বিদায় দ্য গ্রেটেস্ট

আপডেট : ০৫ জুন ২০১৬, ০৮:৪০
 
দারিদ্র্য ও বর্ণবাদের প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে বক্সিংয়ে তিন তিনবার হেভিওয়েট  চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন তিনি। নিজেই নিজেকে দ্য গ্রেটেস্ট উপাধি দিয়েছিলেন। বক্সিং সাফল্যের পাশাপাশি মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কেসিয়াস ক্লে থেকে মোহাম্মদ আলিতে বনে যাওয়া এই মুষ্টিযোদ্ধাকে সারা দুনিয়াও পরবর্তীতে দ্য গ্রেটেস্ট হিসেবে মেনে নিতে দ্বিধা করেনি। কিন্তু ৩২ বছর ধরে পার্কিনসন্স রোগ ও এর নানান উপসর্গের সাথে লড়াইয়ে হার মেনে গত শুক্রবার রাতে কোটি কোটি ভক্তকে শোক স্তব্ধ করে নশ্বর পৃথিবী ছাড়লেন ৭৪ বছরের আলি।
 
মোহাম্মদ আলি ১৯৪২ সালের ১৭ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের লুইসডিলে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম ক্যাসিয়াস মার্সেলাস ক্লে (সিনিয়র),  মায়ের নাম ওডেসা গ্রাডি ক্লে। পড়াশোনা করেন সেন্ট্রাল হাইস্কুলে। তারা চার ভাই ও এক বোন।
 
মোহাম্মদ আলি বাংলাদেশের মানুষেরও ছিলেন আপনজন। ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। বাংলাদেশ সরকারও তাকে কক্সবাজারে এক খণ্ড জমি ও সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দিয়েছিল। তার নামে দেশের প্রধান বক্সিং স্টেডিয়ামটির নামকরণ করা হয়। দেশের প্রধান প্রধান আকর্ষণ ঘুরে দেখার পর সে সময় তিনি বাংলাদেশের প্রতি মুগ্ধতার কথা জানিয়েছিলেন।
 
বাংলাদেশ ঘুরে আলি বলেছিলেন,‘আমি আমেরিকা থেকে বিতাড়িত হলেও আমার আরেকটা বাড়ি আছে। আপনি যদি স্বর্গে যেতে চান, তাহলে বাংলাদেশে যান।’ তাকে নিয়ে বানানো ‘মোহাম্মদ আলি গোজ ইস্ট: বাংলাদেশ, আই লাভ ইউ’ তথ্য চিত্রে তিনি আবার বাংলাদেশে আসার এবং এখানে একটা বাড়ি করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে ওঠেনি।
 
বক্সিং থেকে ১৯৮১ সালে অবসর নেয়ার আগেই তিনি সারা দুনিয়ার গণমানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৬০ এর দশকে এর শুরু। সারা বিশ্বকে চমকে দিয়ে মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধে দেশের হয়ে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান ও গ্রেফতার বরণ করেন তিনি। গ্রহণ করেন ইসলাম ধর্ম।
 
এসব ঘটনায় মার্কিন জনমত বিভক্ত হলেও শেষ পর্যন্ত চার বছরের আইনি লড়াই শেষে আলির পথটিই সঠিক বলে বিবেচিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের আমলে পাওয়া পুরস্কার ও আটলান্টা অলিম্পিকের মশাল প্রজ্বলনের জন্য পার্কিনসন্স রোগে কম্পমান আলিকে বেছে নেয়াও এর প্রমাণ।
 
সাম্প্রতিক সময়ে তিনি নিজের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যের মধ্যেও আমেরিকার রাজনীতির খোঁজখবর রাখতেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দল থেকে মনোনয়ন পেতে যাওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প মুসলিম বিরোধী কথাবার্তা বলতে শুরু করলে আলি প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে জাতিসংঘ তাকে আফগানিস্তানে পাঠিয়েছিল ‘শান্তির দূত’ হিসেবে।
 
খেলোয়াড়ি জীবনে প্রথম নজর কাড়েন ১৯৬০ সালে রোম অলিম্পিকে সোনা জিতে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ক্যারিয়ারে ৬১টি লড়াইয়ের মধ্যে ৫৬টিই জিতেছিলেন। সনি লিস্টনকে হারিয়ে মাত্র ২২ বছরে হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মধ্য দিয়ে যে জয়যাত্রা শুরু করেন আলি, তা অব্যাহত ছিল পরবর্তী অর্ধশতক। এর মধ্যে সেরা ছিল জো ফ্রেজিয়ারের বিরুদ্ধে ১৫ রাউন্ডে গড়ানো লড়াইয়ে পাওয়া জয়টি। যাকে এখনো শতাব্দীর সেরা লড়াই হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।
 
