রিজার্ভের অর্থ হ্যাক

নেপথ্যে কারা :এখনো অনিশ্চিত ফিলিপাইন

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০১৬, ১২:০৮
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হাতিয়ে নেয়ার নেপথ্যে কারা রয়েছে সে বিষয়ে এখনো ঘোরের মধ্যে রয়েছে ফিলিপাইন। রিজার্ভ চুরির এ ঘটনায় সেদেশের সিনেটের ব্লু রিবন কমিটি সাত সপ্তাহ ধরে তদন্ত করেছে। তিনটি শুনানিও হয়েছে। ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের (আরসিবিসি) প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগও করতে হয়েছে।
 
তারপরও ঘটনার জন্য মূল দায়ী কে তাকে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। তাই আগামী মঙ্গলবার আবার শুনানি ডেকেছে সংশ্লিষ্ট কমিটি। এদিকে সুইফটের আঞ্চলিক এমডি বাংলাদেশে আসবেন কাল সোমবার। আর আজ ফিলিপাইন যাচ্ছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি দল।
 
সুইফটের এমডি আসছেন সোমবার
 
বাংলাদেশে আসছেন সুইফটের (সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টার ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন) উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এডওয়ার্ড হাদ্দাদের নেতৃত্বে ওই দল কাল সোমবার আসবেন। তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, একাউন্ট এন্ড বাজেটিং বিভাগের ব্যাক অফিস অব ডিলিং রুমের কর্মকর্তা এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এমডিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে।
 
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, এর আগে সুইফটের সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারদের দুজনের একটি প্রতিনিধি দল এসেছিলেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধি দলের আসার কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে তাদের বৈঠকও হবার কথা রয়েছে। তবে কবে আসবেন সে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়।
 
ব্যাংক প্রতিনিধি দল ফিলিপাইন যাচ্ছে
 
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি দল আজ অথবা কালকের মধ্যে ফিলিপাইন যাবে। প্রতিনিধি দলে থাকবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক জাকের হোসেন এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রব।
 
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারে ফিলিপাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জন গোমেজ কাজ করছেন। তাকে তথ্য-উপাত্ত দেয়াসহ বিভিন্ন সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিনিধি যাচ্ছেন। তবে কবে যাচ্ছেন তা নিশ্চিত করে না বলতে পারলেও তিনি বলেন, দু-এক দিনেই যাবেন তারা।
 
ফিলিপাইনের নিউজ ওয়েবসাইট র্যাপলার বলছে, তদন্তের   ৭ সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও রিজার্ভ চুরির ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা যায়নি। আর এখনো সঠিকভাবে জানা যায়নি চুরি যাওয়া ওই অর্থের অবস্থানও। ১৯ ফেব্রুয়ারি অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি) তার কাজ শুরু করার পর থেকে অনেক কিছু ঘটে গেছে এই রিজার্ভ চুরি নিয়ে: প্রথমে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান ও পরে দুই ডেপুটি গভর্নর পদত্যাগ করলেন। মামলা দায়ের হলো, ফিলিপাইনে অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত দেশটির আরসিবিসি’র প্রেসিডেন্ট এবং সিইও লরেঞ্জো ট্যান ছুটিতে গেলেন এবং সবশেষে চুরি যাওয়া কিছু অর্থ এএমএলসির কাছে ফেরত এসেছে।
 
চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত বিষয়ে ফিলিপাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল জন গোমেজ বলছেন ‘সঠিক দিকে এগুচ্ছে’। বাকি অর্থ উদ্ধারে ফিলিপাইন সরকারকে সহায়তা করতে বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধিরা সেখানে যাবেন বলেও জানানো হয়েছে। আগামী মঙ্গলবার ফিলিপাইন সিনেটে এ নিয়ে চতুর্থ শুনানি বসতে যাচ্ছে।
 
সবাই একে অপরকে চেনেন
 
রিজার্ভ চুরির ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার ফিলিপাইনে পাচারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজনদের সবাই একে অপরকে কোনো না কোনোভাবে চেনেন। আরসিবিসি, ফিলরেম সার্ভিস কর্পোরেশন, সোলেয়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনো, মাইদাস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট এবং কয়েকজন ক্যাসিনো পরিচালকের নাম উঠে এসেছে তদন্তে। সিনেটের শুনানিতে আটক ক্যাসিনো ব্যবসায়ী কিম অং জানান, তিনি ফিলরেমের ট্রেজারার মাইকেল বাতিস্তা, আরসিবিসি’র ট্যান, ব্যাংকটির জুপিটার শাখার বরখাস্ত ম্যানেজার মায়া সান্তোস দেদগুইতো, চীনা-ফিলিপিনো ব্যবসায়ী উইলিয়াম গো এবং গাড়ি বিক্রেতা জেসন গোকে বিভিন্নভাবে চেনেন।
 
