মুন্সীগঞ্জে ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বাছাইয়ে অনিয়ম ও অর্থের বিনিময়ে প্রার্থী মনোনীত করার অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী লীগের বঞ্চিত প্রার্থীদের অভিযোগ—দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন বিক্রি হয়েছে। এতে যোগ্য ও ত্যাগী নেতারা মনোনয়ন পায়নি। নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে। তৃণমূল ভোটারদের রায়ও কাজে আসেনি। এসব কারণে বেশ কয়েকটি ইউপিতেই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীও হচ্ছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে পাঁচজন বিজয়ী হয়েছেন। আর অযোগ্য প্রার্থীর কারণে দুই ইউপিতে বিএনপি বিজয়ী হয়েছে। জেলার ৬৮টি ইউনিয়নে নির্বাচন হচ্ছে পাঁচ ধাপে। ইতোমধ্যেই প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের সম্পন্ন হয়েছে। তৃতীয় ধাপে লৌহজং উপজেলার ১০টি ইউপিতে ভোট গ্রহণ হবে ২৩ এপ্রিল। এরপর টঙ্গীবাড়ি, সদর উপজেলা ও গজালিয়া উপজেলায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিটি ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ড কমিটি এবং ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে কাউন্সিলর করে ভোটের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই করা হচ্ছে। এ ২৪টি ভোটের মধ্যে যে সম্ভাব্য প্রার্থী বেশি ভোট পাবেন সেই আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হবেন। এতে ভোট কেনা-বেচা শুরু হয়েছে। যে প্রার্থী টাকা দিয়ে কাউন্সিলরদের ভোট কিনতে পারবেন সেই আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হতে পারবেন। এখানে যোগ্যতা ও ত্যাগী নেতাদের কোন বিবেচনা নেই। এমনকি ২০১৫ সালের জেলার শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া আউটশাহী ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. সেকান্দার বেপারীও দলের মনোনয়ন পাননি। যে সম্ভাব্য প্রার্থী টাকা দিয়ে ভোট কিনতে পারবেন না সে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে পারছেন না।
লৌহজং উপজেলার খিদিরপাড়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সভাপতি বর্তমান চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ ও সাবেক চেয়ারম্যান স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা মো. শাহনেওয়াজ মৃধা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ ইউনিয়নের মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক জাতীয় পার্টি নেতা সদ্য আওয়ামী লীগে যোগ দেয়া আনোয়ার হোসেন বেপারী। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন শাহ নেওয়াজ মৃধা। কেন্দ্রীয়ভাবে জেলা, উপজেলা এবং সংশ্লিষ্ট ইউপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এ ছয়জন নিয়ে মনোনয়ন কমিটির কথা রয়েছে। কিন্তু মুন্সীগঞ্জে ঘটেছে এর ব্যত্যয়। এই ছয়জনের সাথে বাড়তি যুক্ত হয়েছে জেলা আওয়ামী লীগের নবাগত যুগ্ম সম্পাদক সোহানা তাহমিনা।
লৌহজং-টেউটিয়া ইউনিয়নে মনোনয়ন প্রত্যাশী ফকির মো.আবু ফয়সাল জানান, প্রার্থী নির্বাচনে ভোট হয়েছে মাত্র ২০ জন ভোটার বা কাউন্সিলের। স্বল্প সংখ্যক ভোটার হওয়ায় এখানে অর্থ, ক্ষমতা আর ভীতি কাজ করেছে। আমার ইউনিয়নের ২০ জন ভোটারের মধ্যে ১৬ জন ভোটারকে আগেরদিন ডেকে নিয়ে প্রতিপক্ষের লোকজন আটকিয়ে রেখেছে। ভোট শুরু হবার ঠিক ১৫ মিনিট আগে তাদেরকে একসাথে ভোট কেন্দ্রে আনা হয়েছে প্রতিপক্ষের লোকজনের পাহারায়। তাদেরকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ভোট আদায় করা হয়েছে। তাছাড়া জেলা কমিটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। জেলা কমিটির ছয় সদস্য এখানে ভোট দিলেও মূলত সদস্য সংখ্যা ছিল ৭ জন। এই কমিটির ভোট গ্রহণে কোন স্বচ্ছতা ছিল না। এমনকি ভোটের জন্য কোনো ব্যালট বাক্সও করা হয়নি। ভোটাররা সাদা কাগজে নাম লিখে দিয়ে তাদের হাতে ব্যালট পেপার তুলে দিয়ে চলে এসেছেন। ভোট গণনা বলতে এখানে কিছু ছিল না। এমন কি কোনো প্রার্থীকেও সেখানে থাকতে দেয়া হয়নি। থাকা তো দূরের কথা, প্রার্থীর সামনে ভোট গণনাও করা হয়নি। কমিটি যার নাম ঘোষণা করেছেন তিনিই প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে যাচ্ছেন। আর এর পেছনে লাখ লাখ টাকার খেলা হয়েছে।
টঙ্গীবাড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. জগলুল হালদার ভুতু বলেন, “আমি প্রথম কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী বর্ধিত সভা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু জেলা কমিটি এর আগেই সিরাজদিখান, শ্রীনগর ও লৌহজংয়ে ইউনিয়ন বর্ধিত সভা ছাড়াই প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। তাই জেলা কমিটি ঐ নিয়মেই টঙ্গীবাড়িতেও ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের নিয়ে ভোটের মাধ্যমে চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মনোনীত করেছে। আমার কোন কথাই রাখেনি। টাকা ও তদবিরের কাছে যোগ্য নেতারা বাদ পড়েছে। যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনে ব্যর্থ হওয়ায় দলের যে ক্ষতি হয়ে গেছে তা ঠিক করতে আরো ১০ বছর লাগবে।
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ শেখ লুত্ফর রহমান বলেন, কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশনা সম্পূর্ণরূপে পালন করতে গেলে জটিলতা আরো বাড়বে। ইউনিয়ন কমিটির বর্ধিত সভা করতে গেলে ইউনিয়ন কমিটির সবাইকে ডাকতে হবে। টাকা লেন-দেনের যে অভিযোগ উঠেছে তা আরো বাড়বে। তাই আমরা দলের তৃণমূল থেকে শুরু করে সকলের সাথে কথা বলে জটিলতা কমানোর জন্য সকলের মতামতের ভিত্তিতে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থীদের নাম প্রস্তাব পাঠাচ্ছি। যাদের নিয়ে কউন্সিলর করছি তারাই সকল কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছে। আর কাঠাদিয়া-শিমুলিয়া ইউনিয়নের ওয়ার্ড কমিটির ৯ জনকে টাকার বিনিময়ে ভোট দেয়ার অভিযোগ ওঠায় শোকজ করা হয়েছে। অন্যান্য অনিয়মের কথা তিনি অস্বীকার করেন।
