রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি: তিনবছর পরও নওগাঁর ২১জন অশনাক্ত

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০১৬, ১৩:১৪
তিনবছর আগে ঢাকার সাভারে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় নওগাঁর ২১ জন অশনাক্ত রয়েছেন এখনও। এ ঘটনায় ২৩ জন নিহত হয়েছেন। আর অঙ্গহানি অবস্থায় আছেন ১ জন। ঘটনার পর অশনাক্তদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে শনাক্ত করা হয়। কিন্তু তাদের এখন পর্যন্ত খোঁজ মেলেনি। এদিকে নিহতদেরও মৃতদেহ ফেরত দেয়া সম্ভব হয়নি।
 
এদিকে নিহত হওয়ার পর সরকার থেকে পরিবারদের এক লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত দেয়া হলেও পরে আর কোন খোঁজ খবর নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়। অনেক পরিবারের একমাত্র অর্থ উপার্জনকারীকে হারিয়ে অনাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে। অনেকে আজ পথে বসেছেন।
 
জানা গেছে, তিন বছর আগে ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় জেলার ৪৫টি পরিবারের পথে বসতে হয়েছে। 
 
অশনাক্তরা হলেন, বদলগাছী উপজেলার থুপশহন গ্রামের কবির উদ্দীনের মেয়ে পপি আক্তার, বিশালবাড়ী গ্রামের ওমর আলীর ছেলে ইমরান হোসেন(২৫), মান্দা উপজেলার কাঞ্চন গ্রামের জয়নাল আবেদিনের মেয়ে সুলতানা খাতুন(১৮), বনকুড়া গ্রামের আজিজুর রহমানের মেয়ে আসমা বেগম, চাকমা শেখ গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে নাজিম উদ্দিন, গোসাইপুর গ্রামের মোঃ রহমানের ছেলে আব্দুস সালাম (৩৩), মহাদেবপুর উপজেলার মোজাম্মেল হকের মেয়ে ইয়াসমিন (২১), মাধবপুর গ্রামের ফরিন্দ্র নাথ বসুর ছেলে প্রভাতী চন্দ্র বসু (৫৫), নওগাঁ সদর উপজেলার আইনুদ্দীন শেখের মেয়ে মাহমুদা আক্তার(৩৫), শিকারপুর গ্রামের আলতাব হোসেনের ছেলে আল আমীন(২৪), কালুশহর গ্রামের মো. আবুল কাশেমের মেয়ে ঝর্ণা বেগম (২৩), রাণীনগর উপজেলার বাবদাগাড়ী গ্রামের মো. মোজাম্মেলের ছেলে মো. আব্দুর, আত্রাই উপজেলার সাহেবগঞ্জ বাজার এলাকার ফয়েজ উদ্দীন আহম্মেদের মেয়ে মোছা. মুন্নি (২৮), রাণীনগর গ্রামের নিজাম উদ্দীনের মেয়ে বেবী আক্তার(৩০), ইসলামগাঁথী গ্রামের ছানোয়ার হোসেনের মেয়ে মোছাঃ সালেহা(২৮), নিয়ামতপুর উপজেলার বালিচাঁদ গ্রামের মৃত সিরাজ উদ্দীনের স্ত্রী মোসা. ইসমতারা (৪৩), ক্যাপড়া (চাপড়া) গ্রামের কিয়ামত আলীর মেয়ে মোছা. কহিনুর (৪২), ভাতকুন্ড গ্রামের হযরত আলীর মেয়ে নাসিমা (৩৫), হারপুর গ্রামের শওকত আলীর মেয়ে শিরিনা (২৪), পারমনিক(বাতকুন্ড) গ্রামের নজি প্রামানিকের মেয়ে স্বপ্না বেগম, পত্নীতলা উপজেলার হাড়পুর গ্রামের আব্দুল মান্নানের মেয়ে লিপি আক্তার (২০)।
 
