কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগ থেকে সোহাগী জাহান তনু হত্যার যে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট দেয়া হয়েছে তা দেখে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন তাহলি কী তনু খুন হননি! ফরেনসিক বিভাগ আগে বলেছে, ধর্ষণ হয়নি, আর এবার বলল খুনই হয়নি! যা ঘটনার সঙ্গে কোনভাবেই মিলছে না। তাদের এই রিপোর্ট দেশবাসীকে বিস্মিত করেছেন, ক্ষুব্ধ করেছে।
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, হয় এখানে কুমিল্লা মেডিক্যালের ফরেনসিক বিভাগের অজ্ঞতা রয়েছে, অথবা জেনে বুঝে তারা কাউকে রক্ষা করতেই এমন রিপোর্ট দিয়েছে। এই যদি হয় তাহলে দ্বিতীয় দফায় ফরেনসিক পরীক্ষা আবার কেন সেখানেই করা হল- এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। এখানে ঢাকা থেকে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গিয়ে, বা লাশটি ঢাকায় পাঠিয়ে ময়না তদন্ত করা যেত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাবেক পরামর্শক ও বর্তমানে ভারত, নেপাল, দক্ষিন কোরিয়া ও সুদানের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক ইত্তেফাককে বলেন, প্রথম যিনি ময়না তদন্ত করেছেন, ডা. শারমীন সুলতানা একজন মেডিক্যাল অফিসার। এখন প্রশ্ন হল- এই বিষয়ে তার যথেষ্ট যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা আছে কি-না? যদি থেকে থাকে তাহলে তিনি সেটা কাজে লাগিয়ে মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন কি-না? এরপরও যদি তিনি কারণ নির্ণয় করতে না পারেন তাহলে মৃতদেহটি দাফন না করে রেখে দেয়া উচিত্ ছিল। একই সঙ্গে এ বিষয়ে যারা সিনিয়র আছেন তাদের নিয়ে বোর্ড গঠন করা উচিত্ ছিল।
যেমন- সব চিকিত্সক ময়নাতদন্ত করতে পারেন না, তেমনি এ বিষয়ে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা না থাকলে তিনি মৃত্যুর কারণ খুঁজে বের করতে পারবেন না। পরে মৃতদেহের দ্বিতীয় দফা ময়না তদন্ত হল। কিন্তু তখন লাশটিতে পচন ধরেছে। কবর থেকে লাশ তুলতে হলে একটা বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। সেখানে চিকিত্সকের উপস্থিতি খুবই জরুরি ছিল এবং তার পরামর্শেই সেটি আলতো করে তুলে আনার কথা। কিন্তু এখানে লাশ ডোমই তুলে এনেছেন। সেখানে চিকিত্সক ছিলেন না। এখানে যথেষ্ট অবহেলা লক্ষ্য করা গেছে। তাছাড়া ময়না তদন্তের রিপোর্টে মৃতদেহের যে আঘাতের কথা বলা হয়েছে, সেটা হত্যার জন্যও যথেষ্ট নয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তনু হত্যার ময়নাতদন্তে চিকিত্সকরা অবহেলাই করে গেছেন। এ কারণে কিভাবে হত্যা হয়েছে সেটা তারা বলতে পারেননি। তাদের দিয়ে দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্ত করা ঠিক হয়নি। আর তারা যদি কোন পক্ষ দ্বারা পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে থাকেন তাহলে তো আরো ঠিক হয়নি। সরকার কেন এই ময়নাতদন্তের সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করল না তা নিয়েই প্রশ্ন সাধারণ মানুষের। শাহবাগের আন্দোলন থেকেও একই দাবি তোলা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, ‘তনু কি তাহলে খুনই হননি! এই ধরনের রিপোর্ট দেয়ার পরও এই চিকিত্সকরা এখনো কিভাবে বহাল থাকেন। এখনি তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের এই কাজ সরকারকেও বেকায়দায় ফেলেছে।’ শিক্ষার্থীরা বলছেন, ‘কাকে বাঁচাতে তাদের এই তত্পরতা সেটাও তদন্ত করে বের করতে হবে।’
