প্রধান বিচারপতির সমালোচনায় দুই মন্ত্রী

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০১৬, ১৬:০৮
দেশের সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে রাজধানীতে এক গোলটেবিল বৈঠকে তীর্যক আলোচনা হয়েছে। ওই আলোচনায় অংশ নিয়ে খোদ সরকারের দুই মন্ত্রী প্রধান বিচারপতির সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। এর মধ্যে এক মন্ত্রী যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত মীর কাসেম আলীর মামলার বিচারকের আসন থেকে প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অপর মন্ত্রী প্রধান বিচারপতির স্বপদে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
 
বৈঠকে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে বাদ দিয়ে মীর কাসেম আলীর আপিলের পুনরায় শুনানির দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘মীর কাসেম আলীর রায় নিয়ে এত কথা হচ্ছে। বেশি কিছু আমি বলতে চাই না। প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে এই মামলার শুনানি হওয়া উচিত। রাষ্ট্রের প্রধান কৌঁসুলিকেও (অ্যাটর্নি জেনারেল) এই মামলা পরিচালনা থেকে বিরত রাখা উচিত। নইলে আমরা বিচার পাব না।’ আর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, ‘প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করব, আপনি আপনার বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিন। নইলে এ পদে থাকার কতটুকু সুযোগ আছে, তার ওপরই সেটা রাখতে চাই।’ বিচারপতিরা আইনের ঊর্ধ্বে নন এবং আইনের বাইরে কারও হাত বড় নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
 
জামায়াতে ইসলামীর নেতা মীর কাসেম আলীর আপিলের রায়ের নির্ধারিত দিনের দু’দিন আগে শনিবার ঢাকায় ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির এক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। আলোচনা সভায় খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, এই মামলার রায় কী হবে, তা প্রধান বিচারপতির প্রকাশ্যে আদালতে বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আমরা অনুধাবন করতে পেরেছি। তার বক্তব্যের মধ্যে এটা অনুধাবন করেছি, এই মামলায় আর মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।
 
খাদ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধান বিচারপতি প্রকাশ্য আদালতে কী বললেন? প্রসিকিউশন এই মামলা নিয়ে রাজনীতি করছে। জামায়াত যে অভিযোগ করেছে, বিএনপি যে অভিযোগ করেছে, তাদের আন্তর্জাতিক লবিস্ট গ্রুপ যে সুরে কথা বলছে, একই সুরে কথা বলেছেন প্রধান বিচারপতি। প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন তিনি। শুধু তাই নয়, এই বক্তব্য ট্রাইব্যুনালের পাঁচ বছরের বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ ও হত্যা করেছে।
 
তিনি বলেন, এই প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা ২২টি মামলা নিষ্পত্তি করেছে। এর মধ্যে চার জনের দণ্ড কার্যকর হয়েছে। এই প্রসিকিউশন টিমই সাকা চৌধুরীর মামলায় কাজ করেছে। তখনতো কোন সমস্যা হয় নাই। এখন কেন প্রশ্ন উঠলো?
 
কামরুল আরো বলেন, আমি জানিনা আমার কথাগুলো আদালত অবমাননার মধ্যে পড়ে কিনা। তবে সত্য কথা বলতে আমি ভয় পাই না। সত্য নির্ভয়ে বলতে হয়। তিনি বলেন, আমি মীর কাসেমের ট্রাইব্যুনালের পুরো রায় পড়েছি। আমি যতটুকু দেখেছি আমার কাছে মনে হয়েছে মামলাটি সঠিক ভাবেই হয়েছে। প্রধান বিচারপতি যখন প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন আমি তখনই পুরো রায়টি পড়লাম। আমি কোথাও ত্রুটি খুঁজে পাইনি। আর ওই ট্রাইব্যুনালেতো তিনজন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকই বিচার করেন। তারাওতো কোন ত্রুটি পাননি।
 
জনকণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায়ের প্রশংসা করে তিনি বলেন, সাকা চৌধুরীর রায় অন্যকিছু হতে পারতো। কিন্তু স্বদেশ রায় তার লেখনীর মাধ্যমে আমাদের সজাগ করেছেন বলে সাকা চৌধুরীর ফাঁসি হয়েছে।
 
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম প্রধান বিচারপতির সঙ্গে একই সুরে কথা বলা শুরু করেছেন- এ মন্তব্য করে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, তার দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্রপক্ষের মামলা পরিচালনা করা। কিন্তু তিনিও প্রধান বিচারপতির সুরে কথা বলছেন। কোথায় যাব?
 
