হাইকোর্ট খালাস দিলেও ১৩ বছর কারাগারে জবেদ আলী

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৬, ০১:০৪
হাইকোর্ট থেকে এক যুগ আগে খালাস পাওয়ার পরও এক আসামির মুক্তি মেলেনি। ১৩ বছর ধরে জবেদ আলী বিশ্বাস নামে ওই ব্যক্তি কারাভোগ করছেন। হাইকোর্টের খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হয়েছিল কি না তাও নিশ্চিত করতে পারেনি কেউ।
 
গত বুধবার সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক আশরাফুল ইসলামের গোচরে বিষয়টি আনেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমান ও অ্যাডভোকেট ফাহিমুল হক কিসলু। রবিবার শুনানি শেষে হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে কোনো আপিল বিচারাধীন রয়েছে কি না তা যাচাই করে পরবর্তী আদেশ দেয়া হবে বলে ওই বিচারক জানিয়েছেন।
 
এদিকে বিচারিক আদালতের কয়েকজন আইনজীবী জানিয়েছেন, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বা অন্য কোনো মামলা না থাকলে জবেদ আলীর ১৩ বছর কারাভোগ মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। সাতক্ষীরা জেলা কারাগারের জেলার মো. আবু তালেব নিশ্চিত করেছেন জবেদ আলী বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা নেই।
 
আদালত সূত্রে জানা গেছে, কলারোয়া উপজেলার কয়লা গ্রামের আমজেল আলী বিশ্বাসের ছেলে জবেদ আলী বিশ্বাস। লিলি (৮) ও রেক্সোনা (৫) নামে দুই কন্যা সন্তান রেখে তার স্ত্রী মারা যান। ১৯৯৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় জাবেদ আলী মেয়ে লিলিকে তার মামার বাড়ি তালা উপজেলার মানিকহার গ্রাম থেকে বাড়ি নিয়ে আসার নাম করে পার্শ্ববর্তী সেনেরগাতি বাজারে নিয়ে যান। পরদিন লিলি মারা যায়। বিস্কুটের সঙ্গে জবেদ আলী বিষ মিশিয়ে খাইয়ে কন্যা লিলিকে হত্যা করেছেন এমন অভিযোগে লিলির মামা আবুল কাশেম সরদার তালা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় জবেদ আলী বিশ্বাসকে আসামি করা হয়। ৬ সেপ্টেম্বর জবেদ আলী গ্রেপ্তার হন। সেই থেকে ২২ বছর ধরে তিনি কারাগারে বন্দী।
 
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তালা থানার এসআই লিয়াকত আলী ১৯৯৬ সালের ৯ জুন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পাঁচজন সাক্ষীর জবানবন্দি ও নথি পর্যালোচনা করে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ-২ আদালতের বিচারক ২০০১ সালের পহেলা মার্চ জবেদ আলীকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানার নির্দেশ দেন।
 
রায়ের বিরুদ্ধে জবেদ আলী বিশ্বাস জেল আপিল (আপিল নম্বর:১২৭৩/২০০১) দায়ের করেন। আপিল শুনানি শেষে ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ নিম্ন আদালতের যাবজ্জীবন সাজা বাতিল করে হাইকোর্ট তাকে খালাস দেন। ২০০৩ সালের ২৬ মার্চ ২৫৮৪২ নম্বর স্মারকে এ আদেশ পাঠানো হয়। হাইকোর্টের ১০৭২৫ নম্বর স্মারক অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মামলার মূল নথি (এলসিআর নম্বর-৬০৬৭) জেলা ও দায়রা জজ সাতক্ষীরার দ্বিতীয় আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়। সে অনুযায়ী তত্কালীন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক উচ্চ আদালতের রায় ও আদেশের কপি শামিল করে সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রার নোট করে বিধি মোতাবেক নথিটি রেকর্ডরুমে পাঠানো হোক মর্মে  ২০০৩ সালের ৩ এপ্রিল এক আদেশ দেন।
 

সাতক্ষীরা জজ কোর্টের জ্যেষ্ঠ কয়েকজন আইনজীবী বলেন, হাইকোর্টের এ ধরনের আদেশ সংশ্লি­ষ্ট আমলি আদালতে এলে তার সত্যতা যাচাই করে ওই আসামির অন্য কোনো মামলা না থাকলে তাকে জেলখানা থেকে মুক্তি দিতে আপত্তি নেই মর্মে জেল সুপারকে নির্দেশ দেয়ার কথা। জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারকের আদেশে এমনটাই থাকার কথা ছিল। কিন্তু নথিতে তা প্রত্যক্ষ করা যায়নি। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পেশকার মতিয়ার রহমানের (বর্তমানে মাগুরার জুডিশিয়াল কোর্টের প্রশাসনিক কর্মকর্তা) ভূমিকা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ যদি হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে অপিল না করে থাকে বা খালাসপ্রাপ্ত আসামি অন্য কোনো মামলায় জেলখানায় থেকে না থাকে সে ক্ষেত্রে দীর্ঘ ১৩  বছর কোনো কারণ ছাড়াই কারাভোগ নজিরবিহীন  মানবাধিকার লঙ্ঘন।