তনুর লাশ উদ্ধারের সময় সেখানে উপস্থিত তার বাবাসহ অনেকেই বলেছেন, ‘তনুর জামা ছেঁড়া ছিল। নাকের কাছে রক্ত লেগে ছিল। চোখ ছিল লাল। মাথার পেছনে ছিল আঘাতের চিহ্ন। রাস্তা থেকে তাকে টেনে হিঁচড়ে যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তা ঘটনাস্থল দেখেই বোঝা গেছে। তারপরও চিকিত্সকদের কেন এই খাম-খেয়ালিপনা।’
একজন অপরাধ বিশেষজ্ঞ এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে দেখেই বোঝা যাচ্ছে নাকে-মুখে কিছু চাপা দিয়ে পেছনে শক্ত কিছুর সঙ্গে ধাক্কা দিয়ে তনুকে হত্যা করা হয়েছে। এরপর লাশ সেখানে ফেলে রেখে খুনিরা চলে যায়।’
কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. কামাদা প্রসাদ সাহা গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ইত্তেফাককে বলেন, ‘এইটা নিয়ে (ফরেনসিক রিপোর্ট) গতকালকে (সোমবার) মিডিয়ার সামনে কথা বলার ফলে আই অ্যাম ইন ট্রাবল (আমি সমস্যার মধ্যে আছি)। এ নিয়ে কোনো কথা বলব না। তবে প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন সিআইডি নিয়েছে।’
আমাদের কুমিল্লা প্রতিনিধি লুত্ফর রহমান জানান, তনু হত্যা রহস্য ১৬ দিনেও উদঘাটন হয়নি এবং খুনিদের শনাক্ত বা গ্রেফতার করা যায়নি। দুই দফায় তদন্তকারী কর্মকর্তা-সংস্থা বদল, সিআইডিতে মামলা হস্তান্তরসহ বিভিন্ন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা দৌঁড়ঝাপ করলেও তদন্ত কার্যক্রমে তেমন কোন অগ্রগতি নেই। এদিকে গতকাল বিকালে তনুর লাশের প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন সিআইডি’র নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সিআইডির পরিদর্শক গাজী মো. ইব্রাহিম ডা. কামাদা প্রসাদ সাহার নিকট থেকে প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করেন। ময়নাতদন্তের ওই প্রতিবেদনে তনুকে ধর্ষণের কোন আলামত পাওয়া যায়নি, মৃত্যুর কারণও সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়নি এবং বিষক্রিয়ারও কোন অস্তিত্ব মেলেনি।
হত্যার কারণ উল্লেখ না থাকায় ক্ষোভ ঃ তনুর প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তুলেছেন- ‘তনুকে খুন করা হয়েছে একথা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই, তবে কেন প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে হত্যার কারণও খুঁজে পাওয়া গেল না। তাহলে কী তাকে জ্বীন বা ভুত-পেত্নি মেরে ফেলেছে?।’
নিখোঁজ যুবকের সন্ধান মেলেনি ঃ তনু হত্যাকান্ডের পর ২৮ মার্চ গভীর রাত থেকে নিখোঁজ যুবক জেলার বুড়িচং উপজেলার নারায়ণসার গ্রামের মো. নুরুল ইসলামের ছেলে মিজানুর রহমান সোহাগের সন্ধান গতকাল পর্যন্ত মেলেনি।
তনু হত্যার বিচার দাবি অব্যাহত ঃ তনুর হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কুমিল্লা জেলা শাখার আয়োজনে গতকাল বিকালে মহানগরীর টাউনহলের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২০ মার্চ রাতে কলেজ ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুকে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ বিষয়ে তার পিতা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের কর্মচারী ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে ২১ মার্চ অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে কোতয়ালী মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
