তিশার হত্যাকারীর ফাঁসি ও পুলিশ স্বামীর সন্ধান চান পরিবারের সদস্যরা

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০১৮, ১৫:০০

সিলেটের ওসমানীনগরে ঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে খুনের শিকার হওয়া সুমি আক্তার তিশার স্বামীর নাম শাহনেওয়াজ জয়। উল্লেখ্য, তিশার লাশ মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা হয়। বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। পরে তার পরিচয় শনাক্ত হয়। 

তিশার বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ থানার নয়নপুর গ্রামে। তারা ৪ ভাই ৪ বোন। তিশা ওই পরিবারের তৃতীয় সন্তান। তাদের পিতার নাম আব্দুল মান্নান। তিশার বড় বোনের মেয়ে বৃষ্টি আক্তার মারজান জানান, ৩ নভেম্বর নানাকে দেখার জন্য তিশার খালা নারায়নগঞ্জ শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে যান। ৪ নভেম্বর রাত থেকে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি বন্ধ দেখায়। এরপর থেকে বিভিন্ন স্থানে আমরা তার সন্ধান করে পাইনি। 

তিশার বড় বোন নাজমা বেগম জানান, এসএসসি পর্যন্ত পড়ালেখা জানা তিশা নারায়নগঞ্জ শহরে ভুইঘর এলাকায় বড় বোনের (নাজমা বেগম) বাসায় থেকে একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে চাকরি করতেন। সেখানে জয়ের সঙ্গে তার পরিচয় এবং পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রেমের সম্পর্ক হয়। ৭-৮ বছর পূর্বে তারা বিয়ে করেন। কিন্তু বিবাহিত জয়ের প্রথম স্ত্রীর ঘরে ২ ছেলে ও ১ মেয়ে থাকলেও তিশার কাছে তিনি সে কথা গোপন রাখেন। জয়ের বাড়ি নরসিংদী জেলায়। জয় তিশাকে নিয়ে নারায়নগঞ্জ শহরে ভাড়া বাসায় থাকতেন। 

জয় এবং তিশা ঢাকা শহরে একখণ্ড জমি ক্রয় করেন। জমি ক্রয় করার জন্য তিশা গ্রামের বাড়ি থেকে গরু বিক্রি করে ও কিস্তিতে ঋণ নিয়ে টাকা দেন। এছাড়া স্বামীর ব্যক্তিগত একাউন্টেও টাকা জমা রাখতেন তিশা। 

নাজমা বেগমের ভাষ্যমেত, জয় পুলিশে চাকরি করতেন। তিনি রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ক্যাশিয়ারের দায়িত্বে থাকাবস্থায় সেখানে অর্থ কেলেঙ্কারীর অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। ডিবি অফিসে নিয়ে জয়কে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। জয়ের সঙ্গে তিশাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করে ডিবি পুলিশ। ডিবি পুলিশের কাছে জয় টাকা আত্মসাতের কথা স্বীকার করলেও তিশা তার স্ত্রী নয় বলে জানান। এ নিয়ে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তিশার কাবিনের কাগজ ছিঁড়ে ফেলেন জয়। 

এর কিছুদিন পর তিশার অজান্তে তাদের দুজনের নামে ক্রয় করা জমি বিক্রি করে দেন জয়। জমি বিক্রির টাকা এবং জয়ের একাউন্টে জমা রাখা তিশার টাকাসহ প্রায় ২৫ লাখ টাকা নিয়ে ২০১৭ সালে জয় লাপাত্তা হয়ে যান। আমরা তার সন্ধান করছি কিন্তু খুঁজ পাচ্ছি না। 

জয় সম্পর্কে নাজমা আরো বলেন, সে একটা প্রতারক ও চরিত্রহীন লোক। বিদেশ পাঠানোর নামে বেশ কয়েক বছর পূর্বে প্রতারণার মাধ্যমে সিলেটের এক লোকের কাছ থেকে প্রায় ৮লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় সে। কিন্তু সে লাপাত্তা হওয়ায় তাকে না পেয়ে মধ্যস্থতাকারী এক লোকের নামে মামলা দিলে ওই লোক জেল খাটেন।

হত্যা, লাশ উদ্ধার ও আটক
নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার জুনার আলীর পুত্র সেলিম মিয়া দর্ঘদিন ধরে ওসমানীনগরের তাজপুর এলাকার একটি কলোনীতে ভাড়াটিয়া হিসেবে থেকে রিকসার গ্যারেজের ব্যবসা করতেন। মোবাইলের ফোনের সূত্র ধরে তিশার সঙ্গে সেলিমের পরিচয় হয়। সেলিম তিশাকে প্রলোভন দেখিয়ে ৪ নভেম্বর ওসমানীনগরে নিয়ে আসে। ওই রাতে ৮দিকে সেলিম তিশাকে নিয়ে উপজেলার দয়ামীর ইউনিয়নের খালপাড় গ্রামের দেহ ব্যবসায়ী আব্দুল বারিকের বাড়িতে নিয়ে ওঠে। রাতে সেলিম তিশাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে অনৈতিক কাজে লিপ্ত করার প্রস্তাব দেয়। তিশা তাতে রাজি না হওয়ায় সেলিম ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। রাতে বারিকের সহযোগীতায় স্বাসরোধে তাকে হত্যা করে অন্যান্যদের সহযোগীতায় রাতেই মাটি চাপা দিয়ে লাশ ঘুম কারর চেষ্টা করে। 

৫ নভেম্বর সকালের দিকে সেলিম ও বারিক ওসমানীনগর থানায় ফোন করে জানায় দয়ামীর এলাকায় এক নারীকে হত্যা করে মাটি দিয়ে রাখা হয়েছে। পুলিশ তাদেরকে কৌশলে থানায় নিয়ে তাদের স্বীকারোক্তি মতে দয়ামীর কণাইশাহ্ (র:) মাজারের নিকটবর্তী জমি থেকে মাটি খুঁড়ে লাশ উদ্ধার করে মর্গে প্রেরণ করে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সেলিম ও বারিকসহ ৮ জনকে আটক করে পুলিশ। 

আটককৃতরা আদালতে ন্যাক্কারজনক এই হত্যাকাণ্ডের দ্বায় স্বীকার করে রোমহর্ষক বর্ণনা দেয়। এই ঘটনায় আব্দুল বারিককে প্রধান আসামি করে ৬ নভেম্বর ওসমানীনগর থানার এসআই সাইফুল মোল্লা বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন, মামলা নং- ৩।

পরিচয় শনাক্ত:

হত্যাকারীরা পুলিশের কাছে কিংবা আদালতে তিশার কোনো পরিচয় বলতে পারেনি। তাই ময়না তদন্ত শেষে লাশ উদ্ধারের পরদিন ৬ নভেম্বর) বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।

এদিকে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় তিশার পরনে থাকা প্যান্টের পকেটে মেমোরী কার্ডে একটি মোবাইল নাম্বার পাওয়া যায়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ওসমানীনগর থানার এস আই মুমিনুল ইসলাম ৯ নভেম্বর রাতে ওই নাম্বারে কল দিলে তিশার বড় বোন নাজমা বেগম কলটি রিসিভ করেন। ফোনে কথা বলে নাজমা বেগমের কাছে ছবি পাঠানোর পর তিনি তিশার পরিচয় শনাক্ত করেন। ১০ নভেম্বর রাতে তিশার মা, বাবা, বোন, বোন জামাই এবং ১২ নভেম্বর রাতে পরিবারের ১১ সদস্য দুই দফায় ওসমানীনগর থানায় যান। পুলিশের কাছ থেকে কারা হত্যাকান্ডের বর্ণনা শুনেন। পুলিশের সহযোগীতায় তারা ঘটনাস্থল দেখেন এবং তিশার কবর জিয়ারত করেন। 

ঘাতকদের ফাঁসি দাবি:
ঘাতকদের ফাঁসি দাবি করে তিশার পরিবারের সদস্যরা বলেন, তিশার মতো আর কারো বোন বা মেয়ে যেনো এভাবে নিষ্টুর বলিদানের শিকার না হয়। যে যাবার সে চলে গেছে। আমরা গবির মানুষ আদালতের অনুমতি নিয়ে লাশ উঠিয়ে নেওয়ার সামর্থ আমাদের নেই। আমরা টাকা-পয়সা ধার-কর্য্য করে সিলেটে গিয়েছিলাম। খুনিরা ধরা পড়েছে। তাদের ফাঁসি নিশ্চিত করা হলে তিশার আত্মা শান্তি পাবে। স্বামী জয়ই তিশার জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছিল। তাকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শান্তি দেয়ারও দাবি জানান তারা।

পুলিশের বক্তব্য:
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ওসমানীনগর থানার এস আই মুমিনুল ইসলাম বলেন, তিশার স্বামী পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন বা তিনি পুলিশ বিভাগে কর্মরত ছিলেন এমন কোনো তথ্য আমাদের জানা নেই। তার পরিবারের সদস্যরাও এ ব্যপারে আমাদের কোনো তথ্য দেননি।বিষয়টি কতটুকু সত্য তা আমার জানা নেই। এ সংক্রান্ত প্রমাণাদি যদি তারা আমাদের হাতে দিতে পারে তাহলে বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখবো।

ইত্তেফাক/নূহু