জাতীয় অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম এ দেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের এক অগ্রণী যোদ্ধা। তার জীবন কেবল সময়ের দিক থেকে দীর্ঘ নয়; উল্লেখযোগ্য কর্মের অর্জনেও বিশিষ্ট। তাকে সংবর্ধনা জ্ঞাপনের অর্থ ধর্মান্ধতা ও সমূহ অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর পথের যাত্রাকে অভিনন্দিত করা। তিনি সারাজীবন লেখনী, পত্রিকা সম্পাদনা এবং টেলিভিশন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যেভাবে বাংলা ও বাঙালিত্বের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন তা আমাদের সমকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
গতকাল শনিবার বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, জাতীয় অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের ৯০তম বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে ‘নাগরিক সংবর্ধনা’ অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও জাতীয় কবিতা পরিষদ যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের শুরুতে শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়।
সংবর্ধনায় মুস্তাফা নূরউল ইসলামের বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্ম বিষয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক বিশ্বজিত্ ঘোষ, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি ড. মুহাম্মদ সামাদ, রাজনীতিবিদ নূহ-উল আলম লেনিন, প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম, প্রাবন্ধিক আহমাদ মাযহার, এটিএন বাংলার পক্ষে তাসকিন আহমেদ প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, বাংলা ও বাঙালিত্বের পক্ষে তিনি চিরকাল আপসহীন। সাময়িকপত্র গবেষণা, নজরুল গবেষণা এবং বাঙালি মুসলিম- মানসের আধুনিকায়ন বিষয়ে তার গবেষণাকর্ম আমাদের সাহিত্যক্ষেত্রে যোগ করেছে বুদ্ধিবৃত্তিকতার নবতর মাত্রা।
সভাপতির বক্তব্যে ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, মুস্তাফা নূরউল ইসলামের জীবন কেবল সময়ের দিক থেকে দীর্ঘ নয়; উল্লেখযোগ্য কর্মের অর্জনেও বিশিষ্ট। তরুণ বয়সে তিনি এবং তার সমসাময়িক লেখক বন্ধুরা অগত্যা পত্রিকার মাধ্যমে সমকালীন নানা অসঙ্গতিকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে বিদ্ধ করেছেন এবং একই সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির পক্ষে জোরালো অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
সংবর্ধনার উত্তরে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম বলেন, আমার মানসে তিন বীর বাঙালির প্রতিকৃতি চিরঅঙ্কিত; এঁরা হচ্ছেন— রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও বঙ্গবন্ধু। তাঁদের আদর্শকেই আমি সারাজীবন বহন করে চলেছি। তিনি বলেন, জীবনে অনেক পেশায় যুক্ত ছিলাম; তবে আমার কাছে আদর্শ পেশা শিক্ষকতা।
মুস্তাফা নূরউল ইসলামকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে ফুলেল শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল আলম লেনিন। এছাড়াও ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয় বাংলা একাডেমি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, জাতীয় কবিতা পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, সোনারগাঁও লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদ, জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি, এটিএন বাংলা, চ্যানেল আই, গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদ, দনিয়া সাংস্কৃতিক জোট, সুন্দরম পত্রিকা, সায়েন্স ফিকশন সোসাইটি, কণ্ঠশীলন, উজান, আবৃত্তি একাডেমি, মূলধারা, ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের পক্ষে।
স্বাগত ভাষণে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান বলেন, মুস্তাফা নূরউল ইসলামকে সংবর্ধনা জ্ঞাপনের অর্থ ধর্মান্ধতা ও সমূহ অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর পথের যাত্রাকে অভিনন্দিত করা।
সম্মাননাপত্র পাঠ করেন প্রাবন্ধিক মফিদুল হক। শিল্পী শাহজাহান আহমেদ বিকাশ অঙ্কিত প্রতিকৃতি এবং উত্তরীয় প্রদান করে সংবর্ধিত করা হয় তাঁকে। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের কবিতার আবৃত্তিতে মুস্তাফা নূরউল ইসলামকে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন আবৃত্তিশিল্পী হাসান আরিফ। মুস্তাফা নূরউল ইসলামকে নিবেদিত সৈয়দ শামসুল হকের সদ্যরচিত কবিতা পাঠ করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। এ ছাড়াও নিবেদিত কবিতা পাঠ করেন কবি তারিক সুজাত। সংবর্ধনা উপলক্ষে বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে সময়ের মুখ মুস্তাফা নূরউল ইসলাম শীর্ষক একটি সংবর্ধনা-স্মারক প্রকাশিত হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. এম সাইদুজ্জামান, ইতিহাসবিদ ড. মুনতাসীর মামুন, ভাষাতাত্ত্বিক ড. মনিরুজ্জামান, জাতীয় সংসদ সদস্য কবি কাজী রোজী, কবি রবীন্দ্র গোপ, নাট্যব্যক্তিত্ব ঝুনা চৌধুরী, আবৃত্তিকার আহকামউলাহ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সুভাষ সিংহ রায়, প্রকাশক ওসমান গণি, কামরুল হাসান শায়ক প্রমুখ। সংবর্ধনা অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ।
