সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ দমনে বাংলাদেশকে সর্বাত্মক সহায়তা দেবে ভারত। বিশেষ করে সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ ও সংখ্যালঘুদের উপর সম্প্রতি আক্রমণকারী জঙ্গিদের প্রতিরোধে বাংলাদেশের পাশে থাকবে ভারত। দুইদিনের সফরে আসা ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ড. এস জয়শংকর তার সরকারের পক্ষে এ ব্যাপারে জোড়ালো বার্তা দিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিবেশি হিসাবে দুই দেশের জন্যই সন্ত্রাসবাদ সরাসরি উদ্বেগের বিষয়। দ্বিপাক্ষিক উপায়ে আমরা এটি দমনে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করব।’
জয়শংকর বুধবার বিকালে ঢাকা আসেন ও গতকাল বিকালে নয়াদিল্লি ফিরে যান। গতকাল দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পাদ্মায় তিনি পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করেন। পরে দুই পররাষ্ট্র সচিব সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। সকালে জয়শংকর নাগরিক সমাজের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে প্রাতঃরাশ বৈঠক করেন। প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ ও ভারত সম্পর্ক নিয়ে যার যার মতামত তুলে ধরেন ও ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিবের বক্তব্য শোনেন। এ বৈঠকে সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ দমনে বাংলাদেশ, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র ‘একসঙ্গে কাজ করবে’ মার্কিন কর্মকর্তাদের এমন বক্তব্য নাকচ করে দেন জয়শংকর।
দ্বিপাক্ষিক আলোচনা
পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, দুই দেশের মধ্যকার সব ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের সময়ে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর অগ্রগতি, দ্বিতীয় ঋণ সহায়তা চুক্তি প্রকল্প, সামুদ্রিক অর্থনীতির যৌথ ওয়ার্কিং টিম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হয়েছে। এছাড়া জ্বালানি ও ঋণচুক্তিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশেষ করে যোগাযোগের ক্ষেত্রে অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এই কয়েক মাসে অগ্রগতি অপ্রত্যাশিত ও নির্বিঘ্ন। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অগ্রগতি হয়েছে। সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ নির্মূলের ব্যাপারে আমরা দ্বিপক্ষীয়ভাবে কাজ করছি। এই ইস্যুতে নোট বিনিময় হয়েছে। দুদেশের অবস্থান ও পরিস্থিতি অভিন্ন। কিছুদিন ধরে সীমান্ত শান্তিপূর্ণ আছে। দুদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী প্রধানরা আলোচনা করছেন।
প্রধানমন্ত্রীকে মোদীর আমন্ত্রণ
পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক এক প্রশ্নের জবাবে জানান, আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবর ভারতের গোয়াতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিমসটেক সদস্য দেশের সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানদের ঐ সম্মেলনের সাইড লাইনে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নীতিগতভাবে এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন।
নাগরিক সমাজের সঙ্গে বৈঠক
বাংলাদেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দিল্লির নিরাপত্তা সহযোগিতার ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গতকাল সকালে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে প্রাতঃরাশ সভায় ভারতের পররাষ্ট্রসচিব এস জয়শংকর জানান, সহযোগিতার প্রসঙ্গটি তিনি গণমাধ্যম সূত্রে জেনেছেন।
রাজধানীর একটি হোটেলে প্রাতঃরাশ সভা শেষে অধ্যাপক এমিরেটাস আনিসুজ্জামান, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল ও আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক আবদুল মান্নান সাংবাদিকদের কাছে এ তথ্য জানান।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সমস্যার কথা উঠে এসেছে। দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক সম্পর্ক কীভাবে এগিয়ে নেয়া যায় সেটি নিয়ে কথা হয়েছে। নিরাপত্তা নিয়ে কথা হয়েছে। কাগজে যে বের হয়েছে, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র এক সঙ্গে কাজ করবে উনিও সেটা কাগজে পড়েছেন বলে জানালেন। এটার কোনো ভিত্তি আছে বলে মনে হয় না।
সুলতানা কামাল বলেন, নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার জন্য তিনি ঢাকায় এসেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে বিষয়টা তিনি এখানে এসে শুনেছেন, এ ব্যাপারে তার কোনো মন্তব্য সেভাবে ছিল না। নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে এটি অবশ্যই জনগণের কাছ থেকে আসতে হবে শুধু সন্ত্রাস নির্মূলের ক্ষেত্রে থাকলে হবে না।
আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল মান্নান বলেন, একটি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিশা দেশাই যে এলেন এবং তিনি যে বললেন বাংলাদেশ, ভারত ও আমেরিকা এক সঙ্গে কাজ করবে এ বিষয়টি আমরা উঠিয়েছিলাম। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারত আমাদের সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে কীভাবে কাজ করবে। তিনি সে প্রশ্নটাকে উল্টোভাবে আমাদের করেছেন, আমেরিকা বলেছে, আমরাতো বলিনি।
প্রাতঃরাশ বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী, অধ্যাপক আআমস আরেফীন সিদ্দিক, লে. জেনারেল (অব) হারুন অর রশীদ, মেজর জেনারেল (অব) আবদুর রশীদ, শমসের মবিন চৌধুরী, ড. কাজী খলিকুজ্জামান আহমেদ, সৈয়দ ফাহিম মুন, এম, আলতামাস কবির, জাফর সোবহান, সৈয়দ মুনীর খসরু, ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর, একে ফাইয়াজুল হক রাজু প্রমুখ।
