অনবদ্য প্রত্যাবর্তনে আর্কের হাসান

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৬, ১৯:৩৮
 
 
হাসানের সঙ্গীত জীবন শুরু হয়  প্রখ্যাত কম্পোজার আশিকুজ্জামান টুলু’র হাত ধরে। লালমাটিয়ার খুব রক্ষণশীল পরিবারের ছেলে হয়ে গান বাজনায় নিজের ক্যারিয়ার গড়বে, সে কথা কোনোদিন ভাবেননি তিনি। আর সেই বাড়ির ছেলে দেশের সেরা রকস্টার হবে, এটা তো ভাবনারও বাইরে ছিল। কিন্তু নিয়তি আর আল্লাহ প্রদত্ত অসাধারণ ব্যতিক্রমি কণ্ঠ যে সারা দেশ মাতাতেই জন্মেছে, সে যে তার কপালেই লিখে পাঠিয়েছেন অদৃষ্ট।
গত ১৯ এপ্রিল ছিল হাসানের জন্মদিন। একেবারেই ঘরের কিছু আত্মীয় আর প্রিয় বন্ধুদের নিয়ে ধানমন্ডির এক রেস্টুরেন্টে দেশের এই জনপ্রিয় রকস্টার হাসানের জন্মদিনের অনুষ্ঠান হলো। মঞ্চের এক কোনায় চুপটি করে বসে আছেন তিনি।
 প্রশ্ন করতেই হাসান বললেন, ‘এরকম ভাবে আমি আসলে নিজের জন্মদিনে আমি অভ্যস্থ নই! কিন্তু এবারে বন্ধু-বান্ধবরাই একটু রিইউনিয়ন করতে চাইলো। তাই কৃতজ্ঞতা টিংকু , জিমি, শাহীন সহ আমাকে কামব্যাক করানোর এই তাগিদারদের।’
 
IMG0
তার মানে রকস্টার হাসান আবারও আসছেন তার নিজস্ব ঢঙে! রেস্টুরেন্টের ছোট্ট মঞ্চে তখন মিন্টু নামে আর্কের নতুন সদস্য গিটারিস্ট হাসানের বিখ্যাত গানগুলি গেয়ে শোনাচ্ছেন, তার দারুণ কণ্ঠ আর গিটার প্লাকিং এ। মিন্টুর অ্যাকুস্ট্যিক গিটার আর আর্কের অন্যতম সদস্য টিংকু আজিজুর রহমানের অসাধারণ সিকোয়েন্সে দারুণ এক সঙ্গীত আবহ তৈরি হলো সেই জন্মদিনের আসরে। নির্ধারিত কেক আসতে অনেকখানি দেরি বলে গান চলছে মঞ্চে।
নিজের এই কামব্যাক প্রসঙ্গে হাসান তার একমাত্র কন্যা নুরজাহানকে কোলে নিয়ে বললেন, ‘আমি খুব খামখোয়লি ছিলাম এটা ঠিক, কিন্তু কখনও গানের সাথে প্রতারণা করিনি। এমন কোনো বাজে গান করিণি যা শ্রোতাদের আঘাত দেয়। কোনোদিন কেউ বলবেনা আমার বেসুরো গান গেয়েছি একচুল! হ্যা, নানান কারণে আমি বিচ্ছিন্ন ছিলাম এই সো - কলড মিডিয়ার কাছ থেকে। কিন্তু খুব ঘনিষ্ঠ যেমন তুমি বা আমার মিউজিশিয়ানদের সাথে যোগাযোগ ঠিক ঠাক চলছিল সবসময়। আসলে আর্ক টা এতবার ভাঙলো, এই ভাঙাভাঙির জন্য মনটা ভেঙে গেল।’
 