অঙ্গহানি ব্যক্তি হলেন- নিয়ামতপুর গ্রামের তল্লা গ্রামের জোনাব আলীর মেয়ে সায়মা (২৪)।
 
নিহতরা হলেন- মান্দা উপজেলার তেলিপাড়া গ্রামের মৃত রফাতুল্লাহের স্ত্রী জহুরা বেগম (৪০), দক্ষিণ নুরুল্ল্যাবাদ গ্রামের ফজলুর রহমানের মেয়ে খাদিজা (১৭), বানিস্বর গ্রামের খাদিজা খাতুন(১৭), মো. হান্নানের মেয়ে সাথী বেগম (২০), মো. ইসমাইলের ছেলে সাহেব আলী (২২), হান্নানের জামাই সেলিম হোসেন (২৯), ফেটগ্রামের বেলায়েত আলীর মেয়ে দুলালী(২৫), মীরপুর গ্রামের মো. আবদুস ছোবানের  মেয়ে সাবিনা খাতুন(২১), ভরট্রকাঠের ডাঙ্গা গ্রামের মৃত খয়ের আলীর মেয়ে মোছা. মরিয়ম (২৫), মহাদেবপুর উপজেলার চককন্দপুর গ্রামের রেজাউল ইসলামের স্ত্রী মেরিনা (২৪), ছোট মহেষপুর গ্রামের মৃত নজরুল ইসলামের ছেলে জুলফিকার আলী মাসুদ (৪৫), নিয়ামতপুর উপজেলার সেফায়েতপুর গ্রামের মৃত কমর উদ্দিনের ছেলে জামিল (২৮), হাকিমপুর গ্রামের ছইমুদ্দীনের ছেলে মো. রশিদ(৩৫), তল্লা গ্রামের ছাইদুল ইসলামের ছেলে মো. নাইম (১৮), খইবার মন্ডলের স্ত্রী মোছা. আকলেমা (৩৫) ও মেয়ে রুনা (১৮), পাছড়া গ্রামের হোসেন আলীর ছেলে সেলিম (২২), বালিচাঁদ গ্রামের  ফয়েজ উদ্দীনের ছেলে মো. রেজাউল হক (১৯), বলিচাঁদ গ্রামের মো. ফয়জুদ্দিনের ছেলে রেজাউল হক (১৯), বদলগাছী উপজেলার মহদীপুর গ্রামের মনতাজুল রহমানের মেয়ে নাছরিন আনোয়ারা রুনা (৩৬), পোরশা উপজেলার গরখাই গ্রামের সামসুল হকের মেয়ে সামছুন্নাহার (১৮), রাণীনগর উপজেলার একডালা গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে শফিউল আলম, বড়গুন্দইল গ্রামের মৃত খাতির মন্ডলের মেয়ে মেরিনা আক্তার (২৯), সাপাহার উপজেলার বিদ্যানন্দী গ্রামের রহিম উদ্দীনের মেয়ে কল্পনা (২১)।
 
ওই ঘটনায় দেয়াল চাপায় নিয়ামতপুর গ্রামের তল্লা গ্রামের সায়মার মেরুদণ্ডের রগ পুরো নষ্ট হয়ে পঙ্গু হয়ে গেছেন। এর ফলে তিনি কখনো সোজা হয়ে চলা ফেরা করতে পারেন না। হুইল চেয়ারে চলা ফেরা করতে হয় তাকে। 
 
সায়মা জানান, তার কোমরের নিচে পুরোটাই অবশ হয়ে গেছে। সরকার থেকে কোন নগদ টাকা দেয়া হয়নি। তবে সরকার থেকে প্রতি মাসে ৭ হাজার টাকা চিকিৎসা বাবদ দেয়া হয়। প্রতি মাসে এ টাকা দিয়ে তার চিকিৎসার খরচ করতে টাকা শেষ হয়ে যায়। তাতে দুই মেয়ে ও স্বামী নিয়ে অসহায় জীবন যাপন করতে হচ্ছে। 
 
