রাজধানীর অসহনীয় যানজটের বেড়াজাল মুক্ত হয়ে নির্বিঘ্ন যাতায়াতের ক্ষেত্রে জনপ্রিয় পরিবহন হয়ে উঠছিলো ওয়াটার বাস। কর্মব্যস্ত মানুষ নৌপথে গাবতলী থেকে সদরঘাট যেতে-আসতে বেছে নিচ্ছিলেন এই নৌ-যানটিকে। প্রথমদিকে আরামদায়ক ভ্রমণে গন্তব্যে পৌঁছার নিশ্চয়তাও ছিল। কিন্তু যাত্রায় ধীরগতি, অনিয়মিত সময়সূচি, সময়মতো বাস না পাওয়া, মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া, পর্যাপ্ত বাস না থাকা এবং সুবিধাজনক ল্যান্ডিং স্টেশনের অভাবে ক্রমাগত যাত্রী হারাচ্ছে ওয়াটার বাস।
জানা গেছে, কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা-অব্যবস্থাপনা, তেল চুরি আর যাত্রীর অভাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬০ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে ওয়াটার বাসকে। দৈনিক ট্রিপের সংখ্যা ১৪ থেকে নেমে এসেছে ৬-এ। বড় ওয়াটার বাসের গতি ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হয়েছে। বাদামতলী থেকে গাবতলী নৌ-পথে ৪০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে দেড়-দু’ঘণ্টা। ছোটগুলোর গতি আরো ধীর। এখন আবার বড়গুলো বসিয়ে ছোট ওয়াটার বাস নামানোয় যাতায়াতে বেশি সময় লাগছে। ফলে বাধ্য হয়ে ওয়াটার বাস থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন যাত্রীরা।
গাবতলী বিআইডব্লিউটিসি’র ঘাটে লাগানো নোটিসবোর্ডে উল্লেখ আছে, ওয়াটার বাস ৪৫ মিনিট পর পর প্রতিদিন সকাল সাড়ে সাতটা থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত ১৪টি ট্রিপ দেবে। গাবতলী-সদরঘাট পর্যন্ত ভাড়া জনপ্রতি ৪০ টাকা। তবে এসব কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে সকাল ৮টা থেকে শুরু হচ্ছে ট্রিপ। অতঃপর ৯টা, ১০টা, ১১টা, ১টা, ৩টা এবং ৫টায় দিচ্ছে ট্রিপ। তবে কিছু কর্তাব্যক্তির খামখেয়ালিপনায় এই নিয়মও মানা হচ্ছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চালক বলেন, ওয়াটার বাস জনপ্রিয় করে তুলতে কোনো উদ্যোগ নেয়নি কর্তৃপক্ষ। বড় ওয়াটার বাসগুলোর আসন সংখ্যা ৮৩ আর ছোটগুলোর ৩৬। ১২ জন, সাতজন, কখনো কখনো তিনজন নিয়ে ৪টি ওয়াটার বাস যাওয়া-আসা করে। যাত্রী বেশি হলে তাড়াতাড়ি রওনা দেয় আর কম হলে দেরি করে যাত্রীর জন্য। অথচ বাসে বাদামতলী থেকে গাবতলী বেড়িবাঁধ সড়ক দিয়ে যেতে লাগে ৪০ থেকে ৫০ মিনিট। ১০ মিনিট পর পর বাস পাওয়া যায়। ভাড়া ৩০ টাকা। আর ওয়াটার বাসের ভাড়া ৪০ টাকা। যেতে লাগে দেড়ঘন্টা। সময় মেনে চলেও না। এর ফলে কোনো যাত্রীই ওয়াটার বাসে যাতায়াত করতে চান না।
