সেতার বাঁশি তেমনি আছে, মানুষটি নেই

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০১৬, ১০:০৩
 
রাজশাহী মহানগরীর শালবাগানের ১৬১ নম্বর বাড়িটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকীর। ক্লাস নিয়ে বাড়ি ফিরে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠেই সোজা ঢুকতেন দ্বিতীয় ঘরটিতে। এখানেই অবসর সময় কাটাতেন রেজাউল করিম। একতারা, সেতার, বাঁশি ও হারমোনিয়াম ছিল তার সাথী। সুর-সঙ্গীতের মূর্ছনায় তৈরি হত ঐশ্বরিক আবহ। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত আনন্দ ও ভালোবাসার সুবাতাস। এখন কেউ আর সেখানে সঙ্গীত সাধনা করবে না, ঝংকার তুলবে না তার সেতার। গত শনিবার সকালে সঙ্গীতপ্রিয় মানুষটিকে চিরতরে থামিয়ে দিল কয়েকজন দুর্বৃত্ত। অথচ শিশুর মত কোমল এই শিক্ষকের কোনো শত্রু ছিল না।
 
শিক্ষক রেজাউলের প্রিয় ঘরটিতে ঢুকতেই চোখে পড়ে বিছানার ওপর পড়ে আছে সেতার। এর পাশেই ছোট খাটের ওপরে পাতা বিছানায় একটি ফোমের মোটা বালিশ আর তিনটি তুলার বালিশ। খাটের নিচে একটি কাঠের পুরাতন চেয়ারের ওপর ল্যাপটপ। খাটের পশ্চিম পাশে মেঝেতে মাথার সামনেই ছিল কালো কাপড়ে ঢাকা একটি হারমোনিয়াম। আর খাটের পাশে একটি একতারা। এগুলো আর তার স্পর্শ পাবে না।
 
সময় মতো ক্লাস নেয়া ও ঠিকমতো একাডেমিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করাই ছিল রেজাউলের ব্রত। তাকে এভাবে হত্যার শিকার   হতে হবে কেউ তা মেনে নিতে পারছে না।
 
প্রতিবেশী আসমা খাতুন বলছিলেন, ‘তার মতো মানুষ হয় না। আমার ছেলে-মেয়েদেরও তিনি নিজের ছেলে-মেয়ে মনে করতেন। এলাকার কেউ এসে তার কাছ থেকে খালি হাতে যেতেন না। আর সময় পেলেই বসে পড়তেন সেতার, তানপুরা, বাঁশিসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নিয়ে। তার কণ্ঠে কখনো কখনো গানও ভেসে আসতো।’
 
‘সুন্দরম’ সংগঠনের সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্থাপন শাখার সেকশন অফিসার হাসন রাজা জানান, তার সঙ্গে পরশুদিনও পত্রিকা (কোমলগান্ধার) বের করা নিয়ে বিভিন্ন কথা হয়েছে। এটা মৌলবাদীদের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। কারণ তার কোনো শত্রু থাকতে পারে বলে মনে হয় না।
 
রেজাউল করিমের সহকর্মী ইংরেজী বিভাগের অধ্যাপক জহুরুল ইসলাম বলেন, আমরা একসাথে লেখাপড়া করেছি। বর্তমানে সে আমার সহকর্মী। কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে তার সংশ্লিষ্টতা নেই। ক্লাস-পরীক্ষা আর লেখাপড়া নিয়েই তিনি ব্যস্ত থাকতেন। তিনি সেতার বাজাতে পছন্দ করতেন। সঙ্গীত চর্চায়ও তার উত্সাহ ছিল। এছাড়া সবসময় তার হাতে ক্যামেরা দেখা যেত।
 
গত ১২ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজাউল করিমসহ চারজন শিক্ষক খুন হওয়ায় ও গত এক বছরে বেশ কয়েকজন শিক্ষককে মোবাইলের মাধ্যমে হুমকির ঘটনায় শিক্ষকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেই প্রক্টর দপ্তরকে জানিয়ে নগরীর মতিহার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। জিডি করার পরও পুলিশ হুমকিদাতাদের ধরতে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
 
মতিহার থানার ওসি হুমায়ন কবির বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিভিন্ন নম্বর থেকে হুমকির বিষয়টি খুব গুরুত্বের সাথেই পুলিশ তদন্ত করেছে। নম্বরগুলোর ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে দেখা যায় ব্যবহারকারীরা কেরানীগঞ্জ, মাগুরা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বা অন্য এলাকার। ওইসব নাম্বারগুলো পরে আর ব্যবহারও হয় না।