সৃষ্টির পেছনে যার ছুটে চলা। সৃষ্টির মধ্যেই যিনি খুঁজে পান আনন্দ। যার ধ্যান-জ্ঞান বিজ্ঞান ও নব নব আবিস্কার। তিনি আরিফুল হাসান অপু। একজন তরুণ উদীয়মান বাংলাদেশি আইটি উদ্যোগতা। ছাত্রাবস্থায় তিনি আবিষ্কারের দিকে বেশ মনোযোগী ছিলেন। তার বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারও রয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ কয়েকবার পুরস্কৃতও হয়েছিলেন তিনি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রায় ৪৫টি বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি মেলার নির্দেশক ও বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি তথ্যপ্রযুক্তি-ভিত্তিক সেবা প্রতিষ্ঠান ই-সফট এর প্রধান নির্বাহী ও দেশের প্রথম চিকিৎসা বিষয়ক ওয়েব পোর্টাল ডক্টরসবিডি ডটকম এর প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) এর পরিচালক এবং দেশের সবচেয়ে বড় স্টুডেন্ট ফোরাম ‘বেসিস স্টুডেন্টস ফোরাম’ এর সমন্বয়কের মত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। এছাড়াও তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় হ্যাকাথন ‘নাসা অ্যাপ চ্যালেঞ্জ-২০১৬’ এর বাংলাদেশ পর্বের সমন্বয়ক। এ নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। কথাগুলো ইত্তেফাক অনলাইনের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
IMG0
প্রশ্ন: ‘নাসা অ্যাপ চ্যালেঞ্জ’ সম্পর্কে বলুন?
উত্তর: মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা আয়োজিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় হ্যাকাথন প্রোগ্রাম এটি। এ বছর ১৭০ এর অধিক শহরে একযোগে অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশে এ বছর এই প্রতিযোগিতা দ্বিতীয়বারে মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। টেকনোলজিস্ট, বৈজ্ঞানিক, ডিজাইনার, আর্টিস্ট, এডুকেটর, উদ্যোগতাসহ সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে উদ্ভাবনী সমাধান খুঁজে বের করাই এর মূল লক্ষ্য।
প্রশ্ন: এতে অংশগ্রহণ করতে কী যোগ্যতা প্রয়োজন?
উত্তর: বাংলাদেশের যে কেউ এতে অংশগ্রহণ করতে পারবে। তবে আমরা দলগত অর্থাৎ টিম গঠনের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করার জন্য উৎসাহিত করছি।
প্রশ্ন: এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের কী কী করতে হবে?
উত্তর: আগেই বলেছি যে কেউ এতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। প্রাথমিকভাবে তিনটি জোনে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে বাছাই হবে। এরপর বাছাইকৃত প্রতিযোগীদের নিয়ে ২২-২৪ এপ্রিল মূল পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। প্রাথমিক বাছাই শুরু হওয়ার আগে দেশের ৬৪ জেলার ১০০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমরা এ প্রতিযোগিতার জন্য সচেতনতামূলক সেমিনারের আয়োজন করার লক্ষ্য ঠিক করেছি।ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তা সম্পন্ন হয়েছে। বেসিস স্টুডেন্টস ফোরামের ওয়েবসাইটে (studentsforum.basis.org.bd) গিয়ে যে কেউ নাম নিবন্ধনের মাধ্যমে এতে অংশ নিতে পারবে। এবার বিমান চালনা বিদ্যা, স্পেস স্টেশন, সৌর জগৎ, প্রযুক্তি, পৃথিবী ও মঙ্গলগ্রহ এই ছয় চালেঞ্জের ওপর ভিত্তি করে এবারের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। এই প্রতিযোগিতার আরও বিস্তারিত ‘নাসা অ্যাপ চ্যালেঞ্জ-২০১৬’ এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট 2016.spaceappschallenge.org তে পাওয়া যাবে।
প্রশ্ন: এটি কারা আয়োজন করছে?
উত্তর: এর মূল আয়োজক মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’। আর লোকাল অর্গানাইজার হিসেবে আছে বেসিস। এছাড়া আমাদের সহযোগিতা করছে বেসিস স্টুডেন্টস ফোরাম, ক্লাউড ক্যাম্প বাংলাদেশ। স্পন্সর হিসেবে আছে বাগডুম ডটকম ও পি-বাজার ডটকম।
IMG1
প্রশ্ন: নাসা আপনাদের কীভাবে সহযোগিতা করছে?
উত্তর: নাসা সরাসরি আমাদের সঙ্গে যুক্ত আছে। গত বছর যেমন স্পেস অ্যাপস প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সংগঠক আলী লিওয়েলিন বাংলাদেশে এসেছিলেন। এ থেকেই বুঝা যায় যে, তারা বাংলাদেশে এই প্রতিযোগিতাকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। প্রতিযোগিতা সফল করার জন্য সব ধরনের সহযোগিতা ও দিক নির্দেশনা তারা আমাদের দিচ্ছে।তাদের গাইড লাইন মেনেই আমরা সব কিছু করছি। এছাড়া প্রতিযোগিতায় যারা বিজয়ী হবে বা ভালো করবে পরবর্তীতে তাদের প্রোজেক্ট আরও উন্নত করতে বা যেকোনো ধরনের সহযোগিতা নাসা করবে।
প্রশ্ন: নাসায় স্থায়ীভাবে কাজ করার সুযোগ আছে কি?