অ্যাটর্নি জেনারেলের বিষয়ে কামরুল বলেন, তিনি বেশি বুঝেন। তিনি বলেছেন, এই বক্তব্য দেয়া হয়েছে বলেই রায় অন্যরকম হবে এটা ভাবার কোন কারণ নেই। তবে আমি বলব, প্রধান বিচারপতি প্রকাশ্য আদালতে যা বলেছেন, এর পর হয় তিনি আসামিকে খালাস দেবেন নয়তো সাজা কমিয়ে দেবেন, না হয় মামলা পুনর্বিচারে পাঠাবেন। মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার আর কোন উপায় নেই তার। তিনি আরো বলেন, প্রধান বিচারপতির সুরে আমাদের অ্যাটর্নি জেনারেলও প্রসিকিউশনের সমালোচনা করছেন। তিনি আপিল মামলায় প্রসিকিউটরদের সহায়তা নেন না। আমার আইন পেশার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই, যে আইনজীবী বলবে তিনি অনেক জানেন, তিনি আসলে কিছুই জানেন না।
 
খাদ্যমন্ত্রী বলেন, কেন আজ মীর কাসেমের মামলায় প্রশ্ন উঠবে। মীর কাসেম মৃত্যুদণ্ডাদেশ নিয়ে কারাগারের কনডেম সেলে অবস্থান করছে। কিন্তু তার অর্থ বাইরে কার্যকর। বাইরে তার বিরাট কর্মী বাহিনী সক্রিয়। তার দেহটা কারাগারে আছে, তার অর্থ-বিত্ত কিন্তু বাইরে আছে। খাদ্যমন্ত্রী আরো বলেন, আমার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব হচ্ছে, প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে নতুন করে শুনানি হওয়া উচিত। প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে একটি বেঞ্চ হোক, সেই বেঞ্চে আপিলের শুনানি হোক। একই সঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেলকেও শুনানি থেকে বাদ দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন সাবেক এই আইন প্রতিমন্ত্রী।
 
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, এমন একটা সংকটের মুহূর্তে আমি কথা বলছি, যদি এখন মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে তাহলে টবি ক্যাডম্যানরা বলতে থাকবেন চাপ সৃষ্টি করেই এই রায় নেয়া হয়েছে। আর যদি বিপরীত রায় হয় তাহলে তারা তা মানবে না। এটা কিন্তু এক ধরনের সংকট। এই সংকট আমাদের সৃষ্টি। এই সংকট সৃষ্টি করেছেন আমাদের প্রধান বিচারপতি। আমি ছোট বিচারক ছিলাম। ১২ বছর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ২৪ বছর পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে অনেক বিচার করতে হয়েছে। আমার জীবনে কোন রায়ের আগে কোন মন্তব্যই করিনি। তবে আমার মনে কষ্ট হয়, আমাদের প্রধান বিচারপতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে আছেন, ওনারা যদি এমন কথা বলেন, তাহলে জাতি কোথায় যাবে। বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে সেই জনতা......তো বিচারপতিরাও আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
 
তিনি আরো বলেন, আমাদের সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে, রাষ্ট্রের প্রধানও আইনের ঊর্ধ্বে নন, তাকেও ইম্পিচমেন্ট করার সুযোগ আছে। প্রধান বিচারপতিও আইনের ঊর্ধ্বে নন। আইন সবার জন্য সমান। তিনি যে সংকট সৃষ্টি করেছেন এখন তার সমাধান তাকেই করতে হবে। তিনি কী করবেন, আমি তা ওনার ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা নিয়ে প্রধান বিচারপতি যে বক্তব্য দিয়েছেন তা প্রত্যাহার করতে হবে। আর সেটা তিনি প্রত্যাহার না করলে পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি তার ভেবে দেখা উচিত।
 
ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন বলেন, গত ৭০ বছরে আমরা এমন মুখর প্রধান বিচারপতি দেখিনি। তিনি ক্ষমতা নেয়ার পর থেকেই বেশি কথা বলে যাচ্ছেন যা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে এবং আদালতকে আমাদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।
 
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফের সভাপতিত্বে সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের ভাইস চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) আবু ওসমান, শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি শামসুল হুদা, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ড সদস্য মফিদুল হক, দৈনিক সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খন্দকার মুনীরুজ্জামান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট জেয়াদ আল মালুম, ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী।
 
অনুষ্ঠানের শুরুতে ৭১-এর গণহত্যাকারীদের বিচারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র: সরকার, বিচার বিভাগ ও নাগরিক সমাজের করণীয় শীর্ষক ধারণাপত্র পাঠ করেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু।
 
দুই মন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া:
প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক উল হক বলেন, বিচারাধীন বিষয়ে কথা বলা যায় না। অতীতে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে এমনভাবে কাউকে কথা বলতে দেখিনি। এভাবে কথা বললে বিচারবিভাগ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়।
 
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, কোন মামলার রায় ঘোষণার দুই দিন আগে এ ধরণের মন্তব্য নজিরবিহীন এবং অপ্রত্যাশিত। এতে করে বিচার বিভাগ সম্পর্কে মানুষের আস্থা নষ্ট হবে। তিনি বলেন, সরকারের কোনো বক্তব্য থাকলে রাষ্ট্রপক্ষের মাধ্যমে সেটি আদালতেই উপস্থাপন করা যেত। তা না করে প্রকাশ্য সভায় গণমাধ্যমের সামনে এ ধরণের বক্তব্য বিচারকে বাধাগ্রস্ত করে।