার বদলে দুর্ব্যবহারে ভীত হওয়ার অভিজ্ঞতাই রোগীদের বেশি। চিকিৎসা নিতে গিয়ে চিকিৎসকদের দুর্ব্যবহারের মুখে রোগীদের অসহায় হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটছে অহরহ। চিকিৎসক ছাড়াও খারাপ ব্যবহার করেন হাসপাতালের নার্স, গার্ড থেকে শুরু করে তাদের ব্যক্তিগত সহকারীও।
 
সরকারি কিংবা বেসরকারি সব হাসপাতালের দৃশ্য প্রায় একই। এছাড়া অনেক নামিদামি চিকিত্সকের চেম্বারে গেলেও রোগীদের এমন দুর্ব্যবহারের মুখোমুখি হতে হয়। এই কারণে রোগীদের চিকিত্সা নিতে বিদেশে পাড়ি দেয়ার ঘটনাও দিন দিন বাড়ছে। এমনকি দেশের নামি অনেক হাসপাতালের মালিকও চিকিত্সা নেন বিদেশে।

 

অথচ যেসব রোগের চিকিত্সার জন্য রোগীরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন সেসব রোগের ভালো চিকিত্সা দেশেও রয়েছে। তবে চিকিত্সকের সঙ্গে কোন রোগীর ব্যক্তিগত যোগাযোগ ভালো হলে তার ভালো ব্যবহার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

 

এ সমস্যা সমাধানে চিকিত্সা বিজ্ঞানের পাঠ্যসূচিতে দুইটি নতুন কোর্স চালু হয়েছে। একটির নাম ‘চিকিত্সক-রোগী সম্পর্ক’ এবং অন্যটি ‘আচরণবিধি’। তবে ভালো ব্যবহারের পারিবারিক শিক্ষা না থাকলে কেবল পড়াশোনা করিয়ে এটা আয়ত্ব করানো যাবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা।

 

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিত্সা অনুষদের ডীন অধ্যাপক ডা. ইসমাইল হোসেন বলেন, ভালো ব্যবহারের বিষয়টি মানুষ পরিবার থেকে শিখে আসে। আশা করি, রোগী এবং তার স্বজনদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবেন চিকিত্সকরা।  

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান বলেন, হাসপাতালের সার্বিক মানোন্নয়নে সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিত্সক ও নার্সসহ সকল শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর আচরণে পরিবর্তন আনা খুবই জরুরি। নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে আচরণগত পরিবর্তন আনতে হবে। আচরণগত সমস্যা দূর হলে হাসপাতালের শিক্ষা, চিকিত্সা ও গবেষণার সার্বিক পরিবেশ উন্নত হবে।

 

তিনি বলেন, সাধারণ রোগীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ হাসপাতালে প্রবেশ করতে গিয়েই তারা নিরাপত্তারক্ষীদের কাছ থেকে খারাপ ব্যবহার পান। নিরাপত্তা কর্মীদের বলা হয়েছে, কোনোভাবেই রোগী বা তাদের স্বজনদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা যাবে না। বিপদে না পড়লে কেউ হাসপাতালে আসেন না এটা তাদের বুঝতে হবে। কেউ তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলেও পাল্টা খারাপ ব্যবহার না করে বুঝিয়ে সমস্যা সমাধান করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

 

তিনি আরও বলেন, ডাক্তার ও নার্সদের রোগীদের সাথে যথাসম্ভব হাসি মুখে কথা বলতে হবে। অনেকের মনে নানা কারণে কষ্ট থাকতেই পারে। কিন্তু হাসপাতালে এসে সেই কষ্ট ভুলে থেকে হাসিমুখে থাকতে হবে। এসব নিশ্চিত করতে আমি সকল বিভাগে চিঠি ইস্যু করেছি। সবাইকে এই বিষয়ে সতর্ক করেছি। এটা করে আশানুরূপ ফলও পেয়েছি। 

 

তবে জনা দশেক রোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের হাসপাতালে খারাপ ব্যবহার এবং ভুল চিকিত্সার কারণে তারা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন চিকিত্সা সেবা নিতে। কেননা বিদেশে রোগীদের সঙ্গে চমত্কার ব্যবহার করেন চিকিত্সক থেকে শুরু করে হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট সকলেই।

 

মিরপুরের বাসিন্দা কামরুল ইসলাম পেশায় ব্যবসায়ী। ঢাকায় দুইটি সরকারি হাসপাতাল ও একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছেন। ভুল চিকিত্সা এবং খারাপ ব্যবহারের কারণে এখন দেশের বাইরে চিকিত্সা নেন। মালিবাগ চৌধুরী পাড়ার বাসিন্দা আব্দুস সবুরও একই অভিযোগ করলেন।

 

ঢাকার গার্মেন্টস ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলামের টিবি রোগের চিকিত্সা চলে একবছর। তবে কিছুতেই ভালো বোধ করছিলেন না তিনি। পরে ব্যাংককে গেলে চিকিত্করা জানালেন, অনেক আগে থেকেই তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। কল্যাণপুরের বাসিন্দা আঞ্জুমান আরাও অভিযোগ করলেন দেশের চিকিত্সকরা তার ভুল চিকিত্সা করেছেন।

 

এছাড়া খারাপ ব্যবহার আর ভুল চিকিত্সার অভিযোগ করেছেন চট্টগ্রামের পটিয়ার ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান, ঢাকা দোহারের খোরশেদ আলম, বাড্ডার আলতাব হোসেন, পুরান ঢাকার আবুল হাসনাত রোডের আবুল কালাম ও সিরাজুল ইসলাম।

 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এ প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের সম্পদ সীমিত, তবে চাহিদা বেশি। রোগীদের সঙ্গে যাতে খারাপ ব্যবহার না করা হয় এটা নিশ্চিত করতে হবে। রোগীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা চিকিত্সকদের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।