বিশ্বে প্রায় ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিশু নানাভাবে শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। এদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি শিশু নানারকম ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও’র সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা যায়। ‘জাতীয় শিশু শ্রম জরিপ-২০১৩’ এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু কোন না কোন শ্রমে নিয়োজিত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত এ জরিপে দেখা যায়, এর মধ্যে ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশুই বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। শিশু শ্রম নিরসনে বাংলাদেশ সরকার ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নির্ধারণ করে ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম বন্ধের অঙ্গীকার করেছে। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় শ্রমজীবী শিশুদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশা থেকে সাধারণ শ্রমে নিযুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
আজ ১২ জুন বিশ্ব শিশু শ্রম প্রতিরোধ দিবস। শিশু অধিকার সুরক্ষা ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম নিরসনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক শিশু শ্রম সংস্থা (আইএলও) ২০০২ সাল থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিবছর দিবসটি পালন করে। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে— ‘উত্পাদন থেকে পণ্য ভোগ, শিশু শ্রম বন্ধ হোক’। এই প্রতিপাদ্য নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৮০টি দেশ দিবসটি পালন করছে।
বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ১৩টি শিশু অধিকার সংগঠনের নেটওয়ার্ক ‘অ্যালায়েন্স এগেইনস্ট চাইল্ড লেবার-এসিএল আজ ছায়ানট মিলনায়তনে আলোচনা সভা এবং শ্রমজীবী শিশুদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এছাড়া রাজধানীর সমাজসেবা অধিদপ্তর মিলনায়তনে অপরাজেয় বাংলাদেশ শ্রমজীবী শিশুদের অংশ গ্রহণে চিত্রাংকন প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। এ চিত্রাংকন প্রতিযোগিতায় দেড়শ’ শ্রমজীবী শিশু অংশ নেবে। এছাড়া শ্রমজীবী শিশুদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।
‘২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম
নিরসনে সরকার বদ্ধপরিকর’
২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বদ্ধপরিকর সরকার। ২০১৬ সালের মধ্যে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নির্ধারণ করেছিল সরকার। কিন্তু আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে তা সম্ভব হয়নি। আইন দিয়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতা। সরকার ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে কাজ করলে শিশুদের এই ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম থেকে সরিয়ে আনা সম্ভব।
গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘শিশুশ্রম নিরসনে আমাদের করণীয়’ শীর্ষক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বিশ্ব শিশু শ্রম দিবস উপলক্ষে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় কর্মশালার আয়োজন করে সোশ্যাল এন্ড ইকোনোমিক এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম (সিপ), নবলোক, কমিউনিটি পার্টিসিপেশন এন্ড ডেভলপমেন্ট (সিপিডি), অপরাজেয় বাংলাদেশ ও ভলানট্যারি এসোসিয়েশন ফর ফ্যামেলি ওয়েলফেয়ার এন্ড সোসাল ডেভলপমেন্ট (ভাফুসড) এবং সহায়। কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনামের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন সিপ-এর নির্বাহী পরিচালক মো. ফজলুল হক চৌধুরী, ভাফুসড-এর নির্বাহী পরিচালক ডা. আব্দুল কাইয়ুম লস্কর। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক মোসলেমা বানু। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর আব্দুল্লাহ আল মামুন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের নিয়োগ দেওয়ায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকার এখন পর্যন্ত ৪৬টি মামলা করেছে। শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ৩৮টি কাজকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা সেমিনারে শিশুদের জন্য বড় বড় কথা বলি। আবার বাসায় গিয়ে শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুকে মারধর করি। মানসিকতার পরিবর্তন না হলে শিশুদের জন্য কোনো কাজই ঝুঁকিমুক্ত হবে না।
অনুষ্ঠানে আয়োজনকারী ছয়টি বেসরকারি সংগঠন শ্রমজীবী শিশুদের নিয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ১০ শিশুর হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হয়।
