বিএনপি নেতার সঙ্গে ইসরাইলের ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির নেতা মেন্দি এন সাফাদির বৈঠক নিয়ে দেশজুড়ে এখন তোলপাড় চলছে। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীকে গ্রেফতারের দাবি জোরালো হচ্ছে। তার নিজের দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলে দিয়েছেন সাফাদির সঙ্গে তার বৈঠক ব্যক্তিগত। ওই বৈঠকের বিষয়ের সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কেন তিনি বৈঠক করলেন সেটাও তিনিই ভালো বলতে পারবেন। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও তাকে ডেকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।
এখন প্রশ্ন উঠেছে ইসরাইল হঠাত্ করেই কেন বাংলাদেশের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠল। যেখানে বাংলাদেশে উদার গণতান্ত্রিক দল ক্ষমতায় সেখানে সেই সরকারকে উত্খাত করার দরকারই বা হয়ে পড়ল কেন তাদের? বাংলাদেশের একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা যিনি এ বিষয়ে খোঁজখবর রাখছেন তিনি ইত্তেফাককে বলেন, বাংলাদেশের একজন সাংবাদিক ও মোসাদের বাংলাদেশি এজেন্ট শিপান কুমার বসু আসলাম চৌধুরীকে সরকার উত্খাতের ষড়যন্ত্রে রাজি করান। এই তিনজনে দিল্লিতে গিয়ে দেখা করেন নিউইয়র্কে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী (তখন ভারতে এসেছিলেন) ভারতের রাষ্ট্রীয় সয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) নেতা জোতিন্দার কুমারের সঙ্গে। তাকে হিন্দু নির্যাতনের কিছু ভিডিও চিত্র দেখানো হয়। এগুলো দেখেই ক্ষুব্ধ হন জোতিন্দার। তিনিই মেন্দি এন সাফাদির সঙ্গে বৈঠকের আয়োজন করে দেন। সাফাদি দিল্লিতে পৌঁছার পর প্রথম বৈঠকেই শিপান কুমার বসু ওই ভিডিও চিত্রটি সাফাদিকে দেখান। এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন সাফাদি। ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, আসলে ওই ভিডিওটি ছিল ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী সংখ্যালঘু নির্যাতনের।
ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, আসলাম চৌধুরী বৈঠকগুলোতে সরাসরি অংশ নিলেও নেপথ্যে কাজ করে দিয়েছেন ঐ সাংবাদিক এবং শিপান কুমার বসু। তাদের দুজনকেই গ্রেফতারের জন্য খোঁজা হচ্ছে। এই মুহূর্তে শিপান দেশে নেই বলেই আমাদের কাছে খবর। আর ওই সাংবাদিক (নামের শেষে চৌধুরী আছে) গা ঢাকা দিয়েছেন। যে কোনো সময় তারা গ্রেফতার হতে পারেন। তিনি বলেন, আরএসএস নেতা জোতিন্দার ও লিকুদ নেতা সাফাদিকে পুরনো ভিডিও দেখিয়ে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। এখন আস্তে আস্তে বিষয়গুলো পরিষ্কার হতে শুরু করেছে।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, আরএসএস নেতা জোতিন্দারকে এমনভাবে ক্ষুব্ধ করা হয়েছে যে, তিনি নিউইয়র্ক থেকে লন্ডনে গিয়ে কয়েকজন বিএনপি নেতাকে নিয়ে সাফাদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। শুধু তাই নয়, কিছুদিন আগে বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব বাংলাদেশে এসে বর্তমান সরকারের পক্ষে নিজেদের অবস্থানের কথা বলে গেছেন। এরপরই জোতিন্দারের সঙ্গে রাম মাধবের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে। সেখানে জোতিন্দারের দাবি, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই হিন্দুরা বেশি নির্যাতিত হচ্ছে। এই সরকারের পক্ষে তাদের অবস্থান নেওয়া কোনোভাবেই ঠিক না। জোতিন্দার বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন।
জানা গেছে, দিল্লিতে তেলাআবিব- দিল্লি রিলেশনশিপ সেমিনার চলাকালে যে হোটেলে ঐ বৈঠকের আয়োজন করা হয় তার বাইরে আরএসএসের কিছু নেতা-কর্মী বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিবাদ জানান। তারা প্ল্যাকার্ড হাতে হোটেলের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন। এটি ছিল মূলত সাফাদিকে দেখানোর জন্য কয়েকজন অতিউত্সাহী আরএসএস নেতার আয়োজন। বৈঠকশেষে হোটেলের বাইরে আসার পর সাফাদির সঙ্গে সবাই পৃথকভাবে ছবিও তোলেন।
এদিকে আসলাম চৌধুরীকে গ্রেফতারের দাবি জোরালো হচ্ছে। ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্ক খতিয়ে দেখতে সরকারের প্রতি জোরালো দাবি জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বসর মাইজভাণ্ডারী এমপি ও মহাসচিব এম এ আউয়াল এমপি। গতকাল বিকালে গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে তারা মোসাদের প্রভাবশালী চর মেন্দি এন সাফাদির সঙ্গে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর বৈঠকের বিষয়ে তদন্ত করে দ্রুত তাকে গ্রেফতারের দাবি জানান। এমন দাবি এসেছে আরো অনেক সংগঠনের কাছ থেকেও।
অপরদিকে সাফাদির সঙ্গে আসলাম চৌধুরীর বৈঠকে ক্ষুব্ধ সরকারও। খোদ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে বিএনপি বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে সরকারের কাছে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। সরকারের কাছে খবর রয়েছে যে তারা ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে বাংলাদেশকে একটি ধর্মান্ধ মুসলিম দেশ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে। তারা ইসরাইলকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে যে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দেশটির সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হবে। এটা যে কত বড় অপরাধ! আমার মনে হয় চিন্তা করার সময় এসেছে বিএনপির বাংলাদেশে রাজনীতি করার অধিকার আদৌ আছে কি না?