IMG1
কিন্তু হাসান আপনার কি মনে হয় না? এই যে এত দারুণ সব লিরিক-সুর আপনার করা। সেই গানগুলো আপনার কণ্ঠে শ্রোতারা মিস করছে খুব। আপনি ওদের ঠকাচ্ছেন?
— হ্যা; তা তো মনে হয়ই। ওদের ঠকাচ্ছি তো বটেই। সাথে নিজেও যে ঠকছি প্রতিনিয়ত। আসলে জেমস ভাই , বা বাচ্চু ভাই তারা নিজেরা মিউজিশিয়ান , কম্পোজার। তাদের সেই শক্তিটা নিজেদের কন্ট্রোলে। সেটা আমি পাইনি। এখন যেমন দেশের সবচেয়ে মেধাবী মিউজিশিয়ান টিংকু -জিমি ওরা আমার দায়িত্ব নিয়েছে। আমরা নিয়মিত এখন প্র্যাকটিস চালাচ্ছি। নিয়মিতভাবে চলছে সেই আড্ডাবাজি, যেটা ছাড়া কখনও গান হয় না। তাই দারুণ কিছু ঘটতে যাচ্ছে সামনে, ইনশা আল্লাহ।’
             মঞ্চের কোনায় এক ক্ষুদে তরুনকে ডেকে হাসান পরিচয় করিয়ে দিলেন তার গুরুর ছেলে হিসেবে। অর্থাত্ ছেলেটি আশিকুজ্জামান টুলু’র বড় ছেলে। কানাডা প্রবাসী ছেলেটি গানের টানে দেশে এসেই হাসান আংকেলকে শুভেচ্ছা জানাতে ছুটে এসেছেন। মঞ্চে উঠেই দুটি গান শুনিয়ে বললেন, ‘আমার বাবা ছিলেন আপনার গুরু আর আমার গুরু হলেন আপনি।’
IMG2
 
            হাসানের জন্মদিনের মঞ্চটি এমনই কথা আড্ডা আর গানে মুখর হতে থাকলো ১৯ এপ্রিলের সন্ধ্যার রাতে। মঞ্চে উঠলেন হাসানের বড় বোন। যার কোলে পিঠেই হাসানের বড় হওয়া। বোন একসময় বাংলাদেশ বেতার - টিভি নাটকে অভিনয় করতেন। কিন্তু সংসার আর হাসানকে দেখা শোনা করতে গিয়ে তার হয়নি অনেক স্বপ্ন স্বাধগুলো ছোঁয়ার। হাসান বললেন, ‘বুবু তোর স্বপ্নগুলো আমি ছুয়ে দিয়েছি তোর পক্ষ থেকে।’
             সেই আবেগের কথাগুলোই বললেন সবাইকে। ভাই-বোনের সেই আলাপে হাসান তার বোনের সাথেই চোখ মুছলেন কথায়  কথায়! অনুষ্ঠানটা তখন আর নিছক এক জন্মদিনের পার্টি ছিল না। ছিল নস্টালজিক আর অনন্য আসর!
             ছোট্ট হাসান কন্যা নুরজাহান তার  বাবার প্রথম জন্মদিন দেখতে এসে কিছুই বুঝছে না। বুঝার যে বয়স হয়নি এখনও। তাই সে এলোমেলো পায়চারি করে চলেছে।
 
IMG3
হাসানের এই কামব্যাক তার লাখো ভক্তদের ভেতরে আশা জাগাবে এই কারণে যে বয়স আর সময়ের তোড়ে দেশের একাধিক ব্যান্ড তারকাদের স্টেজ পারফর্মেন্সের তেজ কমলেও এতটুকু কমেনি হাসানের। তাই মাইক্রোফোন হাতে যখন ধরলেন, সুইটি তুমি আর কেঁদো না। কিংবা এতদিন পরে প্রশ্ন জাগে ইত্যাদি অগনিত সুপারহিট গানগুলি। তখন মুগ্ধতায় দুচোখের পলকের দুরত্ব বাড়ে। এ যে সেই একই রেকর্ড শুনছি! স্টেজ লাইভে আজ অগনিত স্টুডিও বেজ শিল্পীরা যখন মঞ্চে গাইতে হাঁটু কাঁপে তাদের হাসানের এখনকার স্টেজ নাম্বার শোনা উচিত আবারও! এত নিঁখুত সুরে গাওয়া শিল্পী বাংলাদেশে হাতে গোনা।
 
IMG4
            এমনই অসাধারণ এক রকস্টারের জন্মদিনে যেন হাসান আবারও বেশ ভালো ভাবেই জানান দিলেন যে তিনি আবারও শ্রোতাদের হূদয় দোলাতে আসছেন তিনি। কারণ এক মঞ্চে শুধু নিজের জনপ্রিয় গানগুলি গেয়েই যে রাত পার করে দেবার ক্ষমতা রাখেন এই শিল্পী। তার নাম হাসান। সেই হাসান, সেই আর্ক আবারও মাঠ আর শ্রোতামন কাঁপাতে আসছেন তারই জয়ধ্বণিবার্তা জানান দিলেন ১৯ এপ্রিল। যেটিকে হাসান নিজের জন্মদিন না বলে - বলেন, হাসান, দ্যা ম্যান অব নাইন্টিন্থ এপ্রিল। শুভকামনা প্রকৃত এক রকস্টারের প্রত্যাবর্তনে দৈনিক ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে।