রাজশাহীতে আওয়ামী লীগ নেতা হত্যা, ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০১৬, ০৯:০৮
রাজশাহী চেম্বারের সাবেক প্রশাসক ও জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ জিয়াউল হক টুকুকে পরিকল্পিত হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যার পর নিহতের স্ত্রী শামসুন্নাহার বেগম লতা তার স্বামীর ব্যবসায়ীক পার্টনারসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানায় মামলাটি দায়ের করেন। তবে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত আসামিদের কাউকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি।
 
এদিকে টুকু হত্যার পর কৌশলে পালিয়ে যাওয়া নয়ন নামে ঢাকার এক যুবক ফোনে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করলেও গত ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তার হদিস পায়নি পুলিশ। অন্যদিকে ঘটনার পর থেকে নিহতের আরেক পার্টনার কানাডা প্রবাসী রাজশাহীর তরিকুলও সপরিবারে পলাতক রয়েছেন। ঠিকাদারি নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে দাবি করেছেন নিহত টুকুর ঘনিষ্টজনরা।
 
নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহাদত হোসেন খান ইত্তেফাককে জানান, এজাহার নামীয় আসামিদের মধ্যে অজ্ঞাত একজনসহ তিনজন পলাতক। তবে রবিউল ও জসিমকে ঘটনার পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছিল। এখন তাদের নিহতের স্ত্রীর মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সময় আসামিরা পাঁচজনই ঘটনাস্থলে ছিলেন।
 
এজাহারে বলা হয়, ঢাকা মতিঝিল এলাকার নয়ন (৪৫), রাজশাহী নগরীর বোসপাড়া এলাকার প্রয়াত ডা. সালাউদ্দিনের ছেলে, ক্যানাডা প্রবাসী তরিকুল ইসলাম (৪৮), মহিষবাথান এলাকার ঠিকাদার রবিউল ইসলাম (৪৬) ও সুলতানাবাদ এলাকার কাপড় ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন (৪৮) মিলে আওয়ামী লীগ নেতা টুকুকে পরিকল্পিত হত্যা করেছে।
 
নিহতের ঘনিষ্টরা জানান, রাজশাহীর বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) একটি কাজ পায় আওয়ামী লীগ নেতা টুকুর মেসার্স প্রমিনেন্ট কনস্ট্রাকশন। এ কাজে তার সঙ্গে পার্টনার হিসেবে যুক্ত হয় ঢাকার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ কাজ নিয়ে ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে টুকুর দেনা পাওনা ছিল। এ নিয়ে দ্বন্দ্বও চলে আসছিল। ১০ দিন আগে টুকু ঢাকায় গিয়ে তার পাওনা পরিশোধের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। এরপর দুইদিন আগে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে নয়নকে রাজশাহীতে পাঠানো হয়। দুইদিন থেকে নয়ন রাজশাহীতেই অবস্থান করছিলেন। গত রবিবার দুপুরে একসঙ্গে তারা টুকুর চেম্বারে বসে দুপুরের খাবারও খায়। সেখানেই টেবিলে থাকা টুকুর লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে পেছন থেকে তাকে গুলি করা হয়। এসময় অপর দুইজন জসিম ও রবিউল বাইরে থাকলেও নয়ন তরিকুল ও অজ্ঞাত একজন ঘরেই ছিলেন। সেখানে নাটক সাজিয়ে প্রচার করে টুকু তার পিস্তল পরিষ্কার করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন। তাৎক্ষণিক এ তথ্য সাংবাদিকদেরও জানানো হয়।
 
তবে সন্ধ্যার পর হত্যাকাণ্ডের রহস্য বেরিয়ে আসে। এরপর থেকেই আত্মগোপনে চলে যায় ঢাকার যুবক নয়ন, স্থানীয় তরিকুল ও অজ্ঞাত একজন। 
 
টুকুর ঘনিষ্টরা জানান, নয়ন পেশাদার খুনী। ব্যবসায়ীক হিসাব-নিকাশ নিয়েই তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
 
প্রসঙ্গত, গত রবিবার বিকেল ৪টায় নগরীর গ্রেটাররোডের নগর ভবনের সামনের ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীক চেম্বারে জিয়াউল হক টুকু গুলিবিদ্ধ হন। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ৫নং ওয়ার্ডে ভর্তির কিছুক্ষণ পরই তার মৃত্যু হয়। রাতেই পুলিশ ওই চেম্বার থেকে টুকুর লাইসেন্সকৃত পিস্তল ও ৫ রাউণ্ড গুলি, হত্যায় ব্যবহৃত একটি গুলির খোসা ও রক্তমাখা তোয়ালে এবং কনস্ট্রাকশনের কগজপত্র জব্দ করা হয়েছে। রবিবার রাতেই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ মর্গে তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।
 
নিহতের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক অধ্যাপক এনামুল হক জানান, ভিকটিম টুকুর বগলের দিক থেকে গুলি ঢুকে ফুসফুসের একাংশ ভেদ করে পেছনের দিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। এছাড়া তার বুকের হাড়ের ভেতরের অংশে গুলির জখম রয়েছে। তবে বোয়ালিয়া থানার ওসি জানিয়েছেন, সোমবার বিকেল পর্যন্ত ভিকটিমের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়া যায়নি।
 
এদিকে সকালে নগরীর গৌরহাঙা শহীদ কামারুজ্জামান চত্বরে নামাজে জানাযা শেষে টুকুর লাশ নগরীর হেতেমখাঁ গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। 
 
এ ব্যাপারে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ জানান, নিহত জিয়াউল হক টুকুর বাড়ি নগরীর ষষ্ঠিতলায়। রবিবার রাতে টুকুর কথিত বন্ধু নয়ন দাবি করেছেন, তার হাত থেকে টুকুর পিস্তলের গুলি বেরিয়ে বুকে বিদ্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।
 
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার নগরীর একটি অভিজাত বাণিজ্যিক হোটেল থেকে দুই শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার, শনিবার সকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের প্রফেসর একেএম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে প্রকাশ্যে গলাকেটে হত্যার পর রবিবার বিকেলে নিজ ব্যবসায়ীক চেম্বারে জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ জিয়াউল হক টুকুকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় নগরীতে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। উদ্বিগ্ন ও আতঙ্কিত জনগণের পক্ষে সোমবার দুপুরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা অভিযোগ করেছেন, ‘নগরীতে পুলিশ দায়িত্ব পালন ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।’