সূত্র জানায়, উদ্বোধনের পর ওয়াটার বাসে যাত্রীসংখ্যা ভালোই ছিল। একটি বড় ওয়াটার বাসে ৮৩টি আসন থাকলেও অনেক সময় যাত্রী থাকতো শতাধিক। হঠাত্ পুরনো ‘তুরাগ’ ও ‘বুড়িগঙ্গা’ নামের ছোট দুটি ওয়াটার বাসকে বেশি করে ট্রিপ দেয়া শুরু হয়। এগুলোর গতি একেবারেই কম। ফলে যাত্রী হারাতে থাকে ওয়াটার বাস। এই কারণে শুরু থেকেই এই সার্ভিস লোকসান গুনতে থাকলেও বিআইডব্লিউটিসি আবারো তিন কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সার্ভিসটিতে আরো চারটি বাস যোগ করে। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ১৬ নভেম্বর পাঁচ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে আরো ছয়টি বাস চালু করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআইডব্লিউটিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, শুরু থেকেই ওয়াটার বাস নিয়ে বিপত্তির শেষ নেই। প্রথম দফায় দুটি বাস দিয়ে ২০১০ সালে পরীক্ষামূলক সেবাটি চালু হলেও অব্যাহত লোকসানের কারণে ১১ মাসের মাথায় তা বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর পুনরায় চারটি ওয়াটার বাস তৈরি করে বিআইডব্লিউটিসি। পাশাপাশি পুরনো দুটিও মেরামত করা হয়। এগুলো চালু করা হলেও লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হওয়া সম্ভব হয়নি। পরে ছয়টি ওয়াটার বাস ছয় মাসের জন্য ‘বুড়িগঙ্গা ফ্লোটিং’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেয়া হয়। কিন্তু এক মাসের মাথায় বাসগুলো ফিরিয়ে দেয় তারা। কারণ হিসাবে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, প্রতি ট্রিপে (যাওয়া-আসা) একটি ওয়াটার বাসে ডিজেল লাগে প্রায় ১২০ লিটার। এক ট্রিপে জ্বালানি বাবদই ব্যয় হয় ৮ হাজার টাকার বেশি। অথচ কোনো কোনো ট্রিপে ১ হাজার টাকাও আয় হয় না।
ধীরগতিতে চলার কারণ জানতে চাইলে একজন কর্মকর্তা বলেন, ওয়াটার বাস সাধারণত যে গতিতে চলে সে গতিতে চালালে নদীর দু’পাশের পাড় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই চালক চাইলেও পূর্ণ গতিতে চালাতে পারছেন না। তবে একজন চালক বলেন, পূর্ণ গতিতে ওয়াটার বাস চালালে নদীর পাড় ধসে যাবে এ অজুহাত ঠিক নয়। ওয়াটার বাসের একজন নিয়মিত যাত্রী আবদুর রহমান জানান, বাদামতলী ঘাটে কোনো যাত্রী ছাউনি নেই। আলাদা জেটিও নেই। জেটি না থাকায় যেখানে সেখানে বাসগুলো ভেড়ানো হয়। এছাড়া পন্টুন না থাকায় যাত্রীদের অনেক পথ ঘুরে ওয়াটার বাসে উঠতে হচ্ছে। ওয়াটার বাসের ইঞ্জিনচালক মোহাম্মদ সেকেন্দার মিয়া বলেন, শুধু যাত্রীদের সুযোগ-সুবিধার সমস্যা না, বাসগুলোর ইঞ্জিনেরও সমস্যা আছে। অনেক সময় যাত্রী নিয়ে রাস্তায়ও বন্ধ হয়ে যায় বাসগুলো। এত সমস্যা থাকলে যাত্রী আসবে কেন?
এ ব্যাপারে গাবতলী টার্মিনালের সুপারিনটেন্ডেন্ট জানান, প্রতিটি ট্রিপেই হাতে গোনা যাত্রী থাকে। তাই লাভের মুখ দেখা যাচ্ছে না। লাভের মুখ দেখতে চাইলে অবশ্যই যাত্রীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি প্রচারণার কাজটাও করতে হবে।
