দুর্ঘটনার নেপথ্যে ‘এক্সপ্যানশন জয়েন্ট’ তিন বছরে ১০ জন নিহত আহত শতাধিক
মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে রাজধানীর মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার। চালু হওয়ার পর থেকে গত তিন বছরে দুর্ঘটনায় অন্তত ১০ জন মোটরচালক আরোহী নিহত হয়েছে। আর এসব দুর্ঘটনার কারণ ‘এক্সপ্যানশন জয়েন্ট’।
২০১৩ সালের অক্টোবরে চালু হওয়া ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ফ্লাইওভার দিয়ে গুলিস্তান থেকে শনিরআখড়া ও পোস্তগোলা পর্যন্ত যাতায়াত করা যায়। চার লেনের ফ্লাইওভারে উঠতে ছয়টি এবং বের হতে সাতটি পথ রয়েছে। ফ্লাইওভারের কয়েক জায়গায় সড়কের সমান্তরালে কংক্রিটের সংযোগস্থলগুলো মোড়ানো হয়েছে ইস্পাতের পাত দিয়ে, যাকে ‘এক্সপ্যানশন জয়েন্ট’ বলা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই জয়েন্টে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ফাঁক থাকায় তা দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জানা যায়, সুইজারল্যান্ডের ম্যাগেবা নামক একটি প্রতিষ্ঠানের ভারতীয় কারখানা থেকে এই এক্সপ্যানশন জয়েন্টগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনেই তৈরি করা হয়েছে। অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এগুলো বসানো হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক শামসুল হক জানান, সড়ক বা সেতুতে ‘এক্সপ্যানশন জয়েন্ট’ কতটুকু ফাঁক থাকলে যানবাহনের সমস্যা হবে না, তা ঠিক করা আছে। মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের এক্সপ্যানশন জয়েন্টগুলোতে পৌনে এক থেকে এক ইঞ্চির মতো ফাঁক তৈরি হয়েছে। এটি নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন এই বিশেষজ্ঞ।
মোটরসাইকেলের তুলনামূলক সরু চাকা লম্বালম্বিভাবে ওই ফাঁকে পড়লে চালক নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন। বাহনের গতি বেশি থাকলে ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী এসব দুর্ঘটনায় অন্তত দশজন নিহত হয়েছেন, আহতের সংখ্যা শতাধিক।
গত ডিসেম্বর মাসে এ রকম এক দুর্ঘটনায় আহত হন সোহেল রানা নামে একজন ব্যবসায়ী। তিনি জানান, ‘ফ্লাইওভারে ওঠার পর সরু ফাঁকে মোটরসাইকেলের চাকা পড়ল, আমি নিয়ন্ত্রণ হারালাম। ভাগ্য ভালো যে শুধু আহত হয়েছি। পেছনে কোনো গাড়ি থাকলে নিশ্চিত মৃত্যু হতো।’
একই অভিজ্ঞতা হয়েছে মিরপুরের বাসিন্দা আবেদ আলীর। তিনি বলেন, ‘সেখানে গিয়ে হঠাত্ মনে হলো বালুতে যেমন পিছলে যায়, চাকাটা সেরকমই পিছলালো। আমি কোনো রকমে গাড়ি খাড়া করে দেখি দুই জোড়ার চিপার মাঝে চাকা আটকেছে।’
আবদুল্লাহ নামের কাঁটাবনের একজন মেকানিক জানান, এই ফ্লাইওভারে দুর্ঘটনায় পড়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত মোটরসাইকেল নিয়ে অনেকেই তার দোকানে এসেছে। এরকম অন্তত পাঁচটা মোটরসাইকেল তিনি মেরামত করেছেন।
গত ১৭ ডিসেম্বর রাতে ফ্লাইওভার পার হওয়ার সময় চাকা পিছলে পড়ে যান মনিরুল ইসলাম জুয়েল। সঙ্গে ছিলেন দুই বন্ধু কামাল ও সোহেল। তাদেরকে পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকজন হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিত্সকরা মনিরুল ইসলাম জুয়েলকে মৃত ঘোষণা করেন।
গত ৩১ আগস্ট রাতে মোটরসাইকেলে ফ্লাইওভার পার হওয়ার সময় চাকা পিছলে গেলে পেছন থেকে আসা বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ যায় জহিরুল ইসলাম (৪০) ও আমজাদ হোসেন পাশার (৪২)।
ওয়ারী থানার এক কর্মকর্তা বলেন, দুই জয়েন্টের মাঝখানে লোহার মতো কিছু একটা দেয়া আছে। স্পিড বেশি থাকলে বা বৃষ্টি হলে অনেক সময় পিছলে যায়। জহিরুল ও আমজাদের মৃত্যু এভাবেই হয়েছে বলে আমাদের ধারণা।
এর আগে ২০১৪ সালের ২৪ জুলাই একইভাবে মৃত্যু হয় মুজিবুর রহমান নামে আরেক মোটরসাইকেল আরোহীর। ৭ জুন নিহত হন দুই সহোদর নজরুল ইসলাম (৩৫) ও মেহেদী হাসান (২৮)। ২০১৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি শামীম রেজা নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী একইভাবে মারা যান। দ্রুতবেগে ফ্লাইওভার অতিক্রমের সময় পিছলে পড়ে একই বছরের ২ নভেম্বর জ্যাকি হোসেন নামে এক স্কুলছাত্র নিহত হয়।
বাংলাদেশ সড়ক যোগাযোগ কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিবন্ধন নিয়ে ঢাকার রাস্তায় চলাচল করছে ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭টি মোটরসাইকেল। পরিসংখ্যানের বাইরেও পর্যাপ্ত মোটরসাইকেল চলাচল করছে জানিয়ে মেয়র হানিফ উড়াল সড়কে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ‘এক্সপ্যানশন জয়েন্ট’ মেরামতের উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সঙ্গে চালকদের আগে থেকে সচেতন করতে ফ্লাইওভারে বার্তা রাখারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
তবে ফ্লাইওভারে দুর্ঘটনার জন্য ‘এক্সপ্যানশন জয়েন্ট’ নয়, মোটরসাইকেলের অতিরিক্ত গতিকে দায়ী করেছেন হানিফ ফ্লাইওভার প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এক্সপ্যানশন জয়েন্ট তৈরিতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, সঠিক মাপ, মাত্রা এবং সকল ধরনের নিয়ম কোড নিশ্চিত করা হয়েছে। তাই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার কারণ কোনোভাবেই ‘এক্সপ্যানশন জয়েন্ট’ নয়। এটির মূল কারণ মোটরসাইকেলের অতিরিক্ত গতি। বেঁধে দেয়া গতি না মেনে প্রতিযোগিতামূলকভাবে চালানো এবং ওভারটেকিং দুর্ঘটনার মূল কারণ।
