ব্যাপক উত্সাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হলো জাতীয় পার্টি-জেপি’র ত্রি-বার্ষিক জাতীয় কাউন্সিল। গতকাল শনিবার রাজধানীর রমনায় ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই কাউন্সিলের উদ্বোধনী পর্বে সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় পার্টি-জেপি চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কখনও পরাজিত হতে পারে না। ন্যায়-আদর্শের পথে থেকে মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইও কখনও বিফলে যায় না। কিন্তু গণতন্ত্রের পথ রক্তাক্ত ও বাধাগ্রস্ত হলে স্বৈরতন্ত্রের রাস্তা সুগম হয়। গণতন্ত্রের পথ হয়তো ঝুঁকিতে, তাই বলে আমরা চাই না স্বৈরতন্ত্র আসুক। কিন্তু সীমা লঙ্ঘন করলে এবং সুশীল সমাজসহ দেশের মানুষের কাছে সেটি অসহনীয় হয়ে উঠলে এর পথ সুগম হয়।
জেপি চেয়ারম্যান বলেন, জেপি সবসময়ই নির্বাচনের পক্ষের শক্তি। তাই যখনই নির্বাচন হয়, জেপি এর পক্ষে থাকে। তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে না পারলে সমাজে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। গণতন্ত্রের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ যারা বাধাগ্রস্ত করে, ইতিহাসই এর প্রতিশোধ নিয়ে নেয়। ঢাকায় কিছু লোক দেশের ১৭ কোটি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করবে, সেইদিন আর নেই। সামন্তবাদী সমাজও নেই। এই দেশে গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খেয়েছে। কিন্তু যারা গণতন্ত্রকে নস্যাত্ করতে চান, যারা মনে করেন গণতন্ত্র আছাড় খেলে তাদের স্বার্থ রক্ষা হবে— সেটিও সম্ভব হবে না। যারা গণতন্ত্রের লেবাস পরেন, যাদের গণতন্ত্রের লেবাসের ভেতরে স্বৈরতন্ত্র লুকায়িত থাকে তারাই আসলে স্বৈরতন্ত্রের পথ সুগম করেন।
ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের প্রসঙ্গ ইঙ্গিত করে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, দেশে নির্বাচন হবে। কেউ কাউকে জোর করে নির্বাচনে আনতে পারে না। এরপরেও যারা নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করেন, নির্বাচনের মাঠ রক্তাক্ত করেন, যারা হুমকি-ধামকি দিয়ে সবকিছু করতে চান, তারা আহম্মকের স্বর্গে বাস করছেন। তবে একদিন তাদেরও বিচার হবে।
জাতীয় পার্টি-জেপির জন্মকথা তুলে ধরে দলটির প্রধান বলেন, ১৮ বছর আগে যখন জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরে মতবিরোধ দেখা দেয়, তখন অনেকেই বলেছিলেন-মূলধারার বিরুদ্ধে গিয়ে কেউ টিকে থাকতে পারে না। কিন্তু এই ১৮ বছরে জেপি প্রমাণ করেছে— আদর্শ, নীতি ও লক্ষ্য ঠিক থাকলে কেউ বিলীন হতে পারে না। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টিতে সেদিন হালুয়া-রুটির ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ ছিল না। দল আমাদের যে দায়িত্ব দিয়েছিল আমরা সেটি সততা, নিষ্ঠা ও ইমানের সঙ্গে পালন করেছি। ’৯৬ সালে সরকার গঠনে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেয়ার তিন বছর পর যখন বলা হলো যে, আমরা বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে সংসদ বয়কট করব। তখন আমাদের বক্তব্য ছিল— আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেয়ার যেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, সেটি হয় প্রেসিডিয়ামে অথবা দলের পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠকে পরিবর্তন করা যেতে পারে। যখন এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া মানা হল না, তখনই আমরা বেরিয়ে এসেছিলাম। ১৮ বছর আমরা টিকে আছি। আমাদের লক্ষ্য, আদর্শ দিন দিন সমাদৃত ও সমর্থিত হচ্ছে। সংগঠনেরও ব্যাপ্তি ঘটছে।
দেশের দুর্যোগময় মুহূর্তে জেপি নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল: শাজাহান খান
জেপি’র কাউন্সিলে অতিথির বক্তব্যে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, পাকিস্তান বাংলাদেশের মহাশত্রু। এখনও পাকিস্তান ষড়যন্ত্র করছে। যে কারণে কাদের মোল্লাসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়ার পর পাকিস্তান নিন্দা জানায়। আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি, ১৯৫ জন পাকিস্তানি সেনার যুদ্ধাপরাধের বিচার চাই। আমরা ইতোমধ্যে ১৯১ জন সেনার নাম পেয়েছি। পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের এখনও ৩৫ হাজার কোটি টাকা পাওনা। অথচ একাত্তরের জন্য পাকিস্তান এখনও ক্ষমা চায়নি। পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে পাপমুক্ত করতে হবে। যারা শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে তাদের নেত্রী হচ্ছেন ‘ঘষেটি বেগম খালেদা জিয়া’।
আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, দেশের দুর্যোগময় মুহূর্তে জেপি সেদিন (২০১৩ সালে) শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পাশে দাঁড়িয়েছিল। দেশ যখন দ্বিধাবিভক্ত, একদিকে যখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, আরেকদিকে যখন বিরোধী শক্তি পেট্রোলবোমায় মানুষ পুড়িয়ে মারছিল, দেশকে জঙ্গিবাদ ও উগ্র সাম্প্রদায়িকতার দিকে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র চলছিল— ঠিক তখন জেপি নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির পাশে দাঁড়িয়েছিল।
লুটপাট করে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হওয়া যায় না: দিলীপ বড়ুয়া
অতিথির বক্তব্যে সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া বলেন, বিএনপির আমলে দেশ পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। এখনও গ্রাম থেকে শহরে, শহর থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সর্বত্র দুর্নীতি সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে। দুর্নীতির মহোত্সব ও অরাজকতা চলছে। এভাবে লুটপাট করে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হওয়া যায় না। ইউপি নির্বাচনে যে খুনাখুনি চলছে, সেটি দিয়ে গণতন্ত্র হয় না। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ঘুষ দিয়ে যদি বিচার কেনা যায়, তাহলে গণতন্ত্র হয় না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিএনপি যদি রাজনীতি করতে চায়, করতে পারবে। কিন্তু পাকিস্তানের ভাবাদর্শে থাকলে বিএনপির রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
দিলীপ বড়ুয়া আরো বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে যদি রাষ্ট্রক্ষমতা সুসংহত না হয়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি সমাজকে গ্রাস করে। মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ও যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম, সেটিকে ত্বরান্বিত করতে হলে গণতন্ত্রকে ঋষ্টপুষ্ট করতে হবে। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারলেই আমরা জঙ্গিবাদ থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারব।
১৪ দলকে চোখের মণির মত রক্ষা করতে হবে: শিরীন আখতার
অতিথির বক্তব্যে জাসদের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার বলেন, বর্তমানে আমরা একটা যুদ্ধের পরিস্থিতিতে আছি। দু’দিন আগে একজন ব্লগার খুন হলেন। মুক্তচিন্তা ও মুক্তবিবেক নিশ্চিত করতে না পারলে গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তিকে দৃঢ় ঐক্যে থাকতে হবে। ১৪ দলকে চোখের মণির মত রক্ষা করতে হবে। একইসঙ্গে দুর্নীতি, দুঃশাসকেও রুখে দাঁড়াতে হবে।
১৪ দল শরিক গণআজাদী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস কে সিকদার বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতায় দৈনিক ইত্তেফাকের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ১৪ দলের আরেক শরিক গণতান্ত্রিক পার্টির সাধারণ সম্পাদক ড. শাহাদাত হোসেন বলেন, দেশে মৌলবাদী শক্তি দানবের আকারে দাঁড়িয়েছে। এই দানবের পেছনে কারা?
অগ্রগতির পথে বড় বাধা দুর্নীতি: শেখ শহীদ
কাউন্সিলের উদ্বোধনী পর্বে জেপি মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, দেশ-জাতির এক ক্রান্তিকাল ও যুগ-সন্ধিক্ষণে এই কাউন্সিল হচ্ছে। যখন দেশে সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ধারা রয়েছে, বিপরীতে জঙ্গিবাদের ধারাও রয়েছে। একদিকে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হচ্ছে, অন্যদিকে ধনী-গরিবের বৈষম্য বাড়ছে। বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার অপেচষ্টাও আছে। এত বৈপরীত্য সত্ত্বেও দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, জিডিপি ৭ শতাংশের উপরে গেছে।
শোক প্রস্তাব গ্রহণ
দলের অতিরিক্ত মহাসচিব সাদেক সিদ্দিকী কাউন্সিল অনুষ্ঠান পরিচালনা ও শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন। যাদের সম্মানে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়, তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় মোনাজাত পরিচালনা করেন জেপি মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম। সাদেক সিদ্দিকী তার বক্তব্যে বলেন, দেশে গণতান্ত্রিক ধারা ছাড়া সুশাসন, জবাবদিহিতা কোনোটিই নিশ্চিত হবে না। আর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, একইসঙ্গে থমকে যাবে সকল অগ্রগতি। কাউন্সিলে কয়েকজন কূটনীতিকও উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলনে কাউন্সিলের উদ্বোধন
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে কাউন্সিলের উদ্বোধন করেন জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম। এসময় তারা বেলুন ওড়ান। কাউন্সিল উপলক্ষে পুরো আইইবি প্রাঙ্গণে ছিল সারাদেশ থেকে আসা দলীয় কাউন্সিলর ও নেতাকর্মী-সমর্থকদের ভিড়ে মুখর। ব্যানার, ফেস্টুন নিয়ে নেতাকর্মীরা কাউন্সিলে যোগ দেন। কাউন্সিলকে ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে বিপুল উত্সাহ-উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়।