বর্ণবাদের তিক্ত স্মৃতিও আছে তার। অলিম্পিক জিতে আমেরিকায় ফেরার পর রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে কালো বলে তাকে সেখান থেকে বের করে দেয়া হয়। কথিত আছে রাগে দুঃখে ক্ষোভে অপমানে তিনি গোল্ড মেডেলটি নদীতে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। ৩৬ বছর পর আটলান্টা অলিম্পিকে তাকে সেটির পরিবর্তে আরেকটি পদক দেয়া হয়। তিনি এটিকে নিজের ক্যারিয়ারের সেরা অর্জনগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেন।
 
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার এক হাসপাতালে মৃত্যু হয় এই কিংবদন্তির। শ্বাস-কষ্টের সমস্যা নিয়ে তিনি আগেও কয়েকবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি ছিল আগের চাইতেও গুরুতর। ফক্স নিউজ জানিয়েছিল তার অবস্থা নিয়ে পরিবারের সদস্যরাও দুশ্চিন্তায় ছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, লু্ইজিয়ানার কেনটাকিতে নিজের বাড়িতে তার শেষকৃত্য হবে। তার ছিল ৯ সন্তান, এর মধ্যে আছে কন্যা লায়লানূর, যিনি নিজেও চ্যাম্পিয়ন বক্সার।
 
সাম্প্রতিক সময়ে কদাচিত্ প্রকাশ্যে এলেও তাকে বেশ ভঙ্গুর দেখাচ্ছিল। কথা বলা এমনকি হাঁটাচলার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। ৯ এপ্রিল তিনি পারকিনসন্স সেন্টারের সহায়তার জন্য অ্যারিজোনায় আয়োজিত ‘সেলেব্রিটি ফাইট নাইট’-এ সবশেষ জনসমক্ষে এসেছিলেন।
 
বক্সিং থেকে অবসর নেওয়ার তিন বছর পর থেকেই এই রোগে ভুগছিলেন তিন বারের বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন আলি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ১৯৮৬ সালে বিয়ে করা চতুর্থ স্ত্রী লোনিকে নিয়ে নিরিবিলি জীবন যাপন করছিলেন। লোনিকে তিনি বিয়ে করেছিলেন ১৯৮৬ সালে।
 
তিনি সবসময়েই চাইতেন আপন স্বতন্ত্রে ভাস্বর কিছু করে দেখাতে। তাই বক্সিং অনেক কিংবদন্তির জন্ম দিলেও মোহাম্মদ আলি একজনই।
 
প্রধানমন্ত্রীর শোক
 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মোহাম্মদ আলির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। পাঁচদিনের সরকারি সফরে সৌদি আরবে অবস্থানকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক শোক বাণীতে মোহাম্মদ আলির তিন দশকের বক্সিং ক্যারিয়ারে তিনবার বিশ্ব হেভিওয়েট বক্সিং চ্যাম্পিয়নের অবিশ্বাস্য পারফরমেন্স স্মরণ করেন। বাণীতে তিনি বলেন, মোহম্মদ আলি ছিলেন সর্বকালের সেরা বক্সার এবং তিনি বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে বক্সিংকে জনপ্রিয় ইভেন্টে পরিণত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি বলেন, পাশাপাশি মোহম্মদ আলি ছিলেন মহান ব্যক্তিত্বদের একজন। তিনি সারা বিশ্বে বঞ্চিত ও নির্যাতিতদের অধিকার আদায়ে ছিলেন সব সময়ে সোচ্চার।
 
জেপি’র শোক
 
জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এম.পি ও  মহাসচিব ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলির ইন্তেকালে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন। এক বিবৃতিতে তারা বলেন, মরহুম মোহাম্মদ আলি ছিলেন বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মুষ্টিযোদ্ধা। তিনি নিজেকে এবং মুষ্টিযুদ্ধকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তার ইন্তেকালে বিশ্ব একজন আদর্শ ক্রীড়াবিদ হারালো যার অভাব পূরণ হওয়ার নয়। জেপি’র  নেতৃদ্বয় মরহুমের  রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। 
-প্রেস বিজ্ঞপ্তি