উত্তর: এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নাসার সঙ্গে প্রতিযোগীদের একটি সেতু বন্ধন তৈরি হবে। প্রতিযোগীরা তাদের সক্ষমতা ভালোভাবে দেখাতে পারলে অবশ্যই নাসা তাদের কাজ করার সুযোগ দিবে। আর এই প্রতিযোগিতার মডেল এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে নাসা তাদের সেক্টর অনুযায়ী লোকবল এর মাধ্যমে নিতে পারে।
প্রশ্ন: ‘নাসা অ্যাপ চ্যালেঞ্জ’ নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
উত্তর: গত বছর যখন এই প্রতিযোগিতা আয়োজন করেছিলাম তখন শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামে এই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবার এতে দুই শহরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজশাহী। ইচ্ছা আছে পরবর্তীতে আমরা যেন প্রতিটি বিভাগকে এতে যুক্ত করার। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, আমাদের অনেক প্রতিভা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাদেরকে যেন একটি প্লাটফর্মে আনাতে পারি। তাদের প্রতিভা দিয়ে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্ববাসী যেন উপকৃত হতে পারে সে চেষ্টাই আমরা করছি।
প্রশ্ন: এই প্রোগ্রামে সহযোগিতা করছে বেসিস স্টুডেন্টস ফোরাম। বেসিস স্টুডেন্টস ফোরাম সম্পর্কে যদি একটু বলতেন।
উত্তর: বেসিস স্টুডেন্টস ফোরামের আইডিয়াটা মূলত বেসিস প্রেসিডেন্ট শামীম আহসানের মাথা থেকে আসে। পরবর্তীতে তিনিসহ কার্যনির্বাহী বোর্ডের সব সদস্যদের সহযোগিতায় এটি ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। বর্তমানে সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় আড়াই লাখ স্বেচ্ছাসেবক এই ফোরামের সঙ্গে যুক্ত আছে। স্থানীয় আইটি শিল্পে যে বিপুল পরিমাণ দক্ষ পেশাজীবী প্রয়োজন, সে চাহিদা পূরণ এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ফিনান্সিয়াল সাপোর্ট কিংবা বিনিয়োগে সহযোগিতা করতেই এই ফোরামের যাত্রা শুরু হয়। ইতিমধ্যে অনেক বড় বড় প্রোগ্রাম আমরা এই স্টুডেন্টস ফোরামের মাধ্যমে সফলতার সাথে সম্পন্ন করেছি। গত এক বছরে সারা দেশে একশটিরও বেশি সভা ও সেমিনার আয়োজন করেছি। তারই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় বারের বিশ্বের সবচেয়ে বড় হ্যাকাথন ‘নাসা অ্যাপ চ্যালেঞ্জ-২০১৬’ সফল করতে যুক্ত হয়েছে বেসিস স্টুডেন্টস ফোরাম।
IMG2
প্রশ্ন: আমরা জানি, আপনি ছাত্র জীবনে আবিষ্কারের দিকে বেশ মনযোগী ছিলেন। আপনার বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারও আছে আপনার।পরবর্তীতে একজন সফল উদ্যোগতা হিসেবে আপনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। এখন আপনি ‘নাসা অ্যাপ চ্যালেঞ্জ’ এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন। দেখা যাচ্ছে, সব ক্ষেত্রেই আপনি সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। এত কিছুর সমন্বয় করেন কিভাবে?
উত্তর: ছাত্র জীবনে থেকেই উদ্ভাবনী কিছু করতে আমার খুব ভালো লাগতো। সেই ভালো লাগা থেকেই একসময় আবিষ্কারের পেছনে ছুটেছি। ছাত্রাবস্থায় বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করতে স্কুল-কলেজে অনেক কর্মশালা নিজ উদ্যোগে সফলভাবে করেছি। যা পরবর্তীতে নতুন কিছু করতে আমাকে অনুপ্রাণিত করে এবং সাহস যোগায়। আসলে ইচ্ছা এবং নিষ্ঠা থাকলে অনেক কিছুই করা সম্ভব।
প্রশ্ন: যেহেতু আপনি তরুণদের নিয়ে কাজ করছেন, তাই আপনার কাছে জানতে চাই বর্তমানে তরুণদের নিয়ে আপনি কতটুকু আশাবাদী।
উত্তর: আমাদের দেশে বর্তমানে ৬০ ভাগের বেশি মানুষের বয়স ২৫ এর কম। তাই দেশের ভবিষ্যৎ এই তরুণদের ওপরেই নির্ভর করছে। তাদের নিয়ে আমি খুব আশাবাদী। এই তরুণদের জন্যই আজ দেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে যাবে।
প্রশ্ন: তরুণদের নিয়ে আপনার বা বেসিসের পরিকল্পনা কী?
উত্তর: আগেই যেটা বলেছি, তরুণদের দক্ষ মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বর্তমানে দেশে বিদেশে আইটি সেক্টরে যে বিশাল সম্ভাবনা আছে সেটিকে কাজে লাগিয়ে এদেশের তরুণরা যাতে সামনে এগিয়ে যেতে পারে সে তাদের দক্ষ করে গড়ে তুলতেই সারা বছর আমরা বছরব্যাপী বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচী পরিচালনা করছি। আমরা চাই, তারা যেন বিশ্বের যেকোনো স্থানে গিয়ে প্রতিযোগিতা করার মতো যোগ্যতা রাখে। এছাড়া দেশের সব শ্রেণির মানুষকে আইটি সচেতন করে তুলতে কাজ করে যাচ্ছি।
