এমপির ভূমিকায় এলাকায় ক্ষোভ

বাঁশখালীতে হরতাল, গ্রেফতার আতঙ্কে গ্রামবাসী

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০১৬, ০১:৩১
বিদ্যুত্ প্রকল্প বিরোধী সমাবেশের জের ধরে পুলিশ-জনতার সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে ৪জন নিহত হওয়ার প্রতিবাদে বাঁশখালীতে বুধবার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়েছে। কোন ধরণের পিকেটিং ছাড়াই শান্তিপূর্ণ ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই হরতাল পালিত হয়। ঘটনাস্থল গন্ডামারা এলাকার দোকান-পাট ঘটনার পর থেকেই বন্ধ রয়েছে। গতকাল থেমে থেমে চলেছে মিছিল আর বিক্ষোভ। এলাকার পরিস্থিতি ছিল থমথমে।
 
এদিকে গত সোমবারের ওই সংঘর্ষের ঘটনায় শুরু থেকেই স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বাঁশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমানের ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গন্ডমারার বাসিন্দারা। তারা বলছেন, হতাহতের ঘটনার পর থেকে আন্দোলন কিংবা নিহতদের দাফনকালেও স্থানীয় এমপি উপস্থিত হননি। এমনকি তার কোন প্রতিনিধিও পাঠাননি। ফলে আগে থেকে জামায়াত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা এই আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর ক্ষোভ বাড়ছে।
 
স্থানীয়রা জানান, শুধু সংসদ সদস্য নন; স্থানীয় উপজেলা আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ নেতাই এই প্রকল্পের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা যদি নিজেদের দলীয় সরকারের কারণে এই অবস্থানে থাকেন তাহলে বিপরীত মেরুর জামায়াত কিংবা বিএনপি নেতারা কেন এই প্রকল্পের পক্ষে অবস্থান করছেন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
 
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এমপি মোস্তাফিজুর রহমান গতকাল সন্ধ্যায় মোবাইলে ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি ঢাকায় ছিলাম। তাই এলাকায় যেতে পারিনি। গতকাল (মঙ্গলবার) রাতে এসেছি। যারা হাসপাতালে আছে তাদের দেখতে গিয়েছিলাম।’ প্রকল্পের সঙ্গে জামায়াত-বিএনপি ও তার সংশ্লিষ্টতার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কাল (বৃহস্পতিবার) সকালে প্রেস কনফারেন্স করবো, সেখানে বিস্তারিত কথা বলবো। এখন আর কিছু বলতে পারবো না।’
 
গতকাল সরেজমিনে গন্ডামারায় গিয়ে দেখা গেছে, হতাহতের ঘটনায় ৩ মামলায় সাড়ে ৬ হাজার মানুষকে আসামি করায় এলাকার লোকজনের মাঝে গ্রেফতার আতংক বিরাজ করছে। পুলিশ ও র্যাবের যৌথ অভিযানের খবর প্রচার হওয়ায় লোকজন আছেন উত্কণ্ঠায়। তবে হতাহতের ঘটনার পর পরই পুলিশ এলাকা ত্যাগ করার পর আর গন্ডামারায় যায়নি। বেলা ১১ টার দিকে এলাকার সব নারী-পুরুষ ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। তারা গন্ডামারা রহমানিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন মাঠে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এসময় আন্দোলনের নেতা লেয়াকত আলীকে জড়িয়ে ধরে অনেক নারী-পুরুষকে হাউমাউ করে কাঁদতে দেখা যায়। এসময় তিনি তাদের সান্ত্বনা দিয়ে জীবনের বিনিময়ে হলেও কয়লা বিদ্যুত্ প্রকল্প ঠেকানোর ঘোষণা দেন।
 
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসাবে পুলিশ গন্ডামারায় যায়নি বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান। তিনি গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, এখন গন্ডামারায় পুলিশ গেলে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হতে পারে। সেখানকার মানুষ আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতে পারে। তাই কৌশলের অংশ হিসাবে পুলিশ গন্ডামারায় যাচ্ছেনা।
 
বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি: দুপুরে তেল গ্যাস রক্ষা জাতীয় কমিটি চট্টগ্রাম শাখার একটি প্রতিনিধি দল গন্ডামারার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা নিহতদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান এবং আহতদের খোঁজ-খবর নেন। এসময় গন্ডামারা হাদিরপাড়া স্কুলমাঠে এক সমাবেশে বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টির চট্টগ্রামের সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য অধ্যাপক আলোক সাহা ও কমরেড অমৃত বড়ুয়া বলেন, পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে গন্ডামারার মানুষ জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন, দেশ, পরিবেশ ও সমাজের স্বার্থে কোন আপস চলেনা। তারা ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করে নিহত এবং আহতদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার পাশাপাশি অবিলম্বে কয়লা বিদ্যুত্ প্রকল্প বাতিলের দাবি জানান।
 
অর্ধশতাধিক নব্য কোটিপতি!:বাঁশখালীতে ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কয়লা বিদ্যুত্ প্রকল্প করতে যাচ্ছে এস আলম গ্রুপ। এই প্রকল্পের পরিবেশ ছাড়পত্র এবং কাজও শুরু হয়নি এখনো। কিন্তু এরই মধ্যে কয়লা প্রকল্পকে পুঁজি করে অর্ধশতাধিক মানুষ পরিণত হয়েছে নব্য কোটিপতিতে। এসব কোটিপতিদের ব্যাপারে দুদুকের তদন্ত এবং হস্তক্ষেপ কামনা করেছে এলাকার মানুষ। তাদের অভিযোগ, জামায়াত-শিবির ও বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতা অস্বাভাবিকভাবে এই প্রকল্পের ফায়দা নিয়ে কোটিপতি বনে গেছেন। এদের অধিকাংশকেই কয়লা প্রকল্পের সমন্বয়কারী নাছির উদ্দিন সরাসরি নগদ টাকা দিয়েছেন। অনেকে আছেন, যারা জায়গা-জমির দালালি করে কোটিপতি হয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন ক্লাব, সংগঠন, সমিতি, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কয়লা প্রকল্পের পক্ষ থেকে কোটি কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। যারাই কয়লা প্রকল্প নিয়ে কথা বলে, টাকার বিনিময়ে বন্ধ করা হয় তাদের মুখ। এত কম সময়ে সাধারণ কিছু মানুষের অসাধারণ হয়ে উঠার এই গল্প সত্যিই বিরল।