জাতীয় পার্টি-জেপি’র চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি বলেছেন, আজকে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে দেশের রাজনীতির মৌলিক চরিত্র হতে হবে স্বাধীন রাষ্ট্র উপযোগী। এ ক্ষেত্রে স্বাধীনতার আগের ও পরের রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্পষ্টত পার্থক্য নির্ধারণ করে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের ধারাকে প্রাধান্য দিতে হবে। তাহলেই অনেক ত্যাগ ও তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল আমরা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে লাভ করতে সক্ষম হব।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে পিরোজপুর জেলার কাউখালী উপজেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, দেশে বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন চলছে। এই নির্বাচন জাতীয় ক্ষেত্রে দৃশ্যত তেমন কোনো গুরুত্ব বহন না করলেও দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায়, তৃণমূল পর্যায়ে তার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সুদূরপ্রসারী। মানুষের সবচেয়ে কাছের সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান গঠনের ব্যবস্থা এটি। প্রথম দফা নির্বাচনে ভাণ্ডারিয়া ও কাউখালী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের কিছু কিছু কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত হয়েছে। যা অপ্রত্যাশিত মনে হলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার বিবেচনায় তা ছিল স্বাভাবিক ও অপরিহার্য। এসব কেন্দ্রে ভোট গ্রহণকালে কিছু কিছু শান্তি-শৃঙ্খলা লঙ্ঘিত হওয়ার ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা হিসাবেই এ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। স্থগিত কেন্দ্রগুলোর পুনঃনির্বাচন নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠিত হবে এবং এ ক্ষেত্রে যাতে আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে তা নিশ্চিত করা আবশ্যক। তবে সীমিত শক্তির পুলিশ বাহিনীর ওপর নির্ভর করে বা তাদের ওপর দায়-দায়িত্ব চাপিয়ে শৃঙ্খলা রক্ষায় জনগণের ভূমিকাকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
মন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচনী এসব ঘটনা সাময়িক এবং নির্বাচনের পূর্বাপর এরূপ কিছু নাজুক পরিস্থিতি সব সময়ই ঘটে। তবে এবার ইউনিয়ন পরিষদে দলীয় পরিচয় ও প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় নতুন কিছু অনভিপ্রেত বিষয় পরিলক্ষিত হয়েছে। যা আগামীতে ক্রমান্বয়ে দূর হয়ে যাবে। আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে এসব ঘটনা ভুলে গিয়ে অতীতের মত উন্নয়নসহ এলাকার সেবামূলক সকল কাজ সবাই মিলে করতে পারি। তা না হলে এলাকার মানুষের ন্যায্য পাওনা বিনষ্ট হবে।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, আজকের এই উপজেলা ব্যবস্থা প্রচলনের শুরুতে এর উদ্দেশ্য ছিল মহত্। কিন্তু দীর্ঘ সময় এখানে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। এখনও উপজেলার প্রায় সকল কর্মকর্তাই কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অধীন নন বলেই তৃণমূলের মানুষ বঞ্চিত হয়। আমরা গত ৩২ বছর ধরে রাজনৈতিক দল ও মত নির্বিশেষে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টায় ছিলাম। আমরা কখনো এলাকায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা দলীয় সংকীর্ণ মানসিকতাকে প্রশ্রয় দেইনি। আমাদের দলের লোকজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা এ বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করলেও উন্নয়নের স্বার্থে আমরা ঐক্যের রাজনীতিকে অবলম্বন করেছি।
তিনি বলেন, আমার ১৪ বছরের মন্ত্রিত্ব ও ছয় বারের সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালনকালে কখনোই স্থানীয় সরকারের কাজে অযাচিত প্রভাব সৃষ্টি করিনি। যদিও সংসদ সদস্য হিসাবে এ সকল ক্ষেত্রে পরামর্শ দেয়ার সুযোগ বিদ্যমান আছে। কিন্তু এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সবার অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করতে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমরা এ আচার-আচরণ থেকে বিরত থেকেছি। আমরা মনে করি আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সকলে মিলে মানুষের অধিকার রক্ষা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে অর্জিত স্বাধীনতা নিরর্থক হবে। মনে রাখতে হবে একতাই শক্তি। আর এই শক্তিকে পাথেয় করে কাউখালী-ভাণ্ডারিয়ার মত দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি পল্লী অঞ্চলকে গত ৩২ বছরে একটি সুগম ও গাড়ি চলাচল উপযোগী অঞ্চলে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছি। আগামীতেও মানুষের অধিকার স্থাপনে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে আইন-শৃঙ্খলা কমিটির এ সভায় কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল কালাম তালুকদারের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য রাখেন উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম আহসান কবির, পরিবেশ ও বন মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব মহিউদ্দিন মহারাজ, সদর ইউনিয়নের পুনঃনির্বাচিত চেয়ারম্যান আমিনুর রশীদ মিল্টন, আমড়াজুড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কৃষ্ণ লাল গুহ, নব নির্বাচিত চেয়ারম্যান শামসুদ্দোহা চাঁদ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার আলী হোসেন তালুকদার প্রমুখ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান মিঠু, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী ফাতেমা ইয়াসমিন পপি, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন, জেপি’র উপজেলা সভাপতি মাহবুবুর রহমান খান, শিয়ালকাঠি ইউপি চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন সিকদার প্রমুখ।