নিহত ও অশনাক্তদের পরিবার নগদ ১ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা পাওয়ার কথা স্বীকার করে অভিযোগ করে বলেন, এরপর থেকে তাদের কোন খোঁজ খবর নেয়া হয়নি।
 
বদলগাছী উপজেলার থুপশহন গ্রামের অশনাক্ত পপি আক্তরের ভাই রুবেল জানান, ঘটনার পর দ্রুত ঢাকায় যান। লাশ ঘরে তার বোনকে শনাক্ত করতে পারলেও অপর একজন দাবি করে বসেন। এতে পপির লাশ না দিয়ে দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। ডিএনএ নমুনার মাধ্যমে লাশ শনাক্ত করা হলেও তিন বছরেও তার বোনের লাশ ফেরত দেয়া হয়নি।
 
নওগাঁ সদর উপজেলার মাহমুদা আক্তারের বাবা আইনুদ্দীন শেখ জানান জানান, ডিএনএ নমুনার মাধ্যমে লাশ শনাক্ত করা হলেও তিন বছরেও তার ছেলের লাশ ফেরত দেয়া হয়নি।
 
পত্নীতলা উপজেলার কাঁটাবাড়ি হাড়পুর গ্রামের অসহায় আব্দুল মান্নানের মেয়ে লিপি আক্তার সাভারের রানা প্লাজার নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড এ মান পরিদর্শক হিসাবে ২০১২ সালে কাজে যোগ দেন। হঠাৎ করে ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের খবর পেয়ে লিপির বাবা মেয়ের খোঁজে ঢাকার সাভারে যান। কিস্তু অনেক খোঁজাখুঁজির পর তিনি তার মেয়েকে পাননি। লিপি আক্তার হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় ২১ মে ঢাকার সাভার থানায় সাধারণ ডায়েরি ও প্রশাসনের কাছে আবেদন করেন। ডিএনএ পরীক্ষার পরও লিপির কোন সন্ধান মেলেনি বলে তার পরিবার জানান।
 
মহাদেবপুর উপজেলার চককন্দপুর গ্রামের নিহত মেরিনার ছেলে সানোয়ার, নিয়ামতপুর উপজেলার সেফায়েতপুর গ্রামের আকলেমার স্বামী খয়বার মন্ডল জানান, তারা নগদ ১ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা পেলেও আর কোন সহযোগিতা পাননি। এমনকি কোন খোঁজখবর নেয়া হয়নি। হোসেন আলী জানান, তাদের একটি ছোট্ট কুঁড়ে ঘর ছাড়া ধন সম্পদ কিছুই নাই। পরিবারের একমাত্র অর্থ উপার্জনকারী একমাত্র ছেলে সেলিম মারা যাওয়ায় এখন অর্থে কষ্টে থাকতে হয়। 
 
ভূমিহীন ইসমাইল হোসেন জানান, তার একমাত্র সন্তান সাহেব আলী মারা যাওয়ায় এই বৃদ্ধ বয়সেও হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে হচ্ছে। অনেকদিন অনাহারে দিন চলে যায়। অনেক সময় মানুষের কাছে হাত বাড়াতে বাধ্য হন। কোন মতে বেঁচে আছেন স্ত্রী নিয়ে। 
 
জামিলের স্ত্রী রসিদা জানান, ৬ বছরের একটি সন্তান আছে। সামান্য কিছু জমি আছে তা থেকে যে ধান পান তা দিয়ে সংসার চালানো যায় না। তাই সন্তান নিয়ে বেশির ভাগ সময় বাবার বাড়ি গিয়ে থাকতে হয়।
 
এ ব্যাপারে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ইউনূস আলী জানান, এ ব্যাপারে সবকিছু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে সম্পন্ন করা হয়। সেখানে যে নির্দেশনা দেয়া হবে সে অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করা হবে।