চুরি যাওয়া অর্থ আরসিবিসি অফিসে যায় দু’বার
 
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চুরি হয়ে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার একবার না, পর পর দু’বার আরসিবিসি ব্যাংকে যায় লেনদেনের জন্য। তারপরও ব্যাংকটি যাচাই বাছাই না করেই টাকা তোলা ও ফিলিপাইন পেসোতে রূপান্তরের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো।
 
অর্থ প্রথমে ৪ ফেব্রুয়ারি সুইফট কোডের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েলস ফারগো মেলন ব্যাংক, সিটিব্যাংক এবং ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক হয়ে আরসিবিসিতে ডলার রেমিটেন্স হিসেবে প্রবেশ করে। তবে সরাসরি জুপিটার শাখায় নয়, প্রথমে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সেটলমেন্ট ডিভিশন হয়ে ৬ ফেব্রুয়ারি জুপিটার শাখার হাতে গিয়েছিলো ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার।
 
৫ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি ৬ কোটি ১০ লাখ পরিমাণ ভাগে ভাগে আরসিবিসি ট্রেজারি থেকে পেসোতে পরিণত করে ফিলরেমে নেয়া হয় বলে জানান সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট সালুদ বাতিস্তা। সুতরাং অর্থ আবার আরসিবিসিতে ফেরত গিয়েছিলো। অথচ এর মাঝে ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক লেনদেন থামাতে সুইফট কোডের মাধ্যমে আরসিবিসির সঙ্গে যোগাযোগ করলেও ব্যবস্থা নেয়নি আরসিবিসি।
 
হদিস নেই প্রায় ২ কোটি ডলারের
 
সিনেট শুনানিতে কিম অং দাবি করেন, জালিয়াতির ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের প্রায় ৪ ভাগের এক ভাগের হদিস এখনো পাওয়া যায়নি। ৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার সোলেয়ার এবং মাইদাস ক্যাসিনোতে গেলেও ১ কোটি ৭০ লাখ ডলারের হিসেব এখনো মিলছে না। তা এখনো ফিলরেমের কাছে আছে বলে দাবি করেন তিনি। অবশ্য ওংয়ের এই দাবি নাকচ করেছেন তদন্তকারীরা।
 
একটা অংশ ক্যাসিনোতে ঘুরছে
 
সোলেয়ারের অপারেটর ব্লুমবেরি রিসোর্টস করপোরেশনের আইনি প্রধান সিলভারিও বেনি ট্যান গত শুনানির সময় নিশ্চিত করেন, সোলেয়ারের গেমিং টেবিলে ১৩৬ কোটি পেসোর লেনদেন হয়েছে, যার বিরাট একটা অংশ এক প্রভাবশালী বিদেশি ক্যাসিনো ব্যবসায়ীর মাধ্যমে অপারেটর ডিং ঝিজের অ্যাকাউন্টে চলে যায়। বেনি ট্যান জানান, সোলেয়ার গত ১০ মার্চ ডিংয়ের অ্যাকাউন্ট জব্দ করে। ওই অ্যাকাউন্টে মোট ১০ কোটি ৮৬ লাখ পেসো বা ২৩ লাখ ডলার পাওয়া গেছে। উপযুক্ত কোর্ট অর্ডার পেলেই অর্থটি ফেরত দেয়া হবে বলে জানান ট্যান।
 
একাংশ এএমএলসিতে ফেরত আসছে
 
মাইদাস হোটেল অ্যান্ড ক্যাসিনোর এজেন্ট হিসেবে কাজ করা ওং শেষ শুনানিতে নিশ্চিত করেন, তার কোম্পানি ইস্টার্ন হাওয়াই লেজার কোম্পানি লিমিটেড ১০০ কোটি পেসো বা ২ কোটি ১৫ লাখ ডলার পায়। এর মধ্যে ৪৫ কোটি পেসো দিয়ে সহযোগী চীনা অপারেটর গাও শুহুয়া’র দেনা শোধ করেন কিম অং। আর ৫৫ কোটি পেসো চলে যায় গেমিং টেবিলে। আরো ৫১ কোটি পেসো মাইদাসে কোথাও নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে বলে জানান তিনি। তবে তার অধীনে থাকা নগদ ৪৬ লাখ ডলার ৩১ মার্চ এএমএলসিকে ফেরত দেন অং।
 
অপারেটররাই জালিয়াতিতে সহায়তা করেছে
 
কিম অং সিনেট প্যানেলকে জানান, ক্যাসিনো অপারেটর ডিং ঝিজে এবং গাও শুহুয়া ফিলিপাইন ক্যাসিনোগুলোতে জালিয়াতির টাকা সরিয়ে নেয়ার কাজে সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের মাধ্যমেই ফিলিপাইনে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ঢোকার সুযোগ পেয়েছিল বলে জানান কিম অং।