সুন্দরবনে আগুন এখন নিয়ন্ত্রণে

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০১৬, ০১:২৬
বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের জিউধরা স্টেশনের নাংলীর শিকদারের ছিলা নামক স্থানের গহীন অরণ্যে লাগা আগুন ২০ ঘণ্টা পর নিয়ন্ত্রণে এসেছে। রবিবার বিকাল ৪টায় অজ্ঞাত কারণে বনে আগুন লাগে। গতকাল সোমবার দুপুর ১২টার দিকে তা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ইতিমধ্যে পুড়ে গেছে কয়েক একর বনভূমি। মরা ভোলা নদী থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার গহীন অরণ্যের এই আগুন এখনো সম্পূর্ণ  নেভানো যায়নি। ‘ফায়ার অব লাইনের’ মধ্যে কোথাও-কোথাও ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে মাঝে মাঝেই আগুন জ্বলে উঠছে।
 
আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বন সন্নিহিত লোকালয়ের কয়েকশ’ সাধারণ মানুষ, টাইগার টিমের সদস্য, সুন্দরবন বিভাগ ও ফায়ার সার্ভিসের মোরেলগঞ্জ ইউনিটের সদস্যরা সোমবার দুপুর পর্যন্ত নালা কেটে পানি ভরে ফায়ার অব লাইন স্থাপনের কাজ শেষ করে। তবে দুপুরে আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসলেও ইতিমধ্যে পুড়ে যায় আধা বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে থেকে-থেকে কয়েক একর বনভূমি। এদিকে সুন্দরবনে অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) বেলায়েত হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন চাঁদপাই রেঞ্জের স্টেশন কর্মকর্তা (রেঞ্জার) গাজী মতিয়ার রহমান ও ধানসাগর স্টেশন কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ। সুন্দরবন বিভাগের এই তদন্ত কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে আগুন লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। জানা গেছে, এনিয়ে গত ১২ বছরে বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জে ১৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুড়ে  গেছে  সুন্দরবনের বিপুল পরিমাণ গাছপালা। সুন্দরবন বিভাগ এতথ্য নিশ্চিত করেছে।
 
পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের জিউধরা স্টেশনের নাংলীর শিকদারের ছিলার গহীন অরণ্য থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, গতকাল দুপুর পর্যন্ত আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। ফায়ার অব লাইনের মধ্যে কোথাও-কোথাও ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে থেমে-থেমে আগুন জ্বলে উঠছে। এই আগুন  নেভাতে ছুটে যাচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। কিছু সময়ের মধ্যে আগুন নিভিয়েও ফেলছে। ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় ভোলা নদী থেকে শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে ফায়ার অব লাইন পানি ভরে রাখা হচ্ছে।
 
সুন্দরবন বিভাগ ও বন সন্নিহিত লোকালয়ের বাসিন্দারা জানান, রবিবার বিকাল ৪টার দিকে এলাকাবাসী প্রথমে বনের গহীনে ধোঁয়া দেখতে পান। পরে সন্ধ্যায় তারা চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের বন কর্মকর্তাদের অগ্নিকাণ্ডের খবর জানান। খবর পেয়েই ধানসাগর স্টেশনের কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ বনরক্ষীদের নিয়ে রাত ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে এই কর্মকর্তা বন সন্নিহিত লোকালয়ের কয়েকশ’ সাধারণ মানুষ, টাইগার টিমের সদস্যদের কাছে আগুন নেভাতে সহায়তা চায়। নিরাপত্তার অভাবে রবিবার রাতে কেউ আগুন  নেভাতে না গেলেও সোমবার ভোরে লোকালয়ের কয়েকশ’ সাধারণ মানুষ, টাইগার টিমের সদস্য, সুন্দরবন বিভাগ ও ফায়ার সার্ভিসের মোরেলগঞ্জ ইউনিটের সদস্যরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ শুরু করেন। আগুন যাতে গোটা সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেই জন্য উঁচু বনভূমিতে নালা কেটে পানি ভরে ফায়ার অব লাইন স্থাপনের কাজ শুরু হয়। দুপুর ১২টার দিকে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের  বিভাগীয় কর্মকর্তা ( ডিএফও) মো. সাইদুল ইসলাম ঘটনাস্থলে পৌঁছান।
 
মোরেলগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের ইন-চার্জ স্বপন কুমার ভক্ত ঘটনাস্থল  থেকে জানান, আগুন এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এখন আর সুন্দরবনে বড় ধরনের ক্ষতির আশংকা নেই। তবে সুন্দরবনের পচা শিকড়ে তৈরি হওয়া মিথেন গ্যাসের কারণে মাটির নিচ দিয়ে আগুন অনেক দূরে চলে যায়। সে কারণে মাটিতে ফায়ার অব লাইনের জন্য নালা কেটে তাতে পানি ভরে রাখতে হচ্ছে যাতে করে আগুন সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়তে না পারে। আগামী দুদিন পর্যবেক্ষণের পরই বলা যাবে সুন্দরবনের আগুন সম্পূর্ণরূপে নিভেছে কিনা।
 
আগুন  নেভাতে আসা সুন্দরবন সন্নিহিত লোকালয়ের নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বনজীবী জানান, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার প্রভাবশালীরা প্রতি বছর সুন্দরবনের জলাশয়গুলো অলিখিতভাবে বন বিভাগের কাছ থেকে ‘কথিত ইজারা’ নিয়ে বর্ষা মৌসুমে মাছ শিকার করে। ওই প্রভাবশালী চক্র সুন্দরবনের জলাশয় পরিষ্কার করার জন্য তারা শুষ্ক মৌসুমে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটায়। কিন্তু সুন্দরবন বিভাগ বিষয়টি অবগত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয় না। ফলে প্রতি বছরই সুন্দরবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে চলেছে।
 
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. সাইদুল ইসলাম জানান, আগুন এখন নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। এ মুহূর্তে সুন্দরবনের ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ বলা যাচ্ছে না। আগুন যাতে আবার জ্বলে উঠে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্য ফায়ার সার্ভিস ও বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সেখানে থাকতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে আগুন লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে তার কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
 
আগুনে মূল্যবান গাছপালার ক্ষতি হয়নি- বনবিভাগ
 
বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, আগুনে বনের তেমন কোন মূল্যবান বনজ সম্পদের ক্ষতি হয়নি বলে দাবি করেছে বন বিভাগ। বনবিভাগ বলছে, আগুনের বিস্তৃতি আধা একরের মতো হবে। আগুনে কিছু লতাগুল্ম জাতীয় গাছপালা পুড়ে গেছে। সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. সাইদুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে এই প্রতিবেদককে বলেন, সুন্দরবনের যে এলাকায় আগুন লেগেছে সেখানে বনের তেমন কোন মূল্যবান গাছপালা নেই। প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, সেখানে লতাগুল্ম প্রজাতির কিছু গাছ (স্থানীয় নাম ‘বলা গাছ’) পুড়ে গেছে। আগুন এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নতুন করে কোথাও আর ধোঁয়া দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরও আমরা এলাকাটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। গ্রীষ্ম মৌসুমে বনে থাকা গাছপালার পাতা পড়ে এক ধরনের মিথেন গ্যাস তৈরি হয়। অনেক সময়  সেই গ্যাস থেকেও আগুন ধরতে পারে। তবে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহে আসা মৌয়াল অথবা লোকালয় থেকে বনে আসা মানুষের অসাবধানতাবশত ফেলে দেয়া বিড়ি সিগারেট বা মশালের আগুন থেকেও এই আগুন লাগতে পারে।