‘খোকন ভাইকে নিয়ে প্রচলিত ঢঙের মৃত্যু সংবাদ লিখতে পারবো না’

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০১৬, ১৩:২০
 
 
দেশের বরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকন আর নেই (ইন্নালিল্লাহি ওয়া .. রাজিউন)। সোমবার ৪ এপ্রিল সকাল সোয়া ৮টায় উত্তরা আধুনিক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে ভুগছিলেন।
শহীদুল ইসলাম খোকন ভাইকে নিয়ে এই প্রচলিত ঢঙের মৃত্যু সংবাদ আমি লিখবো না। লিখতে মন চাইছে না। যার সাথে আমার হাজার স্মৃতির চলাচল, তাকে নিয়ে এরকম মৃত্যুসংবাদ লেখা যায় না! সর্বশেষ তার সাথে কথা বলার দিনও ভাঙা ভাঙা শব্দে মুখ দিয়ে যেটুকু কথা বের হচ্ছিল তিনি বলছিলেন, ‘তানভীর আমি বাঁচতে চাই। আরো কাজ করতে চাই।’ 
নিয়তির কি নিষ্ঠুর হিসেব। সর্বশেষ খোকন ভাই আমার একটি টকশো’তে এসেছিলেন। তখন কেবল তার মটর নিউরন রোগের আক্রমন শুরু। মুখে শব্দের জড়তা! তাকে আমার এক টিভি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রন জানালাম। অনুষ্ঠানের বিষয় ছিলÑ সদ্য প্রয়াত হুমায়ূন ফরিদীর স্মরণে স্মৃতিচারণ। খোকন ভাই ফোনে বললেন, ‘ওকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠানে তো শেষ করা যাবে না।’ অনুষ্ঠানে খোকন ভাইয়ের সাথে আলোচক হিসেবে ছিলেন প্রখ্যাত বাচিক শিল্পী ও পাক্ষিক আনন্দভূবনের সম্পাদক ইকবাল খোরশেদ।  
 
 
আজও নিশ্চয়ই শহীদুল ইসলাম খোকনকে নিয়েও তো একটি অনুষ্ঠানে শেষ করা যাবে না তার সম্পর্কে স্মৃতিচারণ। এদেশে চলচ্চিত্রকার অনেকেই এসেছেন। অনেকে অনেক সাফল্যের পালক গুনেছেন। কিন্তু দেশিয় চলচ্চিত্রে সত্যিকার অর্থেই তারকা তৈরির জাদুকর ছিলেন হাতে গোনা। তার ভেতরে শহীদুল ইসলাম খোকন ছিলেন অন্যতম। হুমায়ুন ফরিদীকে চলচ্চিত্রে অভিষিক্ত করা, চিত্রনায়ক রুবেল, ড্যানি সিডাক, সিমলা থেকে শুরু করে একাধিক সাধারণকে তিনি অসাধারণ বানিয়েছেন। সেলুলয়েডের ছবিতে একমাত্র শহীদুল ইসলাম খোকনেরই সেই দাপট ছিল, যিনি কি-না চলচ্চিত্রে কোনো হিরো হিরোইনের চেয়ে বেশি পারিশ্রমিক নিতেন। একই সাথে চলচ্চিত্র ইতিহাসে সমকালীন পারিশ্রমিকের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকের রেকর্ডও তার। 
অথচ এখনকার চলচ্চিত্রে প্রযোজকদের অসাধু দৌরাত্ম আর নায়ক-নায়িকাদের মিডিয়াবাজিতে খুঁজে পাওয়া যায়না পরিচালকের নাম। ছবিতে মুগ্ধতা পেলে দর্শকেরা হল থেকে বের হয়ে বলেন ‘অমুক নায়কের ছবিটা ভালো লাগলো’। সত্যিকার অর্থের ‘ডিরেক্টরস মিডিয়ার অধিনায়ক ছিলেন তিনি।  চলচ্চিত্রের এই বিষয়গুলোই একেবারে নিখুঁতভাবে বলে গেছেন শহীদুল ইসলাম খোকন। একাধিক ইন্টারভিউতে বারবার বলেছেন সে কথা।
 
