হ্যাক করে অর্থ হাতিয়ে নেয়াটা এখন নিত্য-নৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। হ্যাকার চক্রের কৌশলের কাছে সবাই যেন অসহায়। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকও সম্প্রতি শিকার হয়েছে হ্যাকিংয়ের। আর তাতে চলে গেছে রিজার্ভের ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ। অবশ্য হ্যাক হওয়া অর্থের একাংশ ফিরিয়ে আনা গেছে।
এর আগের বেশ কয়েকটি ব্যাংকের এটিএম কার্ড জালিয়াতি করে গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে হ্যাক হয়েছে কোটি কোটি টাকা। অন্যদিকে কৌশলগত দুর্বলতা ও উদার অর্থনীতির সুযোগ নিয়ে অর্থ সহজেই বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। ফলে ওইসব অর্থ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতিবাচক কোনো অবদান রাখতে পারছে না।
জানা গেছে, ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ গত ৫ ফেব্রুয়ারি হ্যাক করেছে চীন ভিত্তিক হ্যাকার গ্রুপ। চক্রটি হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে এ অর্থ সরিয়ে নিয়েছে শ্রীলংকা ও ফিলিপাইনে। শ্রীলংকায় সরিয়ে নেয়া অর্থ এরই মধ্যে উদ্ধার করা গেছে। আর ফিলিপাইন থেকে অর্থ উদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন উপমহাব্যবস্থাপক ও একজন যুগ্ম পরিচালক দেশটি সফর করে গেছেন।
ফিলিপাইনের অর্থ পাচার প্রতিরোধ কাউন্সিলও (এএমএলসি) বিষয়টি তদন্ত করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুরোধে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এরই মধ্যে পাচারকৃত অর্থ জব্দের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ফিলিপাইনে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ৭৬ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫৯২ কোটি টাকা)।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ২০-২৫ শতাংশ নগদ আকারে বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা হয়। বাকি অংশ বন্ড, স্বর্ণ ও অন্যান্য মুদ্রায় বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা হয়।
অন্যদিকে প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে দেশ থেকে প্রতি বছর পাচার হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। আর পাচার হয়ে যাওয়ায় উন্নয়ন কাজে আসছে না সেসব টাকা।
আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি বছরই বাংলাদেশ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ বিভিন্ন দেশে পাচার হচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) ‘ইলিসিট ফিন্যান্সিয়াল ফ্লোস ফ্রম ডেভেলপিং কান্ট্রিস: ২০০৪-১৩’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, শুধু ২০১৩ সালেই অবৈধ পথে বাংলাদেশের বাইরে চলে গেছে ৯৬৬ কোটি ডলারের বেশি। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা। ২০১২ সালে পাচার হয়েছিল ৭২২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এ হিসাবে এক বছরের ব্যাবধানে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থ প্রবাহ বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। আর গত ১০ বছরে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ৫ হাজার ৫৮৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
দেশের আর্থিক খাততে নিরাপদ করতে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে আরো সুদৃঢ় প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা দেয়াল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন গভর্নর ড. আতিউর রহমান। সম্প্রতি তিনি রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেন, আর্থিক খাত যত ডিজিটাল হচ্ছে ঝুঁকিও ততই বাড়ছে। অপর এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, প্রযুক্তির ফাঁক ফোকর দিয়েও সাইবার অপরাধী চক্র অর্থ পাচারে সক্রিয় রয়েছে। বাংলাদেশও এ সাইবার আক্রমণের বাইরে নেই। তাই পুরো আর্থিক খাতকে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আরো সক্রিয় ও সক্ষম হতে হবে। আরো সুদৃঢ় প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা দেয়াল গড়ে তুলতে হবে।
