প্রতিষ্ঠার ৩৭ বছরে সংঘাত-বিক্ষোভ, জনপ্রিয়তা আর চড়াই-উৎরাইয়ের পথ-পরিক্রমায় বিএনপি আজ এক চরম বৈরী সময় অতিক্রম করছে। বহুল আলোচিত ‘ওয়ান ইলেভেন’ পটবদল থেকেই এদলের ওপর অকাল দুঃসময় দশ প্রহরণে ঘিরে নিয়েছে। বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে দুই দফার সর্বব্যাপী আন্দোলনে ব্যর্থতার পটভূমিতে ক্রমশ গভীর সংকট আর অনিশ্চয়তা ভর করেছে বিএনপিতে। একুশ হাজার মামলার খড়্গ, হুলিয়া জেল ঘরবাড়ি ছাড়া পরিস্থিতির ভেতর এই দলটি আর রাজপথে দাঁড়াতে পারছে না। সারাদেশের দলীয় অফিসগুলো তালাবদ্ধ। সব মিলিয়ে নেতা-কর্মীরা ছত্রভঙ্গ। পায়ে পায়ে প্রতিকূল সময়ে আজ অনেক অনিশ্চয়তা কাটিয়ে কাউন্সিল করতে যাচ্ছে। দলটির যাত্রাপথ মোটেও মসৃণ ছিল না। কখনো ক্ষমতার মসনদে। আবার কখনো বছরের পর বছর ক্ষমতার বাইরে। দলটির সবশেষ অবস্থান সংসদের বাইরে। দলটির সোনালী দিন, সুসময় ছিল। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ৪৩ বছরে বেশিবার নির্বাচনে জিতে সবচেয়ে বেশি সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল এ দলটি। এখন এই দলটিই টানা আট বছর ক্ষমতার বাইরে। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি নির্বাচন প্রতিহতের আন্দোলনে নামে। নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হয় দলটি। আওয়ামী লীগ সরকারে সাত বছরে বিএনপির আন্দোলনে থাকলেও তাতে সফলতা আসেনি। দলটি এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এমন ভয়াবহতার মুখে পড়েনি তার ৩৭ বছর বয়সে কখনো। দুই দফা বড় মাত্রার আন্দোলনের জের ধরে বহুনেতা কারাগারে। অনেকে গ্রেফতার আতঙ্কে আত্মগোপনে ঘর ছাড়া। দলের ভেতর-বাইরে এখন প্রায় নির্জীব অবস্থা। নানা ঘাত-প্রতিঘাতে তাদের সাংগঠনিক অবস্থা অনেকটা নাজুক। তাই এখনো ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন নেতা-কর্মীরা।
১৯৭৮ সালের পয়লা সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদীদের যূথবদ্ধ শক্তিমঞ্চ হিসাবে গঠন করেছিলেন বিএনপি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান আর পাল্টা-অভ্যুত্থানের এক পটভূমিতে ৭ নভেম্বর ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন জিয়াউর রহমান। প্রথমে তিনি ১৯ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) নামে বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর একটি সমন্বিত প্লাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করেন। পরে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পরপরই দলের নীতি, আদর্শ, কর্মপন্থা এবং উদ্দেশ্য-লক্ষ্য ঠিক করে বিএনপি এগিয়ে যায়।
এ দলের সমর্থকরা বিশ্বাস করেন যে, তার আত্মপরিচয় সে কেবল ‘বাঙালি নয়’, ‘বাংলাদেশি’। উন্নয়ন-উত্পাদনের আধুনিক রাজনীতিকে মূল প্রতিপাদ্য করে ১৯ দফা কর্মসূচির আলোকে পাঁচ মাসের মাথায় ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২০০টি আসন লাভ করে। এ দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশি-বিদেশি কুচক্রীদের গভীর ষড়যন্ত্রে প্রাণহরণের শিকার হন ১৯৮১ সালের ৩০ মে। জিয়াউর রহমান নিহত হলে বিএনপি প্রথমবারের মতো নেতৃত্বের সংকটে পড়ে। তত্কালীন উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার সাময়িক সময়ের জন্য সরকার ও দলের হাল ধরেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ জেনারেল এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। এসময় দলে ভাঙনের সৃষ্টি করা হয়। দলের সংকটকালে ১৯৮৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বিএনপির হাল ধরেন বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ নয় বছরের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের পর ৯১ সালে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। বিএনপি গঠনের পর কালযাত্রায় তারা দেশ শাসন করেছে ১৮ বছর। দলটির ৩৭ বছরের ইতিহাসে ৩২ বছর ধরে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন বর্তমান চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
সর্বশেষ ২০০১ সালের ১ অক্টোবর জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে। তৃতীয়বারের মত প্রধানমন্ত্রী হবার অনন্য গৌরব অর্জন করেন দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। সর্বশেষ পাঁচ বছরের দায়িত্ব পালন শেষে ২০০৬ সালের অক্টোবরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেন।
দলের কাউন্সিলকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, বিএনপি ধ্বংসে ষড়যন্ত্র অব্যাহত আছে। এ ষড়যন্ত্রও ফলপ্রসু হবে না। কারণ বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করা যাবে না। আবার ঘুরে দাঁড়াবে বিএনপি। গণতন্ত্র এবং জনগণের ভোটের অধিকারকে ফিরিয়ে আনবই।
মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, প্রতিষ্ঠার ৩৭ বছরে বিএনপির ওপর একের পর আঘাত এসেছে। এক-এগারোর সময় বিএনপিকে ভাঙার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। কিন্তু খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
