তিন বছর আগে সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর দেশে কারখানা নিরাপত্তা নিয়ে অনেক কাজ হলেও ঝুঁকি রয়ে গেছে। একই ভবনে একাধিক কারখানা আর অভ্যন্তরীণ অগ্নি নিরাপত্তা নিয়ে রয়েছে উদাসিনতা। পোশাক কারখানার একটি বড় অংশ পরিদর্শনের বাইরে রয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে বার্তাসংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অনিরাপদ কারখানার এক নারী শ্রমিক বলেছেন, ‘আমরা সবসময় ভয়ে থাকি, যদি ভবন ধসে যায়। আমরা হয়তো রানা প্লাজার শ্রমিকদের মতোই মারা যাবো’।
এগারোশ’র বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানাপ্লাজা ধসের ঘটনায়। এই ঘটনার পর বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্ তৈরি পোশাক রফতানিকারক বাংলাদেশের কারখানার কর্মপরিবেশের উন্নতি করতে প্রবল চাপের সম্মুখীন হয়।
এ ঘটনার পর তিন বছর হতে চললেও সাড়ে চার হাজার তৈরি পোশাক কারখানার একটি অংশ মাত্র নিরাপদ সনদ পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিরাপদ কারখানায় যে কোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অবশ্য কিছু বড় কারখানায় নিরাপত্তা পরিবেশের উন্নতি হয়েছে। কিন্তু সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করা ছোট ছোট কারখানায় এখনও নিরাপত্তা পরিদর্শন করা হয়নি যেগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েই গেছে।
ঢাকার রামপুরার একটি কারখানায় এএফপির পরিদর্শনে দেখা গেছে, একজনের সাথে একজনের কনুই লেগে যাচ্ছে এরকম গাদাগাদি অবস্থায় শ্রমিকরা কাজ করছেন, সেখানে পশ্চিমা ব্র্যান্ডের ট্যাগ সেলাই করা হচ্ছে। কারখানাটির জরুরি অগ্নিবহির্গমন সিঁড়ির শেষ প্রান্তে লোহার গেট ছিলো তালাবদ্ধ। বহির্গমন পথে পড়ে আছে ফেলে দেয়া সিগারেটের উচ্ছিষ্ট। সমগ্র ভবনেই অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ছিলো কিন্তু এগুলোর একটিরও মেয়াদ নেই।
এই ভবনের ৪টি কারখানার একটি হলো ‘স্টাইল ফ্যাশন’। চাকরি হারানোর ভয়ে নাম না প্রকাশ করার শর্তে ২৫ বছর বয়সী এক নারী শ্রমিক এএফপিকে বলেছেন, ‘আমরা জানি আমাদের কারখানাটি নিরাপদ না, এটি কমপ্লায়েন্স কারখানাও নয়’। কারখানার প্রোডাকশন ম্যানেজার মোহাম্মদ খাইরুজ্জামান বলেন, ‘এই ভবনের চারটি কারখানাই সাব-কন্ট্রাকে দেশি বাজারের পণ্য উত্পাদন করে। এখানে নিরাপত্তার বিষয় নিশ্চিত করা হয়েছে। ফায়ার স্টিংগুইশার শিগগিরই পরিবর্তন করা হবে, যেকোনো জরুরি মুহূর্তে বন্ধ থাকা বহির্গমন পথটিও খুলে দেয়া হবে’।
‘রানা প্লাজা সবখানে’
চীনের পরেই বাংলাদেশ হলো বৃহত্ তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ। বছরে ২৭ বিলিয়ন ডলারের রফতানি হয় এখাত থেকে। প্রায় ৪০ লাখ মানুষ জড়িত এ খাতে; যার বেশির ভাগই নারী। কিন্তু এ খাতের শ্রমিকদের নিরাপত্তার ইতিহাস ভালো নয়। ২০১২ সালের তাজরীন কারখানা দুর্ঘটনায় মারা যায় ১১১ জন শ্রমিক, যার বেশিরভাগই নারী। সেসময় জরুরি বহির্গমন পথ বন্ধ থাকায় এত বেশি নিহত হবার ঘটনা ঘটে।
রানা প্লাজা ধসের সময় সে ভবনে আকটে পড়া আহত শ্রমিক ইস্রাফিল হোসেন বলেন, যদি ভালোভাবে খুঁজে দেখা হয় তাহলে দেখা যাবে রানা প্লাজার মতো ভবন রয়েছে সবখানে। এ দুর্ঘটনার দুই বছর পরও ২৫ বছর বয়সি এই শ্রমিক ট্রমায় আক্রান্ত ছিলেন। ফলে তিনি আর গার্মেন্টস কারখানায় কাজে ফিরে যেতে পারেননি। জীবিকার তাগিদে পরবর্তীতে এই শ্রমিক একটি ওয়ার্কসপে কাজ নেন। তিনি বললেন, ‘পেটের দায়ে আমাদের কাজ করতে হয়, তাই কারখানাগুলোর জন্য আমাদের মতো শ্রমিক খুঁজে পাওয়া খুব সহজ’।
রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বিশ্ববাসীর পক্ষ থেকে ইউরোপ ও আমেরিকার পোশাক ব্র্যান্ডের উপর তাদের সরবরাহকারী কারখানাগুলোর মান উন্নয়নে চাপ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ সরকারও শ্রমিকদের মজুরি ৭৬ শতাংশ বৃদ্ধি করে, শ্রম আইন সংশোধন করে এবং রেকর্ড সংখ্যক কারখানায় শ্রমিক সংগঠন করার সুযোগ করে দেয়। কারখানার নিরাপত্তার মান উন্নত করতে চাপ অব্যাহত আছে।
‘সৌভাগ্যবশত কেউ মরেনি’
কারখানা নিরাপত্তা বিষয়ে ক্রেতাজোট অ্যালায়েন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজবাহ রবিন বলেন, বড় দুর্ঘটনা যেকোনো সময় ঘটতে পারে। গত বছর বেশ কয়েকটি বড় অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে; কিন্তু সৌভাগ্যবশত কেউ নিহত হয়নি।
উত্তর আমেরিকার ক্রেতাজোট অ্যালায়েন্স তাদের পরিদর্শন শেষে ৭৭টি কারখানার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং সরকারকে ৩৬টি কারখানা বন্ধ করে দেয়ার পরামর্শ দেয়। তবে আরো কারখানা পরিদর্শন বাকি রয়েছে বলে জোটের নির্বাহী পরিচালক রব ওয়েসি বলেছেন।
সরকারি কর্তৃপক্ষ বলছেন, পরিদর্শনকৃত দেড় হাজার কারখানায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করার প্রয়োজন রয়েছে। এর বাইরেও শত শত ছোট কারখানা পরিদর্শন করতে হবে। কলকারখানা পরিদর্শন অধিদফতরের প্রধান সৈয়দ আহমেদ বলেন, রেজিস্ট্রেশনের বাইরে থাকা প্রায় ৮শ কারখানা পরিদর্শনে আমাদের বর্তমানে তহবিল নেই।
এ বিষয়ে তৈরি পোশাক রফতানিকারক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি ফারুখ হাসান এএফপিকে বলেন, কারখানাগুলোর নিরাপত্তার মান এবছরের মধ্যেই উন্নত করা হবে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ অধিকাংশ কারখানায় নিরাপত্তার মান উন্নত করার আশা প্রকাশ করেন তিনি।