 
শহীদুল ইসলাম খোকন বলতেন, ‘যেদিন চলচ্চিত্র নির্মাতা কোনো প্রযোজক বা তার নায়ককে স্যার, হুজুর , বস বা বড় ভাই বলা শুরু করবে সেদিনই বুঝতে হবে ইন্ডাষ্ট্রিতে ধ্বংস শুরু হয়ে গেছে।’
 আজকের চলচ্চিত্রের অবস্থানে শহীদুল ইসলাম খোকনের বলা সেই দশা-ই চলছে চলচ্চিত্র শিল্পে।
ব্যক্তিগতভাবে যেমন খোকন ভাইয়ের কোনো নতুন ছবি হলে মুক্তি পেলেই সাথে সাথে তা দেখার জন্য অস্থির হয়ে যেত আমার বা আমাদের কৈশরকাল। সেই কৈশরে নি¤œবিত্ত থেকে নব্য আধুনিক মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদেরও হলের মোহে ডুবিয়েছেন এই শহীদুল ইসলাম খোকন। 
 
 
খুব করে বারবার আক্ষেপ করে বলতেন, ‘লেখকদের উপন্যাস লেখার সময় কোনো শব্দ হিসেব কষতে হয়না। অথচ আমরা সিনেমা বানালেই সেই আড়াই ঘন্টায় শেষ করতেই হবে। এর ভেতরেই আমকে সব গল্প বলতে হবে। এ বড় অন্যায় হিসেব।’
খোকন ভাই হয়তো এই ডিজিটাল ফর্মেটের উন্মুক্ত চলচ্চিত্রের সময় কাজ করতে পারলেন না, অথচ চলচ্চিত্রের এই ক্রান্তিকালে শহীদুল ইসলাম খোকনের সত্যিকারের দিক নির্দেশনার বড় প্রয়োজন ছিল। 
অসুস্থতার আঘাতে নির্মাতা শহীদুল ইসলাম খোকনের পরিবার সঙ্গীন হয়ে পড়ে। 
 
 
অথচ নানান ঘাত প্রতিঘাতের জীবনে শহীদুল ইসলাম খোকনই বিরল এক নির্মাতা ছিলেন । ভালো ছবি করার নেশায় নিজের বাড়ি বন্ধক, স্ত্রীর গয়না বিক্রি করেছেন তিনি। ঠকেছেন কখনও; আবার অনেক সময় ঠকেও জিতেছেন তিনি। অথচ আজকের নির্মাতারা প্রযোজকের টাকা আদায়ের পরদিনই তার অধিকাংশ ভাগ নিজের মনে করে আগে ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট করে রাখেন, ছবির ভালো মন্দ গোল্লাই যাক, আগে নিজেরটা গুছিয়ে রাখি! ঠিক এই কথাটিও শহীদুল ইসলাম খোকনেরই বলা আমারই অনুষ্ঠানে। 
 
IMG0
আজ থেকে কান্নার রোল বইবে। শোকাতুর লেখার ধারা চলবে কিছুদিন। কিন্তু মটর নিউরনে আক্রান্ত এই মানুষটির পাশে যখন খুব প্রয়োজন ছিল অনেকের, তখন দাঁড়াননি তার তৈরি হিরো বা কাছের মানুষেরাও। আমেরিকার বেলভিউ হাসপাতালে শহীদুল ইসলাম খোকনের চিকিৎসার জন্য প্রানান্ত সহিযোগিতা করেন চিত্রনায়িকা শাবানা। শাবানা বলেছিলেন, ‘খোকন ভাই এমন একজন মানুষ, আমার নিজের কোনো মানসিক বিপর্যয়ের সময় তার কাছ থেকে শক্তি নিতাম। আজ তার এই অবস্থা আমি মেনে নিতে পারি না।’
 
 
সিনিয়র অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে দারুণ এক কথা বলেছিলেন শহীদুল ইসলাম খোকন। খোকন ভাই বলেছিলেন, ‘এই যে সোহেল রানা, ববিতা, ফারুক , শাবানা সুচরিতা ম্যাডামেরা একেবারে ঘরে বসে মিডিয়া থেকে দুরে বসে আছেন, এটা খুবই বোকামী করছেন তারা। মিডিয়ারও উচিত তাদের বারবার সামনে এনে তাদের কথা, সাক্ষাৎকারসহ পুরনো ছবিগুলো প্রদর্শন করা। নয়তো ভুলেই যাবে আগামী প্রজন্ম তাদের নাম। রাস্তায় বেরুলে দুই দিনের নায়িকাকে যখন জাপিয়ে ধরবে তারই সামনে, আর তাদের চিনবেই না! তখন কিন্তু নিজেদেরই খারাপ লাগবে। মিডিয়া ও সিনিয়র তারকা উভয়েরই প্রয়োজন তাদের কালোত্তীর্ন ছবিগুলো রিসাইকেল করা তাদের নিয়েই টিভি স্ক্রীনে। এভাবেই একজন অমিতাভ বা মর্গান ফ্রিম্যানরা আজীবন কয়েক প্রজন্মের কাছে বেঁচে থাকেন। কিন্তু আমাদের কিছু সিনিয়রদের ভেতরে একটা আত্মগরিমা চলে এসেছে যে, কেন আমরা এত সহজেই ক্যামেরার সামনে আসবো?  আপনি আসবেন, কারণ এখন আপনার মুখ দেখানোটা বানিজ্যের অংশ না, আপনার দায়িত্ববোধের অংশ।’
 
IMG1
চলচ্চিত্রের এই ধরণের দর্শন একজনই দিতে পারতেন খুব দারুণ ভাবে- তিনি শহীদুল ইসলাম খোকন। 
আমেরিকায় চিকিৎসা থেকে প্রায় ব্যর্থ এবং এক বুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে। মৃত্যুর জন্য স্টপওয়াচ নিয়ে যখন ফিরলেন তিনি দেশে তখন শহীদুল ইসলাম খোকনের পরিবারে অন্ধকার নেমে আসে এক অকস্মাৎ দারিদ্রের। মিডিয়ার জলজ্বলে স্বার্থপর আলো যে তার কাছে পৌঁছায়নি। ধার দেনা আর নানান সংকটের মুখে সেই পরিবারের কথা ভেবেই প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ তহবিল থেকে শহীদুল ইসলাম খোকনকে অর্থ সহযোগিতা দেয়া হয়। আমাদের সংস্কৃতিমনা প্রধানমন্ত্রী একারণেই বিশেষ, একারণেই তিনি বিশ্ববরেন্য নেত্রী। 
তবে কাকতালীয়, কিংবা নিজের কথা বলার জন্য বলা নয়। আমরা ইত্তেফাকে বারংবার এই গুণী মানুষটির শরীরের আপডেট প্রথম থেকেই ছেপে আসছি, যখন কোনো মিডিয়া-ই তার খোঁজ রাখেননি। একথা তার স্ত্রীও স্বীকার করেন। সেই ইত্তেফাকের একটি খবর নিয়েই পরবর্তীতে ফেসবুকে খোকন ভাইকে নিয়ে একটি ব্যক্তিগত নোট লিখে পোস্ট দিয়েছিলাম আমি। সেই ফেসবুক স্ট্যটাসের পরেই আমাকে ইনবক্স করে শহীদুল ইসলাম খোকনের যোগাযোগ নাম্বার চাইলেন প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন। নির্মাতা শহীদুল ইসলাম খোকনের সেই সঙ্গীন সময়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে সেই অর্থ সাহায্য অনেক খানি অনুপ্রাণিত করেছিল শিল্পী পরিবারকে।
 
IMG2
শহীদুল ইসলাম খোকনকে নিয়ে তাই সাধারণ একটি মৃত্যু সংবাদ লেখা ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য কঠিন। কারণ প্রায় ২০ টিরও বেশি টিভি অনুষ্ঠান আর অগনিত ইন্টারভিউতে খোকন ভাইয়ের কত কথা আমার ভেতরে। সেগুলোই বারবার মনে পড়ে। মনে পড়ে প্রথম জীবনে বিনোদন সাংবাদিকতায় যখন প্রবেশ। তখন তার প্রথম ইন্টারভিউ করতে গিয়ে খোকন ভাই বলেছিলেন, ‘এই যে এখন একটি ছবি নিয়ে আমি কাজ করছি ( ম্যাডাম ফুলি) সেই ছবিতে হিরো কিন্তু আমি নিজেই। কিন্তু সেই গল্প শোনার জন্য কতজন সাংবাদিক নির্মাতাকে ফোকাস করবে বলো? আমাদের মিডিয়াকেও কিছুটা শিখতে হবে , কাকে, কখন কোথায়, কতটুকু ফোকাস করা প্রয়োজন।’
 