পরিবেশ মন্ত্রী এ সময় কাউখালী উপজেলার সকল ইউনিয়নে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সমূহে জলবায়ু প্রভাব সহনীয় গৃহ প্রাপ্তদের মধ্যে বরাদ্দপত্র হস্তান্তর করেন।
এদিকে ভাণ্ডারিয়া সংবাদদাতা ফজলুর রহমান জানান, পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু গতকাল সন্ধ্যার পর উপজেলার ভিটাবাড়িয়া ইউনিয়নের কাপলিরহাট আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ইউনিয়ন জেপি আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বলেন, আমাদের দেশে ইউপি নির্বাচন একটি জটিল বিষয়। এ নির্বাচনকালে সব সময়ই কিছু না কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। তবে আমাদের এলাকায় তা তুলনামূলক কম। তারপরও এখানে বাড়ি-ঘরে আগুন দেয়া, মারপিট, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের যে ঘটনা ঘটেছে তা একেবারে ছোট করে দেখার বিষয় না। অতীতে এসব ঘটনা ছিল না। নারীদের ঘরে রেখে যেসব পুরুষ এলাকা ছেড়েছেন তাদের নির্ভয়ে পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মহল বিশেষের প্ররোচনায় উঠতি যুবকরা যেসব অপরাধ করেছে তাতে সরকারেরই ক্ষতি হয়েছে। এরপর আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ওই ইউনিয়নের উত্তর শিয়ালকাঠি মঞ্জু মার্কেটে আওয়ামী লীগ মনোনীত নব নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান খান এনামুল করিমের দেয়া এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে সকল হানাহানি ও রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে যেতে হবে। অতীতের ধারাবাহিকতায় ঐক্যবদ্ধভাবে এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে হবে। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ভাণ্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম তালুকদার উজ্জল, ইউএনও মো. রুহুল কুদ্দুস, ভাণ্ডারিয়ার সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম সরওয়ার জোমাদ্দার, ইউনিয়ন জেপি’র সভাপতি আব্দুল হালিম শরীফ, সম্পাদক রেজা আহমেদ দুলাল প্রমুখ।
এদিকে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বুধবার রাতে উপজেলার ধাওয়া ইউনিয়নে একটি মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যকালে বলেছেন, স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় ভাণ্ডারিয়ায় দেশের অন্যান্য স্থানের চেয়ে শান্তিপূর্ণভাবে জনগণ ভোট দিতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় আমরা উন্নয়নের রাজনীতি করছি। সন্ত্রাসের রাজনীতি করি নাই। সন্ত্রাসীদেরকে অবশ্যই জবাবদিহি, দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চাইতে হবে। যদি তারা তা না করেন, তাহলে সন্ত্রাসের শেকড়ের মূলোত্পাটন করা হবে। এ ইউনিয়নের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের পরিদর্শন শেষে পশারিবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জাতীয় পার্টি-জেপি’র উদ্যোগে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, আমরা পাকিস্তানিদের জেল, জুলুম ও নির্যাতন সহ্য করে তাদের পরাজিত করে দেশের স্বাধীনতা আনতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমরা তাদের কাছে মাথা নত করি নাই। তাই আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠতি অপশক্তিকে পরাজিত করতে হবে। এখানকার মানুষ শান্তিপ্রিয়। তারা উন্নয়ন বলতে বুঝে স্কুল, কলেজ, রাস্তা-ঘাটসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর উন্নয়ন। ছোটখাট কাজ এলাকার মানুষের একত্রিতভাবে করতে হবে। সকল বিষয়ে সরকারের উপর নির্ভরশীল হলে চলবে না। আমাদের মধ্যে দেশপ্রেম গড়ে না উঠলে উন্নয়ন সম্ভব নয়। পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আরও বলেন, যারা প্রশাসনের সাহায্যপুষ্ট হয়ে জনগণের উপর নির্যাতন চালায় এবং ক্ষমতায় থেকে পেশীশক্তি দেখায় তারা যখন ক্ষমতায় থাকবেন না তখন আপনাদের পাশে প্রশাসন থাকবে না তখন বুঝবেন ক্ষমতায় থাকা আর না থাকার মধ্যে পার্থক্য কি। তিনি বলেন, আমার মানুষের গায়ে যারা হাত দিয়েছেন তাদের কেউ কোনো প্রকারে রেহাই পাবে না।
উক্ত মতবিনিময় সভায় ধাওয়া ইউনিয়ন পরিষদের জাতীয় পার্টি-জেপি’র সমর্থিত বাই-সাইকেল মার্কায় পুনঃনির্বাচিত চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান টুলু’র সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন জাতীয় পার্টি-জেপি’র কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব ও ভাণ্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম উজ্জল তালুকদার, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মহিউদ্দিন মহারাজ, নবনির্বাচিত ইউপি সদস্য যুব সংহতি নেতা ফিরোজ হোসেন মুন্সি, আক্তারুজ্জামান কামাল, সাংবাদিক মোঃ দেলোয়ার হোসেন, মোঃ ফজলুল হক মাস্টার, মাওলানা সাইফুল্লাহ ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হামিদ সিকদার। এসময়ে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ভাণ্ডারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস, ভাণ্ডারিয়া থানার অফিসার ইন-চার্জ মোঃ কামরুজ্জামান তালুকদার, উপজেলা জেপি’র যুগ্ম-আহবায়ক ভাণ্ডারিয়া পৌর সহায়তা কমিটির সদস্য মোঃ গোলাম সরোয়ার জোমাদ্দার, ইউসুব আলী আকন, আবুল কালাম পোদ্দার, যুব সংহতির উপজেলা আহবায়ক মোঃ শহিদুুজ্জামান রাজু মল্লিক, সদস্য সচিব মনির সরদার, ছাত্র সমাজের আহবায়ক আরিফুল ইসলাম শিমুল আকন, সদস্য সচিব সালাউদ্দিন রাহাত জোমাদ্দার প্রমুখ।
পরে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে ধাওয়া ইউনিয়নের অসচ্ছল পরিবারসমূহের মধ্যে জলবায়ু প্রভাব সহনীয় গৃহ প্রাপ্তদের বরাদ্দপত্র হস্তান্তর করেন।
