ভ্যাট আতঙ্কে ব্যবসায়ীরা, কার্যকর ১ জুলাই থেকে

আপডেট : ২৪ মে ২০১৬, ১২:৪৭
আসছে নতুন বাজেট। সেই সঙ্গে নতুন ভ্যাট আইন। ১ জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই আইন নিয়ে ব্যবসায়ী-নীতিনির্ধারকদের মতদ্বৈধতা এখন চরমে। ঢালাও ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আইন কার্যকর হলে ভোক্তা পর্যায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষত: ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বেশি।
 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন বাজেটে শুল্ক-কর হারের পুনর্বিন্যাসের কারণেও পণ্য মূল্যে উল্লম্ফন থাকবে। এমনিতেই বাজেট ঘোষণা মাত্রই পণ্যের দাম বেড়ে যায়। নিয়ন্ত্রণের কোনো উপায় কাজ করে না। এ অবস্থায় নতুন ভ্যাট আইন অনুযায়ী সব কিছুতেই ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপিত হবে। মূল্যসংযোজন কর বা ভ্যাটের এই অর্থ ব্যবসায়ীরা ভোক্তা তথা জনগণের কাছ থেকে সংগ্রহ করবেন। সংগৃহীত অর্থ রাজস্ব দফতরে জমা দেবেন।
 
বর্তমানে  প্যাকেজ ভ্যাট ছাড়াও ক্ষেত্রেভেদে ভ্যাটের বিভিন্ন হার কার্যকর রয়েছে। মূলত: মূল্যস্তর সহনীয় রাখতেই এধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। সংশোধিত নতুন ভ্যাট আইনটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্তেই প্রণয়ন করা হয়। সেটি কার্যকরের সময় ১ জুলাই ২০১৬। এটি প্রণয়নের সময় নিয়ে ব্যবসায়ী পর্যায়েও আলোচনা হয়। ব্যবসায়ীরা দ্বিমত পোষণ করলেও চূড়ান্ত আইনে সঠিকভাবে তাদের মতের প্রতিফলন ঘটেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
 
ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের দাবি, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে ভ্যাটের এই উচ্চ হার সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অন্যান্য দেশেও জেনারেল সেলস ট্যাক্স বা জিএসটি রয়েছে। কিন্তু এই হার ৩ থেকে ৫ শতাংশের বেশি নয়। বাংলাদেশে রাজস্ব আদায়ের খাতভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রত্যক্ষ করের তুলনায় পরোক্ষ কর বা ভ্যাট খাতে আয় বেশি হয়। ফলে, সরকার সাম্প্রতিক সময়ে ভ্যাট আদায়ে অধিক মনোযোগী হয়। প্রতি বছরই নতুন নতুন খাতকে ভ্যাটের আওতাভুক্ত করার মাধ্যমে আদায় বাড়ানো হয়।
 
বিশাল বাজেট বাস্তবায়ন, বেতনভাতাদি বাড়ানোর ফলে আগামী অর্থবছরে আরো বেশি রাজস্ব সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করা গেলে রাজস্বের বড় অংশের যোগান হয়ে যাবে। কিন্তু এর দায়ভার যাবে জনগণের কাঁধে। এক্ষেত্রে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মত অন্যান্য জনগোষ্ঠীর আয় কতটা বেড়েছে বা আদৌ বেড়েছে কি না সে প্রশ্নও সামনে চলে আসে।
 
খোদ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পর্যালোচনায়ও  উঠে এসেছে যে, ভ্যাট আইন নিয়ে নতুন জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ভ্রান্ত আশঙ্কার সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা ভোক্তার কাছ থেকে বাড়তি মূল্য দাবি করতে পারে। এছাড়া বিদ্যমান কিছু সুযোগ বিলুপ্তির কারণে কিছু পণ্য ও সেবার মূল্য বাড়তে পারে।
 
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আশঙ্কা এফবিসিসিআইয়ের
 
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছেও চিঠি লিখেছেন। তাতে নতুন আইনটির সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের জন্যও অনুরোধ জানিয়েছেন। খাতভিত্তিক একটি প্রস্তাবও তিনি দিয়েছেন যে, কোন খাতে কত হারে ভ্যাট আরোপ করা হলে তা অর্থনীতির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ হবে এবং ক্রেতা ও ভোক্তারা সুবিধা পাবেন।
 
এফবিসিসিআই সভাপতি সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, নতুন আইনটি সংশোধনপূর্বক বাস্তবায়ন করা না গেলে দ্রব্যমূল্যের অনাকাঙ্খিত বৃদ্ধিসহ ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এছাড়া, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের উদ্ভূত অসন্তোষ ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াকে পুঁজি করে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা হওয়ার আশঙ্কা করে তিনি বলেছেন, এ অবস্থায় ব্যবসায়ীমহল অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।
 
ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ভ্যাটের হার নমনীয় করার পাশাপাশি সরকারের দেয়া উত্পাদনমুখী বিভিন্ন খাতে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধাও বহাল রাখার পক্ষে। তাদের মতে, সম্ভাবনাময় কিছু খাতে সুবিধা দেয়া হয়েছে। সুবিধা পেয়ে উদ্যোক্তারা শিল্পের বিকাশ ঘটিয়েছেন এবং বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেছেন। এ ধরনের সুবিধা দেখে নতুন উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন। এ অবস্থায় ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত তথা বিশেষ সুবিধাসমূহ বহাল রাখলে নতুন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহ পাবেন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
 
আন্দোলনের হুমকি: আজ বসছেন পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা
 
এদিকে, ভ্যাট আইন সংশোধনের দাবিতে আন্দোলনও অব্যাহত রয়েছে। পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধেরও হুমকি দিয়েছেন। ঢাকা দক্ষিণ ব্যবসায়ী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আবু মোতালেব ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা ভ্যাট আইন সংশোধনের দাবি করছি। কেননা, এতে ক্রেতা-ভোক্তাদের নাভিশ্বাস উঠবে। আমরা চাই সহনীয় হারে ভ্যাট ধায্য করা হোক। বিষয়টি নিয়ে আরো কঠোর কর্মসূচি দিতে আমরা আজ মঙ্গলবার বৈঠকে বসছি। বৈঠক থেকে পরবর্তী কর্মসূচি দেয়া হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ইতিমধ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে আমরা কথা বলেছি। সন্তোষজনক সুরাহা হলে ব্যবসায়ী, ক্রেতা—ভোক্তা সবাই লাভবান হবেন। এমনকি সরকারের রাজস্ব ফাঁকিও কমবে।’
 
দাম বাড়তে পারে অনেক পণ্যের:
 
নতুন ভ্যাট আইনে ১ হাজার ৯৭৩টি পণ্যের ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা উঠে যাবে। সেখানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিদ্যুত্ বিলের ওপর সংকুচিত ভিত্তিমূল্যে ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হয়। নতুন আইন অনুযায়ী, বিদ্যুত্ বিলের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ হবে। অন্যান্য পরিষেবার ভ্যাটও বাড়ার কারণে এসব খাতে ভোক্তার ব্যয় সরাসরি বাড়বে। যা সার্বিক জীবনযাত্রায় ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। বিদ্যুত্ বিলসহ ২০ ধরনের সেবার উপর বর্তমানে সংকুচিত ভিত্তিমূল্যে ভিন্ন ভিন্ন হারে ভ্যাট রয়েছে। এ হার ২ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত। নতুন আইন কার্যকর হলে এসব খাতে একক হারে অর্থাত্ ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হবে। ফলে এসব পণ্য ও সেবায় ক্রেতার ব্যয় বাড়বে।
 
বর্তমানে ট্যারিফ মূল্যভিত্তিক ব্যবস্থায় প্রতি টন রড কিনতে ৪১২ টাকা ভ্যাট পরিশোধ করতে হয়। নতুন আইনে বিভিন্ন পর্যায়ে রেয়াত নেয়ার পরও বর্তমান বাজারদরে প্রতি টনে ৩ হাজার ২২৯ টাকা ভ্যাট হবে বলে মনে করছে এনবিআর। আর এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন ক্রেতা পর্যায়ে প্রতি টনে ৭ হাজার ৫শ’ টাকা খরচ বাড়বে। রেযাতের সুযোগ ভোক্তা পর্যায়ে যাবে না। নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হলে নির্মাণ ব্যয়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা আছে। ইট ও বালুতেও খরচ বাড়বে বলে মনে করেছেন ব্যবসায়ীরা। কারণ, এসব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ মূসক কার্যকর হবে। এর ফলে বেসরকারি নির্মাণ খাতের পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়তে পারে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দোকানে গার্মেন্টস পণ্যের ভ্যাট ভিন্ন ভিন্ন হারে রয়েছে। নতুন আইনে এসব পণ্যের ব্যয়ও বাড়তে পারে। বর্তমানে স্থানীয় উত্পাদন পর্যায়ে ৮৫টি পণ্যের ওপর ট্যারিফ মূল্য ধরে ভ্যাট রয়েছে। ওই পণ্যগুলোর পরিমাপের নির্দিষ্ট মূল্য ধরে তার উপর ভ্যাট দিতে হয়। ১৫ শতাংশ ভ্যাট কার্যকর হলে এর বেশিরভাগের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছ।