জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে মুজিবনগর গণকর্মচারীদের ফাইল গায়েব হয়ে গেছে। ফাইল অনুসন্ধানে তাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত অগ্রগতি নিয়ে আজ মঙ্গলবার মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সভায় আলোচনার কথা আছে।
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে অপারগতা প্রকাশ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারে যোগ দেয়া এসব কর্মচারী নিয়ে বেশ বিতর্ক রয়েছে। ৯ থেকে ১৩ বছর বয়স অবধি নাবালক কিংবা বালক, কিশোর কিংবা কিশোরী, যুবক বা যুবতি বিভিন্ন বয়সের অনেকে মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসাবে পরবর্তীতে নিয়মিত কর্মচারী হিসাবে চাকরিতে প্রবেশ করেন। অনেকে জ্যেষ্ঠতার বিশেষ সুবিধাও গ্রহণ করেন। যদিও চাকরিতে যোগ দেয়ার বা নিয়োগ পত্রে যথেষ্ট ত্রুটি রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। অনেকের ক্ষেত্রে বলা হয়, কেউ মুক্তিযোদ্ধাদের পানি সরবরাহ করেছিল, কেউ অস্ত্র বহন করেছিল, কেউবা সরাসরি বন্দুক নিয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। মুজিবনগর সরকারে থাকা দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আবার সেটি সত্যায়িতও করেছিলেন। আবার অনেকের সত্যায়িত সনদ না থাকলেও তারা মুজিবনগর কর্মচারী বনে গিয়েছিলেন। ৪৪ বছর চাকরির পর ২০১১ সালে প্রথম ঘটনাটি চোখে পড়ে আইন মন্ত্রণালয়ের। আইন মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি তথ্য-উপাত্ত যাচাই বাছাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শুনানি গ্রহণ করেন। এই তদন্তে প্রমাণিত অন্তত ৫০ জন মুজিবনগর ভুয়া কর্মচারীকে বরখাস্ত করা হয়। আইন মন্ত্রণালয় ২০১১ সালে মুজিবনগর কর্মচারীদের একটি সমন্বিত তালিকা করে পুরো বিষয়টি যাচাই বাছাই করার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনাও দিয়েছিল।
সূত্র জানায়, ওই নির্দেশনার আলোকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় মুজিবনগর গণকর্মচারীদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কাজ শুরুও করেছিল। কিন্তু গণকর্মচারীদের তথ্য-উপাত্ত যেখানে সংরক্ষিত থাকার কথা সেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে তা নেই। যদিও ইতিপূর্বে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি শাখা থেকে ২০১১ সালে বেশকিছু কর্মচারীর তথ্য আইন মন্ত্রণালয়কে সরবরাহ করা হয়েছিল।
সচিবালয়ে একাধিক মন্ত্রণালয় ও বিভাগে খোঁজ খবর করা হয়। কিন্তু কোথাও কেউ জানেন না যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কতজন মুজিবনগর গণকর্মচারী চাকরিতে আছেন বা চাকরি থেকে অবসরে গেছেন। ফলে অবসর সুবিধাসহ অন্যান্য সুবিধা প্রাপ্তি বা দেয়ার ক্ষেত্রেও বেশ সমস্যা তৈরি হচ্ছে। যারা চাকরিতে আছেন তারা কীভাবে কতদিন থাকবেন সেটিও নির্ণয় করা কঠিন যদি ফাইল পাওয়া না যায়।
এদিকে সচিবালয় সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিখোঁজ হওয়ার অনেক নজির রয়েছে। খোদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও ইতিপূর্বে গুরুত্বপূর্ণ নথি নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল। অন্যান্য একাধিক মন্ত্রণালয়েও এমন ঘটনা ঘটে। কিন্তু এর কোনো কুলকিনারা হয়েছে এমন তথ্য পরে আর পাওয়া যায় না। যদিও অভ্যন্তরীণভাবে প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। তদন্তও হয়তো হয়। কিন্তু নথির অবস্থান পাওয়া যায় কি না সেটি অজানাই থেকে যায়।
সূত্র বলছে, এসব নথি গায়েব করার নেপথ্যে খোদ শাখার কিছু অসাধু কর্মচারীর হাত থাকতে পারে। ইতিপূর্বে দেখা গেছে, সচিবালয়ে অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্রের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ নথি পাচারের সময়ে পুলিশের হাতে কেউ কেউ ধরাও পড়েছেন। কিন্তু তাদের শাস্তির তেমন খবর পাওয়া যায় না।
প্রসঙ্গত স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত গণকর্মচারীদের কোনো সমন্বিত তালিকা সংরক্ষণ করা হয়নি। এবার অবশ্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রণালয় ভিত্তিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ডাটা বেজ তৈরির কাজে হাত দেয়া হয়েছে।