ফিলিপাইনের পাচার হওয়া টাকার তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বলেন, ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিভাগের (বিএফইউ) এন্টি মানি লন্ডারিং চুক্তি আছে। চুক্তি অনুযায়ী তথ্য পাওয়া চেষ্টা করা হচ্ছে। শিগগিরই তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। আর এ টাকার পাচারের সঙ্গে বাংলাদেশের কারা জড়িত তা খুঁজে বের করা যাবে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) মহাব্যবস্থাপক ও অপারেশনাল হেড দেবপ্রসাদ দেবনাথ বলেন, বিষয়টি খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে। কিন্তু সেখানকার অভ্যন্তরিণ আইনি জটিলতার কারণে আদালতের অনুমতি ছাড়া বাইরের তথ্য দেয়ার সুযোগ নেই। ফিলিপিনো কর্তৃপক্ষের কাছে থেকে বিস্তারিত তথ্য পেলে বাংলাদেশে তদন্ত শুরু করা হবে।
সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক একাউন্টে রক্ষিত স্থিতি থেকে ”হ্যাকড” হওয়া অর্থের একাংশ ইতোমধ্যে আদায় হয়েছে। অবশিষ্ট অংকের গন্তব্য সনাক্ত করে তা আদায়ের বিষয়ে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইটেলিজেন্স ইউনিট ফিলিপাইনের এন্টি-মানি লন্ডারিং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সক্রিয় রয়েছে। ইতোমধ্যে ফিলিপাইনের এন্টি-মানি লন্ডারিং কর্তৃপক্ষ তাদের দেশের আদালতে মামলা দায়ের করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবগুলোর ফ্রিজ আদেশ আদালত থেকে সংগ্রহ করেছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন সাইবার বিশেষজ্ঞ পরামর্শক ও তার দল এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের টিমের সঙ্গে কাজ করছেন। ফিলিপাইনের এন্টি-মানি লন্ডারিং কর্তৃপক্ষের তদন্ত সম্পন্ন হবার সংগে সংগেই অর্থ ফেরৎ আদায়ের আদালতের আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে এবং প্রয়োজনবোধে বিশ্বব্যাংকের স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি প্রক্রিয়াও অবলম্বিত হবে। সুষ্ঠূ তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়ে দেশে এবং দেশের বাইরে তদন্তলব্ধ তথ্যাদি অপ্রকাশিত রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বৃহত্তর আর্থিক খাতে সাইবার নিরাপত্তা সার্বিকভাবে নিশ্চিদ্র করার প্রক্রিয়া জোরালোভাবে সচল রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্বায়নের এই যুগে আর্থিক লেনদেনে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি অবলম্বনের বিকল্প নেই বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ সত্যকে অনুধাবন করে প্রযুক্তির উৎকর্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন ব্যাংকিং সেবা উদ্ভাবন ও আত্মীকরণের মাধ্যমে দেশবাসীকে আন্তর্জাতিক মানের সেবাপ্রদানে দেশের আর্থিকখাত এক অভাবনীয় বিপ্লব সাধন করেছে। তবে ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার একদিকে যেমন গ্রাহক সেবার মান বৃদ্ধি এবং আধুনিক বিশ্বের ব্যাংকিং সেবাকে সকলের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি বাড়িয়ে তুলেছে সাইবার আক্রমণের ঝুঁকিকে। উন্নত বিশ্বে ব্যাংকিং খাতে সাইবার আক্রমণ অনেকটা নৈমিত্তিক ঘটনা হলেও বাংলাদেশের জন্য একেবারেই নতুন। আর্থিকখাতের অভিভাবক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক এই সাইবার অপতৎপরতার বিষয়ে অবহিত হওয়া মাত্রই তা মোকাবেলায় তৎপর রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যেই ব্যাংকসমূহের অনুসরণীয় বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে এবং পরবর্তীতে যাতে আর কোন বড় ধরণের আর্থিক ক্ষতি না হয় সে বিষয়ে বাংলাদেশে কার্যরত সকল তফসিলী ব্যাংকের সঙ্গে মত বিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
