অংশীজনের মত ছাড়াই মন্ত্রিসভায় উঠছে বিচারকদের অসদাচরণ তদন্ত বিল

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০১৬, ০৯:৪৩
অংশীজনের (বিচারকদের) মতামত ছাড়াই আজ সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের আলোচ্য সূচিতে রাখা হয়েছে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অসদাচরণ ও অসামর্থ্য (তদন্ত ও প্রমাণ) বিল ২০১৬’। বিলটি সম্পর্কে মতামত দেয়ার জন্য খসড়া প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু প্রধান বিচারপতির মতামতের আগেই এটি মন্ত্রিসভায় উঠানো হচ্ছে। সংসদে আইনটি পাস হলে তিন সদস্যের একটি কমিটি বিচারকের অসদাচরণের অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে। 
 
খসড়া বিলে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি বা আপিল বিভাগের একজন সাবেক বিচারপতির নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। কমিটির অন্য দু’জন সদস্য হলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এবং একজন বিশিষ্ট নাগরিক। বিশিষ্ট নাগরিক কে হবেন তা নির্ধারণ করবে সরকার।
 
১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা ছিল সংসদের হাতে। ওই সংবিধানের ৯৬ (২) অনুচ্ছেদে বলা ছিল, ‘প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যেদের ভোটে সমর্থিত প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণ করা যাবে।’ আর ৯৬ (৩) অনুচ্ছেদে বলা ছিল, অপসারণের প্রস্তাব সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। কিন্তু সংবিধানের এই বিধানের আলোকে কোন আইন প্রণয়ন করতে পারেনি                 তত্কালীন সংসদ। এর মধ্যেই দু’বার সংশোধন হয়েছে সংবিধান। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীতে ৯৬ (২) অনুচ্ছেদ সংশোধন করে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের পরিবর্তে সরাসরি রাষ্ট্রপতির হাতে দিয়ে দেয়া হয়। আর আইন-সংক্রান্ত ৯৬ (৩) অনুচ্ছেদটি বিলুপ্ত করা হয়।
 
১৯৭৭ সালে বিচারকদের অপসারণের পদ্ধতিতে আবার পরিবর্তন আসে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের এক সামরিক আদেশে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাত থেকে নিয়ে গিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে দিয়ে দেয়া হয়। পরে ১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এই বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১০ সালে আপিল বিভাগ পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করলেও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে অনুমোদন দিয়েছিল। 
 
২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাহাত্তরের সংবিধানের অনেক বিষয় ফিরিয়ে আনা হলেও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধানটি রেখে দেয়া হয়। তিন বছর পর সরকারের নীতি নির্ধারকরা এই ক্ষমতা পুনরায় সংসদের হাতে ফিরিয়ে নেয়ার তাগিদ অনুভব করেন। এ নিয়ে সংসদে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের সোচ্চার হতে দেখা যায়। পরে ২০১৪ সালে ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা আবার সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেয়া হয়। একইসঙ্গে ’৭২-এর মূল সংবিধানের বিধান হুবহু প্রতিস্থাপন করা হলেও ৯৬(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করা হয়নি। দু’বছর ধরে বিষয়টি পড়েছিল। এ নিয়ে আইন কমিশন ও আইন মন্ত্রণালয় দুটি খসড়া বিল প্রণয়ন করে। এ বছরের শুরুর দিকে আইনমন্ত্রী প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করে বিলের খসড়াটি তার হাতে দেন। খসড়া সম্পর্কে বিচারকদের অভিমতও জানতে চান আইনমন্ত্রী। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে কোন মতামত জানায়নি।
 
সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে ষোড়শ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে একটি মামলা হয়েছে। একটি বৃহত্তর বেঞ্চে মামলার শুনানিও হয়েছে। আগামী ৫ মে রায়ের জন্যও বিষয়টি ধার্য রয়েছে। মামলা বিচারাধীন থাকায় সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে কোন মতামত পাঠানো থেকে বিরত থাকে।