ফ্লাইট নম্বর– বিজি ৯৬। বাংলাদেশ বিমানের একটি বোয়িং ৭৩৭। প্রতিদিনই সকাল বিকাল কলকাতা থেকে এই মডেলের বিমান যাতায়াত করে ঢাকায়। কিন্তু গতকাল রাতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করা বিমানটা একটু অন্যরকম। কারণ, এই বিমানে চড়ে দেশে ফিরেছেন আমাদের মুস্তাফিজুর রহমান; দ্য ফিজ।
বিশ্ব জয় করে আসেননি মুস্তাফিজ। বিশ্ব জয় করার সময় এখনো তার সামনে পড়ে আছে। যা করেছেন, সেটা অবশ্য বিশ্বজয়ের চেয়ে নিতান্ত ছোট নয়। মাত্র কয়েক মাসের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে গিয়েছিলেন আইপিএল খেলতে। সেখানে গিয়ে নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন আইপিএলের বিস্ময়, বিশ্বের বিস্ময় হিসেবে। সানরাইজার্স হায়দারাবাদকে দফায় দফায় বিপদ থেকে উদ্ধার করে ম্যাচ জিতিয়েছেন। সবশেষে দলকে চ্যাম্পিয়ন করে ফিরেছেন।
আর ফেরার আগে বাংলাদেশি এই কাটার মাস্টার এবারের আইপিএলের উদীয়মান তারকার খেতাব জিতে ফিরেছেন। ১৭ উইকেট নিয়ে হয়েছেন এবারের আইপিএলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় খেলোয়াড়দের একজন। প্রথম অ-ভারতীয় ক্রিকেটার হিসেবে সেরা উদীয়মানের পুরস্কারটা জিতেছেন।
মুস্তাফিজের এখন পর্যন্ত পুরো ক্যারিয়ারটাই বিস্ময় ও চমকে ভরপুর। মাত্র ১১ মাস আগে, গত বছর জুন মাসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে হঠাত্ই পথচলা শুরু করেছিলেন। নেটে তার বিস্ময়কর বোলিং দেখে জাতীয় দলে নিয়ে এসেছিলেন কোচ ও নির্বাচকরা। পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে চমকে দেওয়া বোলিং দিয়ে শুরু। এরপর ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেকে প্রথম দুই ম্যাচে ৬ ও ৫ উইকেট নিয়ে বিশ্বরেকর্ড। এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি মুস্তাফিজকে। একটার পর একটা রেকর্ড ও বিস্ময় পায়ে লুটিয়েছে তার। ক্যারিয়ারের শুরুতে সবচেয়ে বেশি উইকেট, সবচেয়ে দ্রুততম সময়ে ৩ বার পাঁচ বা ততোধিক উইকেট; অনেক রেকর্ড।
এই সময়ে মুস্তাফিজের চমকের মূল ব্যাপার ছিলো দুটো– কাটার ও স্লোয়ার। ফাস্ট বোলারদের টার্ন নেওয়া ডেলিভারি কাটার আগে থেকেই দুনিয়ায় ছিলো। জন্মগতভাবেই সেই কাটারের সেরা ব্যবহার করতে পারছিলেন মুস্তাফিজ। সাথে কাটার ডেলিভারি করছিলেন ফাস্টার ও স্লোয়ার দুই ধরনে। এই দুই ধরনের পার্থক্য কেউ বুঝতেই পারছিলো না।
এর সাথে গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে আগে সময়ে মুস্তাফিজ তূনে যোগ করলেন নতুন দুটো তীর—ফাস্ট ডেলিভারি ও ইয়র্কার। যে মুস্তাফিজ ১৩৫-১৩৬ কিলোমিটারে বল করে অভ্যস্থ, তিনি হঠাত্ ১৪৪-১৪৫ কিলোমিটারেও বল করতে থাকলেন। সাথে দু একটা বিধ্বংসী ইয়র্কার। মানে এখন তার কাটার ও ইয়র্কার একই অ্যাকশনে ১২৫ থেকে ১৪৫ কিলোমিটারে ভিন্ন ভিন্ন গতিতে আসতে পারে!
এহেন মুস্তাফিজকে প্রথম চোখে ধরলো পাকিস্তান সুপার লিগ কর্তৃপক্ষের। সেখানে ইনজুরির কারণে খেলতে গেলেন না। এর মধ্যে আইপিএলের নিলামে শুরু হলো তাকে নিয়ে রশি টানাটানি। ৫০ লাখ রুপী ভিত্তিমূল্য ছিলো মুস্তাফিজের। সেখান থেকে বেড়ে ১ কোটি ৪০ রূপীতে তাকে কিনে নেয় হায়দারাবাদ। ফলও পেয়েছে তারা।
পুরো আসরে ১৬ ম্যাচে অংশ নিয়ে ১৭ উইকেট নিয়েছেন মুস্তাফিজুর। মোট ৬১ ওভার বল করে ৪২১ রান দিয়েছেন তিনি। ইকোনমি রেট ৬.৯০। আইপিএলের শীর্ষ দশ বোলারের মধ্যে সেরা ইকোনমি মুস্তাফিজুরের। এমন পারফরমেন্সে সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কারটা হাতে তুলেছিলেন তিনি। ৮৩.২ শতাংশ ভোট নিয়ে সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় হন তিনি। দ্বিতীয় স্থানে থাকা রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালুরুর লোকেশ রাহুল ভোট পেয়েছেন ৬.৫ শতাংশ।
মুস্তাফিজ আইপিএল জিতে ফিরেছেন। এখন তার সামনে আরও বড় বড় জয়ের হাতছানি। তাকে ইতিমধ্যে দলে ভিড়িয়ে ফেলেছেন কাউন্টি দল সাসেক্স। যদিও ইনজুরি ও ক্লান্তির কারণে সেখানে যাবেন কি না, সন্দেহ আছে। এরপর আবার বিগ ব্যাশের গোটা কয়েক দল খুঁজছে তাকে। বাইরের পুরো দুনিয়ায় এখন মুস্তাফিজকে চায়।
তবে এই মুস্তাফিজের জন্য সবচেয়ে বেশি অপেক্ষা করে আছে বাংলাদেশ। ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, এমন বিস্ময়কর প্রতিভা যুগে যুগে খুব বেশি জন্ম নেয় না। এমন এক বিস্ময়ের হাত ধরে বাংলাদেশ অপেক্ষায় রয়েছে বিশ্বমাপের কিছু অর্জনের জন্য।
নিশ্চয়ই সেই অপেক্ষার প্রতিদান দেবেন মুস্তাফিজ; দ্য ফিজ।
