প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমেরিকাই সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ করে হত্যার ষড়যন্ত্রকারীদের ধরেছে, বিচার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তেই সেটা ধরা পড়েছে। সেখানে যাদের সাজা হয়েছে, আদালতে তাদের বয়ান থেকেই এসেছে শফিক রেহমান ও মাহমুদুর রহমানের নাম। এটা আমাদের করা না, আমেরিকার কোর্টে প্রমাণিত।
গতকাল সোমবার বিকালে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তৃতায় সাংবাদিক শফিক রেহমানকে গ্রেফতার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, অপরাধীকে গ্রেফতার করলেও এখন অপরাধ হয়! যদি অপরাধীকে গ্রেফতার করলেই অপরাধ হয়, তাহলে এদেশে কী করে বিচার হবে? তাহলে দেশে কোন হত্যার বিচার কী করে হবে? তারা শুধু সাংবাদিক দেখলো, দেখলো না অপরাধী। ষড়যন্ত্রও হচ্ছে আমাদের বিরুদ্ধে, আর সমালোচনারও শিকার আমরা। সবার মানবাধিকার আছে, আমাদের কী কোন মানবাধিকার নেই? ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পর যারা মানবাধিকারের কথা বলেন, তাদেরই লজ্জা হওয়া উচিত। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা ষড়যন্ত্রকারী তাদের জন্য এতো মায়া কান্না, আর যারা ভিকটিম তাদের কী কোনো অধিকার নেই? যারা এত বড় ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত, তাদের গ্রেফতার করা হলেই এতো নিন্দা, অথচ ষড়যন্ত্র যে করলো তাকে নিন্দা করেননি- এটা কোন ধরনের সাংবাদিকতা? যারা ষড়যন্ত্র করে, যাদের নাম বিদেশের কোর্টে উঠে এসেছে- তাদের পক্ষে যারা কথা বলে সত্যিকার অর্থে তাদেরই লজ্জা হওয়া উচিত।
জয়কে অপহরণ করে হত্যার চেষ্টার ঘটনা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, যারা ষড়যন্ত্র-চক্রান্তকারী, যারা এতিমের টাকা মেরে খায়, মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করে, তাদের বিচার বাংলাদেশের মাটিতে হবেই। শত কথা বলেও এ বিচার বন্ধ করা যাবে না। আমরা যেখানে অন্যায় দেখি, সেখানেই তার প্রতিকার করি, ব্যবস্থা নেই। আমরা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেই না, ভবিষ্যতেও দেব না। ন্যায়-নীতি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবো এবং সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেই আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। দেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। কোন অপশক্তিই দেশের এই অগ্রযাত্রাকে রূখতে পারবে না ইনশাল্লাহ।
শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এলে তাদের মূল লক্ষ্য থাকে অর্থ লোপাট করা। আর সেই অর্থ তাদের এত পরিমাণে রয়েছে যে, তা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআইকে ঘুষ দিয়ে ভাড়া করে ফেলেছে। কী কারণে জয়কে অপহরণ করে হত্যা করার চেষ্টা হয়েছে? সেই ষড়যন্ত্রে তারা জড়িত (শফিক রেহমান), এটাও কিন্তু ধরা পড়েছে আমেরিকায়। তিনি বলেন, একজন সাংবাদিককে দেখবে, তার অপরাধটা দেখবে না? আর এটা আমাদের দেশে হয়নি, আমেরিকায় হয়েছে, তাদের দেশ ও কোর্টে হয়েছে। তাহলে তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া করলেই হয়। যারা ষড়যন্ত্র করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার প্রশ্ন জাগে, যখন আমার বাবা-মা ছোট্ট ভাইকে হত্যা করা হয়েছিল, তখন ইন্ডেমনিটি দেয়া হয়েছিল হত্যাকারীদের বিচার করা যাবে না। তার মানে আমাদের কেউ মারা গেলে, কেউ আঘাতপ্রাপ্ত হলে বিচার চাওয়া যাবে না। আমাদের কী বাঁচার অধিকার নেই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতিসহ সবক্ষেত্রে বিষ্ময়কর অগ্রযাত্রা সম্পর্কে অবাক হন। বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোলমডেল স্বীকৃতি দেন। এটি আসলে সম্ভব হয়েছে স্বাধীনতার নেতৃত্ব দেয়া দল ক্ষমতায় আছে বলেই। বিএনপি-জামায়াত জোটের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা ক্ষমতায় থাকলে দেশ সবদিক থেকে পিছিয়ে যায়। নিজেরা দুর্নীতি, দুঃশাসন চালায়, বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করে। বিএনপি নেত্রীর পুত্রদের বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের ঘটনা আমেরিকার ফেডারেল কোর্ট ও সিঙ্গাপুরের আদালতেই প্রমাণিত হয়েছে। আমেরিকা থেকে এফবিআই এসে আমাদের আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন।
প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের সফলতা তুলে ধরে বলেন, এখন বিদ্যুতের কোন সমস্যা নেই। এ কারণে অনেকেই ঘরের মধ্যে এসি চালিয়ে বলেন যে গ্রামে উন্নতি হয়নি। আমি তাদের প্রতি অনুরোধ করবো- ঘরে বসে না লিখে গ্রামে গিয়ে ঘুরে দেখুন। আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করি। তার স্বপ্নই ছিল দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, আমরা সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি।
যারা আজ মানবাধিকার লংঘনের কথা বলে, তারা কীভাবে মানবাধিকার লংঘনকারীদের সঙ্গে বসে, কথা বলে? এমন প্রশ্ন তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের কাছে বসলেই তো তাদের গায়ে পোড়া মানুষের গন্ধ পাওয়া যাবে। এই বিএনপি-জামায়াত জোট নির্বাচন বানচাল এবং আন্দোলনের নামে তিনটি বছর শত শত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে, সারাদেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। নারী-শিশু-অন্তঃসত্ত্বা মহিলা কেউই তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। কী জঘন্য ও ভয়াবহ কর্মকাণ্ড তারা ঘটিয়েছে। এরপরেও কীভাবে এরা (বিএনপি-জামায়াত) মানুষের সমর্থন পায় ভাবতেও অবাক লাগে। তিনি বলেন, মুক্তিচিন্তার নামে ধর্মকে আঘাত করে নোংরা ভাষা প্রয়োগ কোন ধরনের কাজ? মুক্ত চিন্তার অর্থ কী? মুক্তি চিন্তার মানে যদি নোংরা চিন্তা, বিকৃত মানসিকতা বা নোংরা-জঘন্য ভাষা লেখা হয়- সেটা কখনোই মুক্ত চিন্তা হতে পারে না। কেউ যদি ধর্ম না মানে তার বিচারও আল্লাহ করবে। কিন্তু তাদের হত্যা বা বিচার করার দায়িত্বও আল্লাহ কাউকে দেয়নি।
বক্তব্যের শুরুতে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুজিবনগর সরকারের তাত্পর্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা অর্জনে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। মুজিবনগর সরকার এক দিনের নয়, ২৩ বছরের আন্দোলন সংগ্রামের ফসল যার পরিণতি পেতে শুরু করে ১৯৭১ সালের শুরু থেকেই। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হলেও তার ৭ই মার্চের ভাষণের ওপর ভিত্তি করে এবং তার পূর্বপরিকল্পনা ও নির্দেশনা মতো ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত ও ১৭ এপ্রিল শপথ নেয়।
আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাহারা খাতুন, দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য সুজিত রায় নন্দী, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি একেএম রহমতউল্লাহ এমপি, সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসনাত, সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ প্রমুখ।