 
আমি তখন একেবারে নবীশ। খোকন ভাইয়ের প্রতি এক ধরণের মোহভক্ত হয়েই তার কাছে গিয়েছিলাম। সেই থেকে পরিচয়ের শুরু, আমার দেখা চলচ্চিত্রের অন্যতম দাপুটে ব্যক্তিত্ব। আরও একজন ছিলেন তিনিও আর নেই পৃথিবীতে। চাষী নজরুল ইসলাম। একবার এক অনুষ্ঠানে চাষী ভাই আর খোকন ভাইকে এক ফ্রেমে আলাপ জুড়ানোর কথা বলতেই খোকন ভাই বললেন, ‘তানভীর, তুমি এক বনে দুই সাইজের বাঘকে একসাথে করো না। ওতে তোমার সময়ে কুলাবে না। তুমি আলাদা আলাদা পর্ব করো।’
 
কতশত স্মৃতির উড়াল । সেই দৃপ্ত কন্ঠ যখন মৃদু থেকে নির্বাকের পথে হাঁটতে থাকে তখন তা কি ভীষণ বেদনার। যখন অনেকখানিক জড়ানো কণ্ঠ, তখনও ভাবী (শহীদুল ইসলাম খোকনের স্ত্রী) তার ফোন থেকে আমায় ফোনে বললেন, ‘তানভীর আমি প্রধানমন্ত্রীর এই সাংস্কৃতিমনা উদ্যোগ নিয়ে একটি এডিটরিয়াল লিখতে চাই, তোমাদের সম্পাদকীয় বিভাগ কি ছাপবে? আমি বললাম, আপনি লিখেন আগে। অবশ্যই ছাপবে।’
 খোকন ভাই সেই চলচ্চিত্র বিষয়ক এডিটরিয়াল শেষ করতে পারলেন না। নানান শারীরিক সংকট তাকে যে ধুকে ধুকে মারছিল। মৃত্যু নিশ্চিত সবার জীবনেই। কিন্তু যে মানুষটি এই শহরের উদাম হাওয়ায় গলা উচিয়ে সব সময় সবার আলোচনা বা আড্ডায় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতেই থাকতে ভালোবাসতেন, তাকে এভাবে পৃথিবী অন্তরালের ঘটনার ধারাবাহিক বেদনার্ত সময় ফুরোনো দেখতে হয়। তা বড়ই হাহাকারের। তা দেখতে ইচ্ছে করে না। 
 
IMG3
ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায় থাকেন শহীদুল ইসলাম খোকনের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু পান্না। তিনিও একসময় চলচ্চিত্রের খোকন ভাইকে লগ্নি করেছেন। তার সেই ঘনিষ্ঠ বন্ধু শেষ জীবনের খোকনের হাত ধরেই, পাশে ছিলেন। বারবার খোঁজ খবর দিতেন আমাদের। নিতান্ত কৃতজ্ঞতা জানাতে একদিন ইত্তেফাক বিনোদন বিভাগে এসে বন্ধু খোকনের সাথে তার স্মৃতিপাঠ বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন। সে কী কান্না! অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম আমি অফিসেই। খোকনের বন্ধু পান্না বলতে লাগলেন, ‘জীবনে কারো কাছে লোন করতেন না খোকন। খুব বিপদে পড়লে আমার কাছে বলতেন আমার পরের ছবির ইনভেস্টর হবি। তাইলে কিছু টাকা দে। বুঝে যেতাম, ওর অর্থকষ্ট চলছে। সেই দাপুটে মানুষটিকে এভাবে বাঁচার আকুতি নিয়ে ধুঁকতে হলো। অথচ এই আমি নিজে খোকনের কত শিষ্য অভিনেতা-অভিনেত্রীকে ফোন করেছি সাহায্যের জন্য, কেউ এগিয়ে আসেনি। পরে ইত্তেফাকের রিপোর্টের কল্যানে প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসায় বিষয়টি ফায়সালা হয়। খোকন দুহাত তুলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য দোয়া করেছেন আর কেঁদেছেন। 
 
IMG4
আজ থেকে নির্মাতা শহীদুল ইসলাম খোকনের মৃত্যু পরবর্তী শোকের ধারাবাহিকতায় কতজনের কথাই তো আসবে। হয়তো আমরা মিডিয়া ভুলেই যাবো, নির্মাতার এই প্রকৃত বন্ধুটির কথা। সময় আর মিডিয়ার লাইম লাইট যে বড় নিষ্ঠুর। 
প্রিয় শহীদুল ইসলাম খোকনের রূহের মাগফেরাত কামনা করছি।
 
লেখক : বিভাগীয় সম্পাদক- বিনোদন প্রতিদিন, ভিন্ন চোখে